এমপি কয়েসের থলের বেড়াল বেরিয়ে আসছে

প্রকাশিত: ২:৫৮ অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০১৭

এমপি কয়েসের থলের বেড়াল বেরিয়ে আসছে

প্রভাতবেলা প্রতিবেদক: নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পর শাহজালাল সার কারখানা নির্মাণে সরকার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে নির্মিত এই কারখানা দেশের বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এ কারখানা নির্মাণকালে ঠিকাদার নিয়োগসহ বিভিন্ন কাজ থেকে কিছু লোক বিপুলভাবে আর্থিক লাভবান হয়েছেন, যার পেছনে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী কয়েসের আশীর্বাদ রয়েছে বলে ব্যাপক জনশ্রুতি।

তবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও হয়রানির ভয়ে অভিযোগকারীরা মুখ খুলতে চান না। প্রকাশ্যে নামসহ তথ্য দিতে চান না। তারা বলেন, সঠিক তদন্ত হলে সব বেরিয়ে আসবে।

সার বস্তু: বাংলাদেশের বড় বিনিয়োগ এবং চীন সরকার ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণ-সহায়তায় ২০১৩-১৫ দুই বছর কারখানাটি নির্মাণের সময় উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ডি এম ফয়সলের মাধ্যমে এমপি কয়েস অর্থাগমের ওই সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, সার কারখানা নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট কোনো কাজ পেতে কেউ এমপির কাছে গেলেই ফয়সলের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হতো।

সার কারখানার একজন প্রকৌশলী ও একজন সিবিএ নেতা  জানান, কারখানার জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাপে ঠিকাদার নিয়োগসহ প্রায় সর্বক্ষেত্রে এমপির ঘনিষ্ঠ ফয়সলের সঙ্গে আর্থিক বিষয়ে ফয়সালা করতে হয়েছে। সেই ফয়সল এখন স্বেচ্ছাসেবক লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ।

প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের একাধিক কাজ পেয়েছে ফয়সলের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফয়সল অ্যান্ড কোম্পানি। এ বিষয়ে কথা বললে ডি এম ফয়সল কোনোরকম অনিয়ম-দুর্নীতি বা চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করলেও অন্য ঠিকাদারদের তার সঙ্গে সমঝোতা করতে হতো বলে স্বীকার করে। তিনি বলেন, ‘আমার আব্বাও ঠিকাদারি করতেন। আমাদের প্রতিষ্ঠানের অনেক বড় কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তাই সার কারখানা নির্মাণে বড় কিছু কাজ পেয়েছি।’ তবে বাবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তোতা মিয়া অ্যান্ড সন্সের নামে কোনো কাজ করেননি তিনি।

কারখানার কাজে ঠিকাদারদের কাছে বিভিন্ন সুবিধা নেওয়া প্রসঙ্গে এমপির স্ত্রীর ব্যবহারের জন্য হঠাৎ ৮০ লাখ টাকা দামের একটি ল্যান্ডত্রুক্রজার গাড়ি কেনা সম্পর্কে অনেকের চোখ কপালে উঠেছিল। গাড়িটি ঠিকাদারদের উপহার বলে কানাঘুষা চলে। তবে এমপি জোরালোভাবে তা অস্বীকার করে জানান, কুশিয়ারা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মালিক হিসেবে গাড়িটি কেনা হয়েছে।

জামায়াতপ্রীতি: ফেঞ্চুগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা ও বালাগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত সিলেট-৩ আসনে নবম সংসদে প্রথম এমপি হন কয়েস। ২০০৮ সালের ওই নির্বাচনে তিনি বিএনপির শফি আহমদ চৌধুরীকে পরাজিত করার পর এলাকায় নিজের বলয় গড়ে তোলেন। ২০১৪ সালে দশম সংসদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি দলের পুরনো নেতাকর্মীদের এড়িয়ে নিজের লোকজনকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে থাকেন এবং তাদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াতঘেঁষা লোক রয়েছে বলে অভিযোগ আওয়ামী লীগের ভেতরে। তাদের অভিযোগ, এমপি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চান বলে ১৪ বছর ধরে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কোনো ইউনিয়নে নির্বাচন হয়নি। ২০১৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলেও নির্বাচন হয়নি শেষ পর্যন্ত। আবদুস সালাম নামের মানিকোনা গ্রামের এক বাসিন্দা সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত বিষয়ে উচ্চ আদালতে মামলা করলে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ ২০১০ সালের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী জামায়াতের সাইফুল্লাহ আল হোসাইনকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জামায়াতের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত সালাম উপজেলা চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠজন।

আরও পড়ুন  স্বর্ণজয়ী সুপি’র এগিয়ে যাবার গল্প

নবম সংসদে প্রথম দফায় বিপুল ভোটে কয়েস এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর দক্ষিণ সুরমা উপজেলায়ও এক জামায়াত নেতা চেয়ারম্যান হন। সে সময়ে দুটি উপজেলায় স্রোতের বিপরীতে দুই জামায়াত নেতার বিজয়ী হওয়ার পেছনে এমপি কয়েসের হাত ছিল বলে আওয়ামী লীগের অনেকেই জানিয়েছেন।

