শোকাবহ ২১ আগস্ট আজ

প্রকাশিত: ১:২৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০১৬

প্রভাতবেলা প্রতিবেদক: আজ সেই ভয়াল-বিভীষিকাময় ও রক্তাক্ত ২১ আগস্ট। ইতিহাসের সেই মর্মস্পর্শী বারুদ আর রক্তমাখা বীভৎস রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞের এক কলংকময় দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ত্রসবিরোধী এক জনসভায় শেখ হাসিনার ওপর সভ্যজগতের অকল্পনীয় এক নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। সেদিনে সেই গ্রেনেডের হিং¯্র দানবীয় সন্ত্রাস আক্রান্ত করে মানবতাকে। রক্ত-ঝড়ের প্রচ-তা সেদিন মলিন করে দেয় বাংলা ও বাঙালীর মুখ। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণ সেদিন মুহূর্তেই পরিণত হয় এক ভয়ঙ্কর-দানবীয় মৃত্যুপুরীতে। প্রসঙ্গত: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমবেশে গ্রেনেড হামলায় রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী ও তৎকালীন মহিলা আওয়ামী লীগের সভনেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত ও শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বর্বরোচিত হত্যাকা-ের দুঃস্ব স্মৃতিবিজড়িত শোকাবহ-রক্তাক্ত আগস্ট মাসেই আরেকটি ১৫ আগস্ট ঘটানোর টার্গেট থেকে ঘাতক হায়েনার দল গ্রেনেড দিয়ে রক্ত¯্রােতের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায়। ১৯৭৫ সালের মতোই সেই টার্গেটও ছিল এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বশূন্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করতেই ঘাতকরা চালায় এই দানবীয় হত্যাযজ্ঞ। জাতির সামনে আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধস্পৃহা। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে খোদ রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে চালানো হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভয়াল ও বীভৎস গ্রেনেড হামলা।
হিং¯্র শ্বাপদের ভয়াল ছোবলে সেদিন মানবঢাল রচনা করে নেতা-কর্মীরা বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা করতে পারলেও ওই নৃশংস হামলায় ঝরে পড়েছিল বেগম আইভি রহমানসহ ২৪টি তরতাজা প্রাণ। আহত হওয়া পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীর অনেকেই ঘাতক গ্রেনেডের প্রিন্টারের দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর দিকে। হাত-পা-চোখসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ হারিয়ে অসংখ্য নেতাকর্মী পঙ্গুত্ববরণ করে অমানবিক জীবনধারণ করছেন। ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র ও বঙ্গবন্ধুর আহ্লালধন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ হানিফ মাথায় বিঁধে থাকা প্রিন্টারের যন্ত্রণা ভোগ করেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তবে এতসব খারাপ খবরের মধ্যেও একটি সন্তোষজনক খবর হচ্ছে- অনেক দেরীতে হলেও বর্তমান সরকার ওই মামলাটির বিচার কাজে আত্মনিয়োগ করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, তার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ও কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ পলাতক ১৭ আসামির অনুপস্থিতিতেই শুরু হয়েছে বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার কাজ। পলাতক আসামিদের ধরতে বিশ্বের সর্ব্বোচ পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল শিগগিরই রেড নোটিশ জারি করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আসামিসহ তাদের পরিবারের আমলনামা তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শেষ করেছে পুলিশ সদর দফতর। তাছাড়া আত্মগোপনে থাকা আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালানো হয়েছে। চার্জশিটভুক্ত আসামি এবং দুই পুলিশ কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান ও খান সাঈদ হাসানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ এসেছে বলেও জানা গেছে। এছাড়া চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে দুই জঙ্গি ভারতে ক্রসফায়ারে মারা গেছে।
মামলার বিচার সম্পর্কে জানতে চাইলে গ্রেনেড হামলা মামলার বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান এফএনএসকে জানান, বিচার প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার কাজ চলছে। আগামী মাসেই তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীসহ পলাতক ১৭ আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচার কাজ শুরু হবে। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাবে না উল্লেখ করে পলাতক আসামিদের ব্যাপারে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়াসহ অন্যান্য কার্যক্রম শেষ হয়েছে বলেও তিনি জানান। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু এফএনএসকে বলেন, অপরাধ করলে কাউকে ছাড়া দেয়া হবে না। তিনি বলেন, আইন সবার জন্যই সমান। গ্রেনেড হামলার আসামিরা যত বড় শক্তিশালীই হোক না কেন তাদের শাস্তি পেতেই হবে। শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে সরাসরি হাওয়া ভবন থেকে জঙ্গিদের ব্যবহার করা হয়েছিল। তিনি আরো বলেন, চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে। আসামিদের ধরতে শিগগিরই ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হবে।
