বিএনপির পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ: একটি বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: 8:24 PM, March 30, 2026

খন্দকার ছাদেকুর রাজা

(প্রিন্ট সংস্করন থেকে নেয়া)

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জাতীয় পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দীর্ঘকাল ধরে প্রভাবশালী পরিবারগুলোর বলয়ে আবর্তিত হচ্ছে। এই রাজনৈতিক কাঠামোটি মূলত একটি ‘প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট’ সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে এক ধরনের নব্য-সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে জিইয়ে রেখেছে।
পরিবারতন্ত্র কেবল একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন। একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মেধা এবং সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকা অপরিহার্য। তবে বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রায়ই নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের উত্তরাধিকারী সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে, যা রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পথকে ক্রমশ সংকুচিত করছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের কথা বলা হলেও ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি কুক্ষিগত হচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু পরিবারের হাতে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্বের বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে এই আশঙ্কাজনক চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিএনপির পরিবারতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করলে এই ধারার গভীরতা বোঝা যায়। ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত অন্তত ২২ জন সংসদ সদস্য ছিলেন প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য, যা ২০২৬ সাল নাগাদ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮ জনে উন্নীত হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে সিলেট—সর্বত্রই রাজনীতির ব্যাটন হস্তান্তরের এক উত্তরাধিকারী মহড়া চলছে। চট্টগ্রামের রাউজান অঞ্চলে চৌধুরী পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্য কিংবা সিলেটে উত্তরাধিকার সূত্রে মন্ত্রিত্ব লাভ-এ সবই মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীলতাকে প্রমাণ করে।
বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর দলীয় কাউন্সিল ছাড়াই তারেক রহমানকে দলপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় বিদেশে অবস্থান করে দলের ‘একক নেতা’ হিসেবে তাঁর এই অভিষেক বিএনপির পরিবারতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে শক্তিশালী করেছে। এছাড়া রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জাইমা রহমানের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জিয়ার পরিবারের বাইরে অন্য কারো জন্য শীর্ষ নেতৃত্বের পথ কার্যত রুদ্ধ।
জাইমা রহমানের চেয়ে বিএনপিতে অনেক যোগ্য ও দক্ষ ছাত্রনেতারা রয়েছেন যারা দেশকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারবেন; যারা ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং জুলাই বিপ্লবে যাদের অবদান অনেক বড়।
অপরদিকে শুধুমাত্র তারেক রহমানের মেয়ে বলে জাইমা রহমান, যিনি বাংলাটাও সঠিক করে বলতে পারেন না; বাংলাদেশের রাজনীতিতে যার ন্যূনতম অবদানও নেই। তবুও রাজতন্ত্রের ন্যায় তিনি দলের নীতি নির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। কারণ তিনি তারেক রহমানের মেয়ে; এটাই একমাত্র যোগ্যতা, এছাড়া তার আর কোনো পরিচয় নেই।
জুলাই থেকে শুরু করে অসংখ্য বিপ্লব সংগ্রামে হাজারো নারী নেতৃত্ব দিয়েছেন। যাদের ত্যাগ, যোগ্যতা, সংগ্রাম জাইমাকে বহুগুণে ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু আমরা কেউই তাদের মূল্যায়ন করি না। আমরা দাস হতে পছন্দ করি, আমাদের শিরায় উপশিরায় দাসত্বের রক্ত বহমান। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব শুধুমাত্র কোটা থেকে বাংলাদেশকে মুক্তির আন্দোলন ছিল না। জুলাই ছিল বাংলাদেশকে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে মুক্তির বিপ্লব। কিন্তু আমাদের মানসিক দাসত্বের কারণে জুলাই বিপ্লবের পরও বাংলাদেশ থেকে পরিবারতন্ত্রের বিষফোড়া দূরীভূত হচ্ছে না।
একটা বিষয় স্পষ্ট যে বিএনপিতে তারেক পরিবার যেন রাজপরিবার। ছাত্রদলের ডাকসু ভিপি প্রার্থী তারেক কন্যার সামনে একেবারে ভৃত্যের মতো নুইয়ে পড়ছে। রাজপরিবারের সামনে যেভাবে প্রজারা করে!
বিএনপির নেতা-কর্মীরা মানসিক দাসত্বপনায় লিপ্ত। তারা ধরেই নিয়েছে তারা হচ্ছেন দাস অথবা প্রজা আর রাজার পরে রাজকন্যা প্রধান হবেন। এর বাইরে কিছু ভাবার মানসিক স্বাধীনতাও নেই তাদের।
পরিবারতন্ত্রের সবচেয়ে ক্ষতিকারক দিক হলো এটি যোগ্যতাকে সরাসরি নিরুৎসাহিত করে। একজন মেধাবী ও সৎ কর্মী যখন দেখেন যে দক্ষতার চেয়ে পারিবারিক সম্পর্কই সাফল্যের মাপকাঠি, তখন তিনি নিরুৎসাহিত হন। এতে রাজনৈতিক দলের ভেতরে যোগ্য নেতৃত্বের খরা তৈরি হয় এবং রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়।। ফলে নেতৃত্বে এমন সব ব্যক্তির উত্থান ঘটে যাদের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার অভাব বিএনপি নেতৃত্বের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে এই পরিবারতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে একটি নীতি ও আদর্শভিত্তিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। রাজনীতি হতে হবে জনগণের সেবা করার মাধ্যম, কোনো পরিবারের ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নয়। সচেতন নাগরিক সমাজ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমেই কেবল এই বৃত্ত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

আরও পড়ুন  কবি বাসিত মুহাম্মাদের মৃত্যুঃ কিছু প্রশ্ন,কিছু স্মৃতি

লেখক: খন্দকার ছাদেকুর রাজা, সমাজকর্মী
ইমেইলঃ samiraza090@gmail.com

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন...

সর্বশেষ সংবাদ