এমপির চেষ্টাতেই আগের তিনটির স্থলে এখন ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়ন হয়েছে। এর দুটি চলছে সরকারের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসক দিয়ে। ইউনিয়ন নির্বাচন না হওয়ার জন্য ‘মামলার বাধা’ উল্লেখ করা হলেও বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান চেয়ারম্যানদের সুবিধা দেওয়ার কথা শোনা যায়। ২০০৩ সালের ১ মার্চ উপজেলার তিন ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতারা চেয়ারম্যান হন। সদর তথা ফেঞ্চুগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জামায়াতের জাহিরুল ইসলাম মুরাদের বাবা কনাই মিয়া মুক্তিযুদ্ধালে পাক-বাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঘিলাছড়া ইউনিয়নে নির্বাচিত চেয়ারম্যান পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে আছেন জামায়াতের বাবুল হোসেন। আর মাইজগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

অসন্তোষ :দেশে নানা ক্ষেত্রে যখন উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে তখন সিলেট-৩ নির্বচনী এলাকার তিন উপজেলায় উন্নয়নচিত্রে এলাকাবাসীর হতাশা লক্ষ্য করা যায়। ফেঞ্চুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি এবিএম কিবরিয়া ময়নুল  বলেন, ‘এলাকার উন্নয়নের চিত্র তো সবাই দেখতেই পারছেন। অনিয়ম-দুর্নীতির নানা কথাও এলাকার মানুষের জানা।’

ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারের এক কাপড় ব্যবসায়ী বলেন, এলাকার রাস্তাঘাটের চিত্র দেখলেই বুঝতে পারবেন কেমন উন্নয়ন হচ্ছে। বাস্তব চিত্র দেখার জন্য তিনি মাইজগাঁও রেলওয়ে স্টেশন থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা পর্যন্ত ভাঙাচোরা সড়ক দেখে আসার পরামর্শ দেন।

আরও পড়ুন  নাটোরে পৃথক দুর্ঘটনায় তিন জনের মৃত্যু

ফেঞ্চুগঞ্জ নিজের উপজেলা বলে নিয়মিত আসা-যাওয়া করলেও নির্বাচনী এলাকার অন্য উপজেলা দক্ষিণ সুরমার প্রতি এমপি কয়েস উদাসীন বলে খেদ শোনা যায়। বিভিন্ন সময়ে উন্নয়নের অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও তার সিংহভাগই বাস্তবায়িত হয়নি বলে জানালেন উপজেলার গহরপুরের এক বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘গহরপুর, জালালপুর, কটালপুরসহ আশপাশের এলাকার রাস্তাঘাট দেখলেই বুঝবেন কেমন এমপির উন্নয়ন।’

এমপির ব্যবহার নিয়েও দলে ও দলের বাইরে লোকজনের অভিযোগ রয়েছে। দক্ষিণ সুরমা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রইছ আলী  বলেন, এমপি সাহেব বা লিডার বললে তিনি নাখোশ হন। ‘স্যার’ বা ‘চৌধুরী সাহেব’ বললে খুশি হন। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তো এসব বোঝে না, তাই তার কাছে সমাদর পায় না।

দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু জাহিদ  বলেন, ‘এমপি কয়েস জনবিচ্ছিন্ন এবং দালালনির্ভর রাজনীতিতে ব্যস্ত। তিনি মানুষের সঙ্গে যে ব্যবহার করেন, তা রাজনীতিবিদসুলভ নয়।’

২০১৫ সালের ৯ মে ফেঞ্চুগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জনপ্রিয় লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে ‘চাবুক মারার’ কথা বলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন এমপি কয়েস। উপজেলা সদরে একটি কমিউনিটি সেন্টারে হাজি সাজ্জাদ আলী কল্যাণ ট্রাস্টের মেধাবৃত্তি বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি যদি বড় কিছু হতাম তাহলে জাফর ইকবালকে কোর্ট পয়েন্টে ধরে এনে চাবুক মারতাম।’ এমপি কয়েস নিজেও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিন্ডিকেট সদস্য। তার ওই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়েছিল।

এমপির বক্তব্য: এত সব অভিযোগ সম্পর্কে এমপি মাহমুদ-উস- সামাদ চৌধুরী কয়েসের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট বলেন, শাহজালাল সার কারখানা নির্মাণে তিনি বা তার কেউ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। এমপি সমকালকে বলেন, ‘এই কারখানা নির্মাণের সময় যাতে কোনো সমস্যা না হয়, স্থানীয় এমপি হিসেবে আমাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। মূলত চীনের প্রতিষ্ঠান এই কারখানা নির্মাণ করেছে, যার প্রতিটি ধাপে টেন্ডার থেকে সবকিছু তারাই করেছে।’ তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে তা মিথ্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট দেখলেই তা বোঝা যাবে।

তথ্যসুত্র: সমকাল

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