অপরদিকে মামলটির তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ বলেছেন, গ্রেনেড হামলা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিদের ধরতে পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। যারা দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন তাদের কিভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়ও মামলাটির অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, গত ৩ জুলাই অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি চাঞ্চল্যকর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সম্পরক চার্জশিট দাখিল করেছে আদালতে। এ চার্জশিটে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। সম্পরক চার্জশিট দাখিল হওয়ার পরই আত্মগোপনে থাকা আসামিদের অবস্থান চিহ্নিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। শীর্ষ মহলের নির্দেশে পলাতক আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে গত বুধবার রাতে ভৈরব থেকে জঙ্গি সংগঠন হুজির আমীর ও শীর্ষ নেতা মাওলানা ইয়াহিয়াকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। গোয়েন্দা দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, তারা অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছে, মামলাটির অন্যতম আসামি তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছেন। দেশে জরুরি অবস্থার সময় তার বিরুদ্ধে থাকা মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি লন্ডন চলে যান। তারপর আর দেশে ফেরেননি তিনি। অপর গুরুত্বপূর্ণ আসামী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। তাছাড়া ওই দেশ থেকে তিনি লন্ডন যাওয়ার চেষ্টা করছেন। জরুরি অবস্থা জারির পরপরই হারিছ চৌধুরীও দেশ থেকে পালিয়ে যান। এছাড়া কুমিল্আ মুরাদনগরের বিএনপির সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ব্যাংকক, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার কানাডা, হানিফ পরিবহনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ হানিফ কলকাতা, ডিজিএফআই’র সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ডক্টর এটিএম আমিন দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা, মাওলানা তাজউদ্দিন ও তার ছোট ভাই রাতুল বাবু দক্ষিণ আফ্রিকা, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, আবদুল মালেক, শওকত হোসেন, ইকবাল হোসেন, মাওলানা আবু বকর, খলিলুর রহমান ও মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার ভারত ও পাকিস্তানে অবস্থান করছেন। তবে পুলিশের সাবেক ডিসি (পূর্ব) মোঃ ওবায়দুর রহমান, খান সাঈদ হাসান বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন।
সূত্রটি জানায়, আদালতে চার্জশিট দাখিলের পরপরই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। পলাতক আসামিদের আদালতে হাজির হতে পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়। ইতিমধ্যে মামলাটি বিচারের জন্য বিচারিক আদালতে পাঠানোর আদেশ দেয়া হয়েছে। তিন-চার দিনের মধ্যে মামলার নথি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানোর কথা রয়েছে। মামলার প্রসিকিউটরসহ অন্য আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের পরপরই চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচার কাজ শুরু হবে। ইতিমধ্যে মামলার সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ শুরু হবে বলেও নিশ্চিত করেন কয়েকজন আইনজীবী। তবে মামলা চলাকালে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত থেকে শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন।
জানা যায়, গত মাসের প্রথম সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দফতরে নির্দেশ আসে পলাতক ও গ্রেফতার হওয়া আসামিদের আমলনামা তৈরি করতে। নির্দেশ পেয়ে ইতমধ্যেই পুলিশ আসামিদের আমলনামা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া পুলিশের দুই কর্মকর্তা খান সাঈদ হাসান ও ওবায়দুর রহমান আসামি হওয়ায় তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার নির্দেশ এসেছে। আগামী কিছু দিনের মধ্যেই তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দুজনকেই গ্রেফতার করতে পুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক টিম কাজ করে আসছে। আশা করি, অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। তাছাড়া বিদেশে পালিয়ে থাকা আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
অপরদিকি গত ৪ জুলাই পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদা, খোদা বক্স চৌধুরী ও শহীদুল হক এবং ৬ জুলাই সিআইডির সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন, সিনিয়র এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান ও এএসপি আবদুর রশিদ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তাছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ওরফে ডিউক, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, ঢাকার ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মোঃ আরিফুল ইসলাম, মাওলানা মুফতি হান্নান, মাওলানা আবদুস সালাম, মুফতি আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির, মফিজুর রহমান ওরফে অভি, আবুল কালাম আজাদ, শরিফ শহিদুল ইসলাম ওরফে বিপুল, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে ডা. আবু জাফর, মাওলানা আবু তাহের, মাজেদ বাট, হোসাইন আহমেদ ওরফে তামিম, মুফতি মইন উদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, রফিকুল ইসলাম গাজী ওরফে সবুজ, উজ্জ্বল ওরফে রতন ও শাহাদাত উল্লাহ জুয়েলসহ ৩১ জন কারাগারে আটক রয়েছেন। আর দীর্ঘদিন ধরে হুজির অপর দুই সদস্য আনিসুল মোরসালিন ও মহিবুল মোত্তাকিন ভারতের তিহার কারাগারে আটক আছে। তাছাড়া মামলার অপর দুই আসামি আহসান উল্লাহ ওরফে কাজল ও উজ্জ্বল ওরফে রতন ভারতে ক্রসফায়ারে মারা গেছে বলে তাদের পরিবার দাবি করে আসছে।
সূত্রটি আরো জানায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করে। কিন্তু তদন্তে কোন কূলকিনারা না হওয়ায় ডিবি পুলিশ তদন্ত চালায়। তারাও ব্যর্থ হলে সিআইডি তদন্তের দায়িত্ব পায়। তদন্তের কয়েক দিন পরই পুলিশ জজ মিয়া নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে গ্রেনেড হামলার রহস্য উ ঘাটিত হয় বলে দাবি করে। শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদসহ আরও কয়েকজন অপরাধী আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল। জজ মিয়াকে দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও আদায় করা হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। তাছাড়া সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মোখলেছুর রহমানসহ কয়েকজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে এ মামলায় গ্রেফতার করে হয়রানি করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন করে মামলাটির তদন্তশুরু হয়। তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হন এ হামলার সঙ্গে সুব্রত বাইন গং বা জজ মিয়া জড়িত ছিল না। মূলত: জঙ্গি সংগঠন হুজি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে গ্রেনেড হামলা চালায়।
তারা নিশ্চিত হন, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নিতে হাওয়া ভবনসহ জোট সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতারা সিআইডিকে ইন্ধন যুগিয়েছে। অতপর ২০০৮ সালের ১১ জুন সিআইডি’র সিনিয়র এএসপি ফজলুল কবির ২২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুই মামলার চার্জশিট দাখিল করেন। মামলা দুটি একই বছর দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর হয়। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর আবারও নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ তদন্ত করে তথ্য পান, গ্রেনেড হামলার সঙ্গে হুজির পাশাপাশি হাওয়া ভবনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তারা হুজিদের ব্যবহার করে জোট সরকারের প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী ও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান এবং সিআইডির কিছু কর্মকর্তা। মামলাটি ভিন্ন খাতে পরিচালনা ও জজ মিয়া নাটক সাজানোর ঘটনায় সিআইডির সাবেক তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়।
আদলত সূত্রে জানা যায়, গ্রেনেড হামলার ব্যাপারে আদালতে জবানবন্দি দেন মুফতি হান্নান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, আরিফ হাসান সুমন, রফিকুল ইসলাম সবুজ, মাওলানা আবদুস সালাম, মাজেদ ভাট, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা সাব্বির, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম আহম্মদ ওরফে জিএম। জবানবন্দিতে তারা হাওয়া ভবনের কর্ণধারসহ অন্য আসামিদের নাম প্রকাশ করেন।
সিআইডির একটি সূত্র জানায়, সম্পুরক চার্জশিটে বলা হয়- মামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শন, জব্দকৃত আলামত, প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের স্বীকারোক্তি ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আওয়ামী লীগ প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে থাকে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ও সমমনা সাম্প্রদায়িক কিছু রাজনৈতিক দল এ নীতির ঘোর বিরোধী। বাংলাদেশ থেকে বহু মাদ্রাসার ছাত্র এবং কিছু আলেম আফগানিস্তানে তালেবানের পক্ষে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তারা সমরাস্ত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের মধ্যে মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মুফতি আবদুল হান্নান, মাওলানা শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির, মাওলানা শেখ ফরিদ, হাফেজ ইয়াহিয়া, মাওলানা আবু বক্কর, মাওলানা তাজউদ্দীন, হাফেজ আবু তাহের, হাফেজ জাহাঙ্গীর বদর অন্যতম।
চার্জশিটে বলা হয়- হুজি গঠন করে তারা তালেবান স্টাইলে জঙ্গি তৎপরতা শুরু করে। এছাড়া কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদীন, তেহরিক-ই-জিহাদীল ইসলামী (টিজেই), লস্কর-ই-তৈয়বা, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ও বার্মার আরাকানের রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনসহ (আরএসও) অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন তৎপরতা চালায়। জঙ্গিরা ২০০০ সালের জুলাই মাসের প্রথম দিকে মোহাম্মদপুর সুপার মার্কেট সংলগ্ন একটি অফিসে গোপন বৈঠক করে নীলনকশা চূড়ান্ত করে। অন্যদিকে সাবেক মন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সহোদর মাওলানা তাজউদ্দিন লস্কর-ই-তৈয়বা, তেহরিক-ই-জিহাদীল ইসলামী এবং হিজবুল মুজাহিদীনের সঙ্গে জড়িত। তার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এ নিয়ে ২০০৪ সালের প্রথম দিকে বনানীর হাওয়া ভবনে তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীর সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করে জঙ্গিরা। তদন্তে তারও প্রমান পাওয়া গেছে।
২১ আগস্টের সেই রক্তাক্ত ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মীনী ও তৎকালীন মহিলা আওয়ামী লীগের সভনেত্রী এবং বিশিষ্ট নারী নেত্রী আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৪ আগস্ট মারা যান। আহত হওয়ার পর প্রায় দেড় বছর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হেরে যান আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। রক্তাক্ত-বীভৎস ওই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় নিহত অন্যরা হলেন- শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব) মাহবুবুর রহমান, হাসিনা মমতাজ, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (সবার প্রিয় আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মোশতাক আহমেদ, লিটন মুনশি, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসিরউদ্দিন, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম।
উল্লেখ্য, তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকারের আমলে সারাদেশে বোমা হামলা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশী নির্যাতনের প্রতিবাদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে কেন্দ্রীয়ভাবে সন্ত্রাস বিরোধী এক সমাবেশের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিন বিকাল ৪টার দিকে সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশের পর শোক মিছিলের কর্মসূচি ছিল। বিকাল সাড়ে ৪টার মধ্যেই বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা বিকাল ৫টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছান। বরাবরের মতোই সেদিনও তিনি বুলেটপ্র“ফ মার্সিডিজ বেঞ্জ জিপ থেকে নেমে নিরাপত্তাকর্মী বেষ্টিত অবস্থায় ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে উঠে বক্তৃতা শুরু করেন। বক্তৃতায় দেশব্যাপী অব্যাহত বোমা হামলার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ২০ মিনিটের বক্তৃতা শেষে তিনি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারণ করে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে দক্ষিণ দিক থেকে মঞ্চকে লক্ষ্য করে একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। গ্রেনেডটি মঞ্চের পাশে রাস্তার ওপর পড়ে বিকট শব্দে বিস্ফারিত হয়। পরে একে একে আরো ১২টি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মুহূর্তের মধেই পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এ সময় কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতৃবৃন্দসহ দলীয় নিরাপত্তাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে গাড়িতে করে সুধা সদনে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় শেখ হাসিনাকে বহনকারী গাড়ির ওপরও গুলিবর্ষণ করা হয়। এছাড়াও পরে ঘটনাস্থল থেকে আরো তিনটি গ্রেনেড অবিস্ফারিত অবস্থায় পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন  এমরান চৌধুরীর বড় ভাই'র ইন্তেকাল

