সিলেট ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
প্রকাশিত: ২:৫৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৪, ২০১৭
রেজাউল হক ডালিম:মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই ছিলো সিলেটে বৃষ্টির আনাগোনা। আর সপ্তাহখানেকেরও বেশি সময় ধরে চলছে ভারী বর্ষণ। সীমান্ত এলাকায় বিরাহমীন নামছে পাহাড়ি ঢল। যার ফলে আজ ৪ এপ্রিল (মঙ্গলবার) পর্যন্ত সিলেটের নিম্নাঞ্চলগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে অকাল বন্যার। তলিয়ে পঁচে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর জমির সকল বুরো ধান ও রবি শস্যের বাড়ন্ত চারাগুলো। বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সিলেটে সব ক’টি নদীর পানি।
একদিকে যেমন নিম্ন এলাকার কৃষাণ-কৃষাণীর হাপিত্যেষ আর কান্নায় ভারী হচ্ছে আকাশ-বাতাস। অন্যদিকে চরম শঙ্কিত সিলেটসহ পুরো দেশবাসী। কারন- বুরো ও রবি ফলস নষ্ট হয়ে গেলে অর্জিত হবে না ধান-চাল ও সবজি সংগ্রহের কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা।
গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সিলেটে থেমে থেমে চলছে ভারী বর্ষণ। যেটুকু সময় বৃষ্টিপাত থাকে না সে সময় থাকে আকাশের গোমড়া ভাব- থাকে সারাদিন বর্ষণের আকাশের সার্বিক প্রস্তুতি। যার ফলে সূর্যের উত্তাপ পায় নি সিলেটবাসী পুরো সপ্তাহ ধরে। সিলেট আবহাওয়া অফিস দৈনিক প্রভাতবেলাকে জানায়, ৩ মার্চ (সোমবার) সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে ৩৭ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আরো ৩/৪ দিন এই মাত্রায় বৃষ্টিপাত হওয়ার আভাস রয়েছে। এছাড়া মার্চ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়েছে প্রায় ৭শ’ মিলিমিটার। আবহাওয়া অফিসের পরিসংখ্যান মতে- বছরের এমন সময়ে গত বছরের তুলনায় ৩ গুন বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে সিলেটে।
বজ্রপাত আর অকাল বন্যায় থমকে গেছে যেন সিলেটবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কার্যদিবস শুরুর সময়ে ভারী বর্ষণের ফলে সঠিক সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছতে না পারা, রোদহীনতায় বাসাবাড়িতে ধোঁয়া কাপড় না শুকানো, ঠাণ্ডাজনিত কারনে শিশুদের রোগবালাই ইত্যাদি পরিস্থিতিতে স্থবির হয়ে গেছে জনজীবন। এছাড়াও মানুষ ঘর থেকে বের হতে না পারায় এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। বেচা-কেনায় মন্দাভাব চলছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।
প্রভাতবেলার বিভিন্ন স্থানের সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, সিলেটের গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলাতে মৌসুমপূর্ব ঝড়-বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুধু বোরো ধান বা সবজি ক্ষেতই নয়, কোথাও কোথাও কাঁচা ঘরবাড়িও উড়িয়ে নিয়ে গেছে আগাম কালবৈশাখী ঝড়ে। ঘর উড়ে যাওয়া এমন অনেকেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিচ ভিটায় খোলা আকাশের নিচে তাবু বানিয়ে বসবাস করছেন।
প্রভাতবেলার দক্ষিণসুরমা সংবাদদাতা জানিয়েছেন, দক্ষিণসুরমা উপজেলায় গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ, ঝড়ের আঘাত ও শীলাবৃষ্টিতে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া এলাকায় পানি বাড়ার ফলে আগাম বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটে পানি উঠতে শুরু করেছে।
ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন, মোগলাবাজার, দাউদপুর, সিলাম, জালালপুর, লালাাবাজার, কুচাই, বরইকান্দি, মোল্লারগাঁও, তেতলী, কামাল বাজার ইউনিয়নের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষককুল দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আগাম অবিরাম বৃষ্টি নামায় উপজেলার প্রায় ৬ হাজার হেক্টর বোরো ফসল পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের ঘরে ফসল তোলার আনন্দ নেই। কৃষকরা তাদের কষ্টার্জিত ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দাড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার নেই। উপজেলার আধা পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার কারণে কৃষকরা শুধু চোখের জল ফেলতে দেখা যায়।
এছাড়া গত কয়েক দিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের উপর দিয়ে ঝড় ও শিলাবৃষ্টি হওয়ায় অনেক স্থানে ঘরবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গাছ উপড়ে ফেলার পাশাপাশি ঘরবাড়ির চালা উড়িয়ে নেয়। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুটি ভাঙ্গায় ও তার ছিঁড়ে যাওয়ায় বেশ কিছু এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে এইচএসসি পরীক্ষার শুরু থেকে ঝড়বৃষ্টির কারণে বিদ্যুৎবিভ্রাট দেখা দেওয়ায় পরীক্ষার্থী সহ শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। বিদ্যুত বিভ্রাটের কারণে হাটবাজারে ছোট ছোট কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গোটা উপজেলার শাকসবজির বাগান নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকরা বোরো ফসল তুলতে না পারায় গো খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।
এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে দিনরাত অবিরাম বৃষ্টি থাকায় দিনমজুররা তাদের কর্মস্থলে কাজ করতে পারছেন না। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে এবং কোন কোন পরিবার উপবাস করছে। উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ছাড়াও সিটি কর্পোরেশনের ৩টি ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে, গোয়াইনঘাট সংবাদদাতা জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষনে ও পাহাড়ি ঢলে গোয়াইঘাট উপজেলার বিস্তীর্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও নানা সমস্যায় পড়েছেন গোয়াইঘাট বাসী।
প্লাবনের পানিতে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর বোরো ফসল পানির নীচে তলিয়ে গেছে। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৮ শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। তাছাড়াও এই প্লাবনে গৃহপালিত গবাদি পশু ও পুকুরে চাষকৃত মাছ প্লাবনের পানিতে ভেসে গেছে। এখন পানিবন্ধী অবস্থায় জীবনযাপন করছেন কয়েক হাজার মানুষ। তাছাড়া, গোয়াইঘাটের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মুল হাতিয়ার দেশের অন্যতম পাথর কোয়ারি বিছনাকান্দি ও জাফলং পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী।
গোয়াইঘাটের ৯টি ইউনিয়নে ৮ হাজার ৩শত ২০ হেক্টর বোরো ধান চাষ করেছিলেন কৃষকরা । ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অনেক কৃষক ধান চাষ করেছিলেন। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এখন সরকারি অনুদান ও বিত্তশালীদের সাহায্য ছাড়া জীবন ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এলাকার এমন কঠিন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা না পেয়ে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এমনকি সুশীল সমাজের অনেকে গোয়াইঘাট উপজেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষিকর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের তালিকা তৈরি হচ্ছে। দ্রুত বন্যার পানি সরে গেলে পরবর্তী কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা আন্তরিক রয়েছি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, বন্যা কবলিত এলাকাগুলি ইতিমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে। এ বন্যায় গোয়াইনঘাটে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর বোরো ফসলী জমিসহ ৮ শতাধিক ঘরবাড়ী বিধ্বস্ত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পত্র প্রদান করেছি।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম চৌধুরী বলেছেন, দ্রুত গোয়াইনঘাট উপজেলাকে দূর্যোগপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছেন।

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আব্দুল হক
ঢাকা অফিস : ২৩৪/৪ উত্তর গোড়ান, খিলগাঁও, ঢাকা ।
সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ, ১৪৯ আরামবাগ, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-৫৯৩৬৫৩, ০১৭১২-০৩৩৭১৫
E-mail: provatbela@gmail.com,
কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম
আমাদের সর্ম্পকে গোপনীয়তা যোগাযোগ
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি