ডেথস্পট ’টিলাগড়’ : লাশের মিছিল থামবে কবে?

প্রকাশিত: 10:09 AM, February 10, 2020

ডেথস্পট ’টিলাগড়’ : লাশের মিছিল থামবে কবে?

 

মাসুদ আহমেদ:

সিলেট নগরীর টিলাগড়ে ঐতিহ্যবাহী সরকারি মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজের অবস্থান। এর পাশেই আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিলেট সরকারি কলেজ। অদূরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। এ কারণেই সিলেটের ছাত্র রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা হচ্ছে টিলাগড়। আর এই টিলাগড়কে সিলেটের ছাত্র রাজনীতির আতুঁড় ঘরও বলা হয়। ক্ষমতার পালাবদলে টিলাগড়েও ঘটে পালাবদল । যখন যে সরকার ক্ষমতায়, সে সরকারের ছাত্র সংগঠনই হয়ে উঠে টিলাগড়ের নিয়ন্ত্রক । সিলেট আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী দুই নেতার ছত্রচ্ছায়ায় বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত ছাত্রলীগ আধিপত্য বিস্তার, নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন ছাড়াও কারণে-অকারণে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়ায়, চলে প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া। আর এ কারণেই সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকাটি হয়ে উঠছে মৃত্যুকূপ, এক আতঙ্কের নাম। যার সর্বশেষ সংযোজন ছাত্রলীগ কর্মী অভিষেক দে দ্বীপ ।

 

২০১০ সালের ১২ই জুলাই নিজেদের আভ্যন্তরীন কোন্দলে নৃশংসভাবে খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ।

 

পলাশের বাবা সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা বীরেশ্বর সিংহ বলেছিলেন, পলাশ হত্যাকান্ডে জড়িতরা প্রকাশ্যে রাজপথে মিছিল মিটিং করেন। দলের আর্দশ প্রচারের ফেরিওয়ালা সাজেন। কিন্তু আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও আজো পুত্র হত্যার বিচার পাইনি ।

 

২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট দিনদুপুরে ছাত্রলীগ নেতা সুলেমান হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে ৩-৪ ঘাতক উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারের অ্যালিগেন্ট শপিং সিটির মোবাইল ব্যবসায়ী করিম বক্স মামুনকে হত্যা করে।

আরও পড়ুন  শায়েস্তাগঞ্জে পারিবারিক কলহের জেরে যুবকের আত্মহত্যা

 

২০১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নগরীর শিবগঞ্জে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ছাত্রলীগের সক্রিয়কর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুমকে। মাসুম হত্যাকান্ডেও উঠে আসে টিলাগড় গ্রুপের নাম।

 

মাসুম হত্যাকান্ডের মাসখানেক পরই ১৬ অক্টোবর টিলাগড়েই রায়হান চৌধুরীর অনুসারী ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলায় খুন হন হিরণ মাহমুদ নিপু অনুসারী ছাত্রলীগ কর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ।

 

মিয়াদ হত্যাকান্ডের জেরে বাতিল করা হয় সিলেট জেলা ছাত্রলীগের কমিটি। এ ঘটনায় সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনার ঝড় উঠে। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জগলু চৌধুরীর ফেসবুকে লেখা ‘খুনির চিঠি’ ছাত্রলীগের নবীন-প্রবীণ, সাবেকসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের আপ্লুত করে। প্রয়াত মিয়াদের উদ্দেশ্যে সেদিন জগলু চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘তোমাদের নির্মল নিখাদ আদর্শের কাছে আমরা বড়ই অসহায়, মিয়াদ। তোমাদের উদ্বেগহীন সুতীক্ষ্ণ চিত্ত আমাদের জং ধরা পিত্ত পুড়িয়ে ছাইভস্ম করে দেয়। তাই আমরা তোমাদের ক্ষুরধার আদর্শের কাছে পরাজিত হই, খুনের নেশায় হই প্রমত্ত।’

 

২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি এমসি কলেজে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় দু’গ্রæপ আর এর জেরেই ৯ জানুয়ারি রাতে টিলাগড় পয়েন্টে প্রতিপক্ষের অতর্কিত হামলায় খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী তানিম খান ।

আরও পড়ুন  বন্ধ হচ্ছে ৫শ’ পর্ণো সাইট

 

সর্বশেষ গত ৬ জানুয়ারি রাত সাড়ে দশটার দিকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন হন গ্রীন হিল কলেজের ছাত্র অভিষেক দে দ্বীপ ।

 

শুধু ছাত্রলীগই নয়; বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এই টিলাগড়েই ছাত্রদলের ক্যাডারদের হাতে খুন হয়েছিলেন দুই ছাত্রলীগ নেতা। ২০০৩ সালের ৭ জানুয়ারি টিলাগড়ে অতর্কিত হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মারা যান ছাত্রলীগ নেতা আকবর সুলতান। একই বছরের ৯ অক্টোবর তৎকালিন সরকারদলীয় ছাত্রদলের হামলায় নিহত হন ছাত্রলীগ নেতা মিজান কামালী ।

 

টিলাগড় কেন্দ্রিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন সিলেট আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুই নেতা সিটি কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট আজাদুর রহমান আজাদ ও অ্যাডভোকেট রণজিত সরকার। গড়ে তুলেছেন ছাত্রলীগের নিজস্ব বলয়। তাদের নিজস্ব বলয় আবার বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত । আর এ কারণেই নিজেদের মধ্যে দ্বন্ধে ছাত্রলীগের এসব হত্যাকান্ডে বেশিরভাগ সময়ই খুনিরা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মামলা, তদন্ত হলেও অদৃশ্য হাতের ইশারায় আইনের ফাঁক ফোকর পেরিয়ে খুনিরা পার পেয়ে যায়। নিহতের পরিবারে বিচারের আশা তাই থেকে গেছে মাতম হয়েই। সবার আক্ষেপ- কবে থামবে লাশের মিছিল?

 

প্রভাতবেলা/এমএ

সর্বশেষ সংবাদ