শোকাবহ ২১ আগস্ট আজ

প্রভাতবেলা প্রতিবেদক

আজ সেই ভয়াল-বিভীষিকাময় ও রক্তাক্ত ২১ আগস্ট। ইতিহাসের সেই মর্মস্পর্শী বারুদ আর রক্তমাখা বীভৎস রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞের এক কলংকময় দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ত্রসবিরোধী এক জনসভায় শেখ হাসিনার ওপর সভ্যজগতের অকল্পনীয় এক নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। সেদিনে সেই গ্রেনেডের হিং¯্র দানবীয় সন্ত্রাস আক্রান্ত করে মানবতাকে। রক্ত-ঝড়ের প্রচ-তা সেদিন মলিন করে দেয় বাংলা ও বাঙালীর মুখ। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণ সেদিন মুহূর্তেই পরিণত হয় এক ভয়ঙ্কর-দানবীয় মৃত্যুপুরীতে। প্রসঙ্গত: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমবেশে গ্রেনেড হামলায় রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী ও তৎকালীন মহিলা আওয়ামী লীগের সভনেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত ও শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বর্বরোচিত হত্যাকা-ের দুঃস্ব স্মৃতিবিজড়িত শোকাবহ-রক্তাক্ত আগস্ট মাসেই আরেকটি ১৫ আগস্ট ঘটানোর টার্গেট থেকে ঘাতক হায়েনার দল গ্রেনেড দিয়ে রক্ত¯্রােতের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায়। ১৯৭৫ সালের মতোই সেই টার্গেটও ছিল এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বশূন্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করতেই ঘাতকরা চালায় এই দানবীয় হত্যাযজ্ঞ। জাতির সামনে আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধস্পৃহা। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে খোদ রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে চালানো হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভয়াল ও বীভৎস গ্রেনেড হামলা।
হিং¯্র শ্বাপদের ভয়াল ছোবলে সেদিন মানবঢাল রচনা করে নেতা-কর্মীরা বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা করতে পারলেও ওই নৃশংস হামলায় ঝরে পড়েছিল বেগম আইভি রহমানসহ ২৪টি তরতাজা প্রাণ। আহত হওয়া পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীর অনেকেই ঘাতক গ্রেনেডের প্রিন্টারের দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর দিকে। হাত-পা-চোখসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ হারিয়ে অসংখ্য নেতাকর্মী পঙ্গুত্ববরণ করে অমানবিক জীবনধারণ করছেন। ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র ও বঙ্গবন্ধুর আহ্লালধন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ হানিফ মাথায় বিঁধে থাকা প্রিন্টারের যন্ত্রণা ভোগ করেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তবে এতসব খারাপ খবরের মধ্যেও একটি সন্তোষজনক খবর হচ্ছে- অনেক দেরীতে হলেও বর্তমান সরকার ওই মামলাটির বিচার কাজে আত্মনিয়োগ করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, তার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ও কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ পলাতক ১৭ আসামির অনুপস্থিতিতেই শুরু হয়েছে বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার কাজ। পলাতক আসামিদের ধরতে বিশ্বের সর্ব্বোচ পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল শিগগিরই রেড নোটিশ জারি করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আসামিসহ তাদের পরিবারের আমলনামা তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শেষ করেছে পুলিশ সদর দফতর। তাছাড়া আত্মগোপনে থাকা আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালানো হয়েছে। চার্জশিটভুক্ত আসামি এবং দুই পুলিশ কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান ও খান সাঈদ হাসানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ এসেছে বলেও জানা গেছে। এছাড়া চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে দুই জঙ্গি ভারতে ক্রসফায়ারে মারা গেছে।
মামলার বিচার সম্পর্কে জানতে চাইলে গ্রেনেড হামলা মামলার বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান এফএনএসকে জানান, বিচার প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার কাজ চলছে। আগামী মাসেই তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীসহ পলাতক ১৭ আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচার কাজ শুরু হবে। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাবে না উল্লেখ করে পলাতক আসামিদের ব্যাপারে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়াসহ অন্যান্য কার্যক্রম শেষ হয়েছে বলেও তিনি জানান। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু এফএনএসকে বলেন, অপরাধ করলে কাউকে ছাড়া দেয়া হবে না। তিনি বলেন, আইন সবার জন্যই সমান। গ্রেনেড হামলার আসামিরা যত বড় শক্তিশালীই হোক না কেন তাদের শাস্তি পেতেই হবে। শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে সরাসরি হাওয়া ভবন থেকে জঙ্গিদের ব্যবহার করা হয়েছিল। তিনি আরো বলেন, চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে। আসামিদের ধরতে শিগগিরই ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হবে।
