সিলেট ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
প্রকাশিত: ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০১৬
আহমদ মারুফ : প্রাণঘাতি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিত্তশালী পরিবারের টগবগে তরুণেরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে সবার অজান্তে জঙ্গি হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি গুলশান হলি আর্টিজানে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। উদ্বেগ-অস্থিরতা এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে।
আবাসিক হল, মেস বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন স্থান থেকে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। নজরদারিতে রাখা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ট্রাস্টি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী। তারা কি করছেন, তাদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেন, তাদের ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একাউন্ট ও সম্ভাব্য ই-মেইল রয়েছে গোয়েন্দাদের টেবিলে। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ ও হিজবুত তাহরীরসহ দেশীয় সংগঠনের ফেইসবুক পেজে কারা কারা লাইক দিয়েছিলেন তারাও রয়েছে গোয়েন্দাদের নজরে। এমন পরিস্থিতিতে এক দিকে যেমন আতঙ্কিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, তেমনি ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। কঠোর নজরধারীতে বিকশিত এ শিক্ষা খাতের ভবিষ্যৎ মুখ থুবড়ে পড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক অভিভাবক ঝামেলা এড়াতে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে তারা সন্তানদের উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দেশের বাইরে পাঠাচ্ছেন। এতে করে লাভবান হবে প্রতিবেশী দেশসহ অনেক দেশ। একই সাথে অনিশ্চয়তা নেমে আসবে বেসরকারি উদ্যোগে বিকাশমান এ শিক্ষা ব্যবস্থায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ৫১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জঙ্গি কানেকশনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে এর মধ্যে ১৭টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, ৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ১৩টি ইংলিশ মিডিয়াম কলেজ, ৬টি সরকারি কলেজ, ৯টি বেসরকারি কলেজ ও ৩টি কোচিং সেন্টার। আর সন্দেহের তালিকায় ১০৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কলেজের সংখ্যাই বেশি। এছাড়াও বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টারও এ তালিকায় রয়েছে।
তার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলোÑজঙ্গি কানেকশনের সন্দেহে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি স্কুলের নাম রয়েছে। যা শুধু প্রশাসনই নয়, অভিভাবকদেরও আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, খোদ শিক্ষকরাই স্কুলের টিনএজার শিক্ষার্থীদের জঙ্গি মতবাদে মোটিভেট করছেনÑএমন খবর তাদের কেউই প্রথমে বিশ্বাস করেনি। তবে পরে খোঁজখবর নিয়ে যে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে সবার চোখই কপালে উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জঙ্গি কানেকশনের এ ইস্যুটি এখন মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতে চাকরি করাও কঠিন হবে বলে মনে করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা।
বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব এবং বিকাশ শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। পথ-পরিক্রমায় বর্তমানে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার এক অপরিহার্য ঠিকানায় পরিণত হয় এসব বিশ্ববিদ্যালয়।
ব্যঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠে বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নিজস্ব ক্যাম্পাসসহ নানভ শর্ত পূরণ করার কথা থাকলেও মাত্র ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ১৫ বছরে কিছু শর্ত পূরণ করে। বাকীগুলোর একটিও নিজস্ব ক্যাম্পাসের শর্ত পূরণ তো দূরের কথা তারা বাসাবাড়ির ফ্ল্যাট, শপিং সেন্টারে, গার্মেন্টস এর উপরে বা নিচে ঘর ভাড়া করে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসা চালাতে থাকে। মুনাফার জন্য এ সকল বিশ্ববিদ্যালয় সার্টিফিকেট বিক্রির ব্যবসা চালায়। দেশজুড়ে আউটার ক্যাম্পাস গড়ে তুলে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদনের জন্য ১ কোটি থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন হয়ে থাকে। ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা দিয়ে মিলছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট।
এছাড়া ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার নিয়োগের অনুমোদনের জন্য ৫০ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিদর্শনের জন্য ৫০ থেকে ১ লাখ টাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা, অনুষদ অনুমোদনের জন্য ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা, বিভাগ অনুমোদনের জন্য ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা, ভুয়া সার্টিফিকেটের জন্য ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা, টাকা দিয়ে অডিট করা হয় ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং অ্যাসাইন্টম্যান্ট বাবদ ৫শ’ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মাদ্রাসায় জঙ্গি তৈরি হয় এই ধারণা যখন প্রতিষ্ঠিত সেই ফাঁকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিত্তশালীদের মধ্যে জঙ্গি কানেকশনের খবরে কী ভাবছেন? Ñএমন প্রশ্নের জবাবে দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক, শিক্ষাবিদ-শিক্ষা গবেষক জানিয়েছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে বেশক’টি জঙ্গি হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিপথগামী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়ায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইতিমধ্যে ‘জঙ্গি তৈরির কারখানা’ অভিধায় আখ্যায়িত করার প্রয়াস শুরু হয়েছে। বিষয়টি মোটেই কাম্য নয়, এমনকি বেশ উদ্বেগের বিষয়।
নৈতিক শিক্ষার অভাব, মাতৃভাষা চর্চা না থাকা, ইতিহাস না-পড়া বা না-জানা, সামাজিক-সংস্কৃতির শিক্ষা না থাকার কারণ উল্লেখ করে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন, শিক্ষার্থীদের আলোকিত ও দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য সিলেবাসের বইগুলোই যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীর নৈতিক, মানবিক ও সাংস্কৃতিক ভাবনাগুলো বিকাশের সুযোগ থাকতে হবে। ক্লাসে হাজির হলেই যেমন সবাই ছাত্র হয়ে যায় না, তেমনি কেবল ক্লাস নিলেই শিক্ষক হওয়া যায় না। মনে রাখতে হবে, শিক্ষকরা ছাত্রদের জীবন গঠনের দায়িত্ব পালন করেন। আদর্শহীন শিক্ষক কখনও কোনো ছাত্রের জীবনে আলো জ্বালাতে পারেন না।
তারা বলেন, এটা অনস্বীকার্য যে, বেশিরভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানের চর্চার জন্য নয়; বরং ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই স্থাপিত হয়েছে কোনো না কোনো বড় ব্যবসায়ীর পৃষ্টপোষকতায়। তারপরও দিনের শেষে, মূলত এটা একটা জ্ঞানচর্চা ও মানুষ গড়ার কারখানা। তাই আমাদের ভাবতে হবে, এসব প্রতিকূলতার কুপ্রভাব আমরা কীভাবে অতিক্রম করতে পারি।

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আব্দুল হক
ঢাকা অফিস : ২৩৪/৪ উত্তর গোড়ান, খিলগাঁও, ঢাকা ।
সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ, ১৪৯ আরামবাগ, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-৫৯৩৬৫৩, ০১৭১২-০৩৩৭১৫
E-mail: provatbela@gmail.com,
কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম
আমাদের সর্ম্পকে গোপনীয়তা যোগাযোগ
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি