বঙ্গবন্ধু শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস : রাষ্ট্রপতি

প্রকাশিত: ৮:১৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৯, ২০২০

বঙ্গবন্ধু শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস : রাষ্ট্রপতি

প্রভাতবেলা ডেস্ক:

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশ— এই দুই সত্তাকে যারা আলাদা করে দেখার চেষ্টা করেছেন, তারাই ব্যর্থ হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়। বঙ্গবন্ধু একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সত্তা, একটি ইতিহাস। জীবিত বঙ্গবন্ধুর মতোই অন্তরালের বঙ্গবন্ধু শক্তিশালী। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি থাকবে, এ দেশের জনগণ থাকবে, ততদিনই বঙ্গবন্ধু সবার অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

সোমবার (৯ নভেম্বর) জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সংসদের বিশেষ অধিবেশনে স্মারক বক্তৃতায় রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম শুরু হয়।

 

আরও পড়ুন: জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন শুরু

 

স্মারক বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর জাতির পিতার আদর্শকে ধারণ করে জাতি এগিয়ে যাক ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে, নোঙর ফেলুক বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলায়’। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের মানুষ। নিজে স্বপ্ন দেখতেন এবং মানুষকে স্বপ্ন দেখাতেন। দেশের মানুষের প্রতি তার আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস ছিল অপরিসীম। নিজের জীবন উৎসর্গ করে বাংলার মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান দিয়ে গেছেন। ঋণী করে গেছেন বাঙালি জাতিকে। মুজিববর্ষ পালনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন-কর্ম, চিন্তা-চেতনা ও দর্শন ছড়িয়ে দিতে হবে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের তরুণ প্রজন্মের কাছে।

এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সন্ধ্যা ৬টায় সংসদের বিশেষ অধিবেশন শুরু হয়। বিউগলে রাষ্ট্রপতির আগমনি অর্কেস্ট্রা বাজানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ৬টা ৭ মিনিটে সংসদ কক্ষে পৌঁছালে প্রথা অনুযায়ী জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যসহ অধিবেশন কক্ষে থাকা সবাই দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্মান জানান। এরপর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দেওয়া দুর্লভ ভাষণ সংসদ কক্ষে দেখানো হয়। এ সময় পুরো অধিবেশনে নেমে আসে পিনপতন নিরাবতা। ৬টা ৩৪ মিনিটে স্পিকারের পাশে রাখা ডায়াসে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন রাষ্ট্রপতি, যিনি গণপরিষদ ও দেশের প্রথম সংসদের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে আইনসভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন।

 

আরও পড়ুন: ‘স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতিই হচ্ছে বিএনপির গণতন্ত্র’

 

রাষ্ট্রপতি শুরুতেই দেশবাসীসহ দেশের বাইরে বসবাসরত প্রবাসীদের মুজিববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ-২০২০’ উপলক্ষে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে থাকতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গৌরবের বিষয়। এটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। এজন্য মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আমি আশা করি অধিবেশনের কার্যক্রম বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এছাড়া জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অধিবেশনে জাতির পিতাকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে আমরা নিজেরাও সম্মানিত হব।

আরও পড়ুন  যিলহজ্বের প্রথম দশক ও আইয়্যামে তাশরীক: যা কিছু করণীয়, বর্জনীয়

ভবিষ্যত প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর চেতনায় উজ্জীবিত করতে সবাইকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন বঙ্গবন্ধুর নীতি, আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে।

দেশের সাধারণ মানষকে বিভ্রান্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান আরও বলেন, স্বাধীনতার সুফল প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য। জনগণের ঐক্য, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ঐক্য। যে ঐক্য একাত্তরে আমাদেরকে এক করেছিল, সেই ঐক্যই গড়ে তুলতে হবে সাম্প্রদায়িকতা, অগণতান্ত্রিকতা, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে।

 

আরও পড়ুন: শপথ নিয়েছি, গণতন্ত্রকে উদ্ধার করবো : ফখরুল

 

তিনি বলেন, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে আমরা যে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি, তাকে রক্ষা করতে হবে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। যারা বাস্তবকে অস্বীকার করে কল্পিত কাহিনী ও পরিস্থিতি বানিয়ে দেশের সরলপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে দেশের শান্তি ও অগ্রগতিরধারাকে ব্যাহত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই প্রতিষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা, সার্থক হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন।

‘মুজিববর্ষ’ পালনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারকে এবং বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের জন্য স্পিকার ও জাতীয় সংসদের সবাইকে ধন্যবাদ জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, চলমান করোনা পরিস্থিতিতে বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আমি আশা করি অধিবেশনের কার্যক্রম বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। সীমিত সময় ও পরিসরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তার জীবন ও কর্মের বিস্তৃতি এতটাই বিশাল যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন আলোচনা করলেও তা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

স্মারক বক্তৃতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন তুলে ধরে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত, দুর্নীতি ও শোষণহীন সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ। জাতির পিতার দর্শন ছিল ‘বাংলার মানুষের মুক্তি। সেই মুক্তি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি। কিন্তু কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। পরিকল্পিত উন্নযনের ওপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধু আধুনিক রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন, যা দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) প্রতিফলিত হয়েছিল।

আরও পড়ুন  প্রভাতবেলা প্রীতি সম্মিলন ১৮ নভেম্বর

 

আরও পড়ুন: সীমান্তের ওপারে খাসিয়াদের হাতে আকবর পাকড়াও( ভিডিও)

 

আবদুল হামিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ ২০১৫ সালে এমডিজির অধিকাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ নিম্ন মধ্যমআয়ের দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ সলে প্রথমবারের মত স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ উত্তীর্ণ হওয়ার সব শর্ত পূরণ করেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। কিছু কিছু সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ আজ এশিয়ার সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ। এই অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে হবে। জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশকে রাষ্ট্রপতি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সসম্মানে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য পুনরায় আহ্বান জানান।

স্মারক বক্তৃতার শেষাংশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যোতি কবিতার কিছু অংশ পাঠ করে বলেন— ‘ভেঙেছে দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়/ তোমারি হউক জয়/ তিমির বিদার উদার অভ্যুদয়/ তোমারি হউক জয়।…… প্রভাব সূর্য এসেছ রুদ্র সাজে/ দুঃখের পথে তোমার তূর্য বাজে/ অরুণ-বহ্নি জ্বালাও চিত্ত মাঝে, মৃত্যুর হোক লয়/ তোমারি হউক জয়।’

বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুকে অভিন্ন সত্তা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে জানতে হলে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে হবে, বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। এই দুই সত্তাকে আলাদাভাবে দেখার চেষ্টা যারা করেছেন, তারা ব্যর্থ হয়েছেন। আজকের বাস্তবতা এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যারা বাস্তবকে অস্বীকার করে কল্পিত কাহিনী ও পরিস্থিতি বানিয়ে দেশের সরলপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে দেশের শান্তি ও অগ্রগতির ধারাকে ব্যাহত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