অপরদিকে মামলটির তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ বলেছেন, গ্রেনেড হামলা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিদের ধরতে পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। যারা দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন তাদের কিভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়ও মামলাটির অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, গত ৩ জুলাই অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি চাঞ্চল্যকর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সম্পরক চার্জশিট দাখিল করেছে আদালতে। এ চার্জশিটে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। সম্পরক চার্জশিট দাখিল হওয়ার পরই আত্মগোপনে থাকা আসামিদের অবস্থান চিহ্নিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। শীর্ষ মহলের নির্দেশে পলাতক আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে গত বুধবার রাতে ভৈরব থেকে জঙ্গি সংগঠন হুজির আমীর ও শীর্ষ নেতা মাওলানা ইয়াহিয়াকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। গোয়েন্দা দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, তারা অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছে, মামলাটির অন্যতম আসামি তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছেন। দেশে জরুরি অবস্থার সময় তার বিরুদ্ধে থাকা মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি লন্ডন চলে যান। তারপর আর দেশে ফেরেননি তিনি। অপর গুরুত্বপূর্ণ আসামী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। তাছাড়া ওই দেশ থেকে তিনি লন্ডন যাওয়ার চেষ্টা করছেন। জরুরি অবস্থা জারির পরপরই হারিছ চৌধুরীও দেশ থেকে পালিয়ে যান। এছাড়া কুমিল্আ মুরাদনগরের বিএনপির সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ব্যাংকক, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার কানাডা, হানিফ পরিবহনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ হানিফ কলকাতা, ডিজিএফআই’র সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ডক্টর এটিএম আমিন দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা, মাওলানা তাজউদ্দিন ও তার ছোট ভাই রাতুল বাবু দক্ষিণ আফ্রিকা, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, আবদুল মালেক, শওকত হোসেন, ইকবাল হোসেন, মাওলানা আবু বকর, খলিলুর রহমান ও মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার ভারত ও পাকিস্তানে অবস্থান করছেন। তবে পুলিশের সাবেক ডিসি (পূর্ব) মোঃ ওবায়দুর রহমান, খান সাঈদ হাসান বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন।
সূত্রটি জানায়, আদালতে চার্জশিট দাখিলের পরপরই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। পলাতক আসামিদের আদালতে হাজির হতে পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়। ইতিমধ্যে মামলাটি বিচারের জন্য বিচারিক আদালতে পাঠানোর আদেশ দেয়া হয়েছে। তিন-চার দিনের মধ্যে মামলার নথি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানোর কথা রয়েছে। মামলার প্রসিকিউটরসহ অন্য আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের পরপরই চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচার কাজ শুরু হবে। ইতিমধ্যে মামলার সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ শুরু হবে বলেও নিশ্চিত করেন কয়েকজন আইনজীবী। তবে মামলা চলাকালে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত থেকে শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন।
জানা যায়, গত মাসের প্রথম সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দফতরে নির্দেশ আসে পলাতক ও গ্রেফতার হওয়া আসামিদের আমলনামা তৈরি করতে। নির্দেশ পেয়ে ইতমধ্যেই পুলিশ আসামিদের আমলনামা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া পুলিশের দুই কর্মকর্তা খান সাঈদ হাসান ও ওবায়দুর রহমান আসামি হওয়ায় তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার নির্দেশ এসেছে। আগামী কিছু দিনের মধ্যেই তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দুজনকেই গ্রেফতার করতে পুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক টিম কাজ করে আসছে। আশা করি, অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। তাছাড়া বিদেশে পালিয়ে থাকা আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
অপরদিকি গত ৪ জুলাই পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদা, খোদা বক্স চৌধুরী ও শহীদুল হক এবং ৬ জুলাই সিআইডির সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন, সিনিয়র এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান ও এএসপি আবদুর রশিদ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তাছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ওরফে ডিউক, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, ঢাকার ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মোঃ আরিফুল ইসলাম, মাওলানা মুফতি হান্নান, মাওলানা আবদুস সালাম, মুফতি আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির, মফিজুর রহমান ওরফে অভি, আবুল কালাম আজাদ, শরিফ শহিদুল ইসলাম ওরফে বিপুল, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে ডা. আবু জাফর, মাওলানা আবু তাহের, মাজেদ বাট, হোসাইন আহমেদ ওরফে তামিম, মুফতি মইন উদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, রফিকুল ইসলাম গাজী ওরফে সবুজ, উজ্জ্বল ওরফে রতন ও শাহাদাত উল্লাহ জুয়েলসহ ৩১ জন কারাগারে আটক রয়েছেন। আর দীর্ঘদিন ধরে হুজির অপর দুই সদস্য আনিসুল মোরসালিন ও মহিবুল মোত্তাকিন ভারতের তিহার কারাগারে আটক আছে। তাছাড়া মামলার অপর দুই আসামি আহসান উল্লাহ ওরফে কাজল ও উজ্জ্বল ওরফে রতন ভারতে ক্রসফায়ারে মারা গেছে বলে তাদের পরিবার দাবি করে আসছে।
সূত্রটি আরো জানায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করে। কিন্তু তদন্তে কোন কূলকিনারা না হওয়ায় ডিবি পুলিশ তদন্ত চালায়। তারাও ব্যর্থ হলে সিআইডি তদন্তের দায়িত্ব পায়। তদন্তের কয়েক দিন পরই পুলিশ জজ মিয়া নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে গ্রেনেড হামলার রহস্য উ ঘাটিত হয় বলে দাবি করে। শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদসহ আরও কয়েকজন অপরাধী আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল। জজ মিয়াকে দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও আদায় করা হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। তাছাড়া সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মোখলেছুর রহমানসহ কয়েকজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে এ মামলায় গ্রেফতার করে হয়রানি করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন করে মামলাটির তদন্তশুরু হয়। তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হন এ হামলার সঙ্গে সুব্রত বাইন গং বা জজ মিয়া জড়িত ছিল না। মূলত: জঙ্গি সংগঠন হুজি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে গ্রেনেড হামলা চালায়।
তারা নিশ্চিত হন, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নিতে হাওয়া ভবনসহ জোট সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতারা সিআইডিকে ইন্ধন যুগিয়েছে। অতপর ২০০৮ সালের ১১ জুন সিআইডি’র সিনিয়র এএসপি ফজলুল কবির ২২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুই মামলার চার্জশিট দাখিল করেন। মামলা দুটি একই বছর দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর হয়। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর আবারও নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ তদন্ত করে তথ্য পান, গ্রেনেড হামলার সঙ্গে হুজির পাশাপাশি হাওয়া ভবনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তারা হুজিদের ব্যবহার করে জোট সরকারের প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী ও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান এবং সিআইডির কিছু কর্মকর্তা। মামলাটি ভিন্ন খাতে পরিচালনা ও জজ মিয়া নাটক সাজানোর ঘটনায় সিআইডির সাবেক তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়।
আদলত সূত্রে জানা যায়, গ্রেনেড হামলার ব্যাপারে আদালতে জবানবন্দি দেন মুফতি হান্নান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, আরিফ হাসান সুমন, রফিকুল ইসলাম সবুজ, মাওলানা আবদুস সালাম, মাজেদ ভাট, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা সাব্বির, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম আহম্মদ ওরফে জিএম। জবানবন্দিতে তারা হাওয়া ভবনের কর্ণধারসহ অন্য আসামিদের নাম প্রকাশ করেন।
সিআইডির একটি সূত্র জানায়, সম্পুরক চার্জশিটে বলা হয়- মামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শন, জব্দকৃত আলামত, প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের স্বীকারোক্তি ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আওয়ামী লীগ প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে থাকে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ও সমমনা সাম্প্রদায়িক কিছু রাজনৈতিক দল এ নীতির ঘোর বিরোধী। বাংলাদেশ থেকে বহু মাদ্রাসার ছাত্র এবং কিছু আলেম আফগানিস্তানে তালেবানের পক্ষে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তারা সমরাস্ত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের মধ্যে মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মুফতি আবদুল হান্নান, মাওলানা শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির, মাওলানা শেখ ফরিদ, হাফেজ ইয়াহিয়া, মাওলানা আবু বক্কর, মাওলানা তাজউদ্দীন, হাফেজ আবু তাহের, হাফেজ জাহাঙ্গীর বদর অন্যতম।
চার্জশিটে বলা হয়- হুজি গঠন করে তারা তালেবান স্টাইলে জঙ্গি তৎপরতা শুরু করে। এছাড়া কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদীন, তেহরিক-ই-জিহাদীল ইসলামী (টিজেই), লস্কর-ই-তৈয়বা, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ও বার্মার আরাকানের রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনসহ (আরএসও) অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন তৎপরতা চালায়। জঙ্গিরা ২০০০ সালের জুলাই মাসের প্রথম দিকে মোহাম্মদপুর সুপার মার্কেট সংলগ্ন একটি অফিসে গোপন বৈঠক করে নীলনকশা চূড়ান্ত করে। অন্যদিকে সাবেক মন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সহোদর মাওলানা তাজউদ্দিন লস্কর-ই-তৈয়বা, তেহরিক-ই-জিহাদীল ইসলামী এবং হিজবুল মুজাহিদীনের সঙ্গে জড়িত। তার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এ নিয়ে ২০০৪ সালের প্রথম দিকে বনানীর হাওয়া ভবনে তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীর সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করে জঙ্গিরা। তদন্তে তারও প্রমান পাওয়া গেছে।
২১ আগস্টের সেই রক্তাক্ত ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মীনী ও তৎকালীন মহিলা আওয়ামী লীগের সভনেত্রী এবং বিশিষ্ট নারী নেত্রী আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৪ আগস্ট মারা যান। আহত হওয়ার পর প্রায় দেড় বছর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হেরে যান আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। রক্তাক্ত-বীভৎস ওই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় নিহত অন্যরা হলেন- শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব) মাহবুবুর রহমান, হাসিনা মমতাজ, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (সবার প্রিয় আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মোশতাক আহমেদ, লিটন মুনশি, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসিরউদ্দিন, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম।
উল্লেখ্য, তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকারের আমলে সারাদেশে বোমা হামলা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশী নির্যাতনের প্রতিবাদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে কেন্দ্রীয়ভাবে সন্ত্রাস বিরোধী এক সমাবেশের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিন বিকাল ৪টার দিকে সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশের পর শোক মিছিলের কর্মসূচি ছিল। বিকাল সাড়ে ৪টার মধ্যেই বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা বিকাল ৫টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছান। বরাবরের মতোই সেদিনও তিনি বুলেটপ্র“ফ মার্সিডিজ বেঞ্জ জিপ থেকে নেমে নিরাপত্তাকর্মী বেষ্টিত অবস্থায় ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে উঠে বক্তৃতা শুরু করেন। বক্তৃতায় দেশব্যাপী অব্যাহত বোমা হামলার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ২০ মিনিটের বক্তৃতা শেষে তিনি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারণ করে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে দক্ষিণ দিক থেকে মঞ্চকে লক্ষ্য করে একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। গ্রেনেডটি মঞ্চের পাশে রাস্তার ওপর পড়ে বিকট শব্দে বিস্ফারিত হয়। পরে একে একে আরো ১২টি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মুহূর্তের মধেই পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এ সময় কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতৃবৃন্দসহ দলীয় নিরাপত্তাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে গাড়িতে করে সুধা সদনে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় শেখ হাসিনাকে বহনকারী গাড়ির ওপরও গুলিবর্ষণ করা হয়। এছাড়াও পরে ঘটনাস্থল থেকে আরো তিনটি গ্রেনেড অবিস্ফারিত অবস্থায় পাওয়া যায়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