হাওরপারে কৃষকের কান্না জেলেদের আহাজারি বাতাসে দুর্গন্ধ

প্রকাশিত: ২:০৯ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৫, ২০১৭

প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি সিলেট। বিল ঝিল হাওল টিলা পাহাড়ের অপূর্ব সমাহার এখানে। নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যের নয়নাভিরাম এই জনপদে মানুষের হাহাকার আহাজারি। বাতাস দুর্গন্ধ। পচা ধান গুল্ম লতাপাতা, মরা মাছ হাঁস কীট পতঙ্গের গন্ধে হাওরপাড়ের মানুষের নাভিশ^াস। অকাল বন্যায় বোরো ফসলহানি। মরে গেছে খামার বিল ঝিল হাওরের মাছ । মরছে হাঁস পাখি শামুক ঝিনুক জোঁক সহ নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী। হাওর পাড়ের জনপদে অন্যরকম নীরবতা । ফসল হারানোর বেদনায় কাতর কৃষকপরিবার। মাছ হারিয়ে নিরুপায় জেলে পরিবার। হাঁস হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যত শঙ্কায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খামারি পরিবার। থামছেনা কান্না হাওরপাড়ে। সব হারিয়ে দু’চোখের অশ্রুই হাওরপাড়ের মানুষের সম্বল। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে সিলেট জুড়ে বৃষ্টি বিরামহীন। ফল¤্রুতিতে অকাল বন্যা। তলিয়ে যায় হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ ও সিলেট মৌলভীবাজারের হাকালুকি পাড়ের বুরো চাষীরা পড়েন ক্ষতির মুখে। একই সাথে রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় সিলেট জুড়ে। সব ধরনের সবজিচাষ লন্ডভন্ড হয়ে যায় আগাম কালবৈশাখী তান্ডবে। বলা যায়, নি:স্ব কৃষক পরিবার। কৃষকের কান্না শেষ হতে না হতেই জেলে পরিবারে আহাজরি। আকষ্মিকভাবে বিল ঝিল হাওরে মাছের মড়ক। পানিতে ভাসছে মাছের শুভ্র লাশ। পানিতে বিষ। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। মাছ সেবনে নিষেধাজ্ঞা। এখানেই দুর্যোগ থামেনি। মরছে হাঁস। জলজ প্রাণী। এবার ক্ষুদ্র খামারী পরিবারে অসহায়ত্বের করুণ সুর। চলছে পানি পরীক্ষা নিরিক্ষা। উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার পুনর্বাসনের। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১০ টাকা কেজি ধরে চাল বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে সন্ধায় খালি হাতে ফিরছে কৃষক। বুকচাপা আর্তনােেদ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। স্ত্রী- সন্তান নিয়ে উপোস দিন রজনী কাটছে বহু কৃষক পরিবারে। হাওরপাড়ের মানুষের কান্না আহাজারি মিশ্রিত যাপিত জীবন নিয়েই এই

প্রভাতবেলা’র বিশেষ প্রতিবেদন করেছেন কবীর অাহমদ সোহেল

বুরো হারানো হাওরপাড়ের মানুষের কান্না
অকাল বন্যায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছে হাকালুকি পাড় ও সুনামগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত জনপদে।কৃষি বিভাগের তথ্যমতে এবছর মৌলভীবাজার জেলায় বোরো চাষ হয়েছে ৫৩ হাজার ৪শ’ ২৬ হেক্টর জমিতে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৭ হাজার ৪শ’ ৩২ হেক্টর। এর মধ্যে হাকালুকির তীরবর্তী কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১২ হাজার ৯শ’ ৩৫ হেক্টর বোরো ফসলের জমি। জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩০ হাজার ৮ শ’ ৩০ জন কৃষক। আর সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ১শ’ ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। সুনামগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ১ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে পচে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ টাকার অঙ্কে ১ হাজার কোটি াটাকা ছাড়িয়ে গেছে। জেলার ১১ উপজেলার সবকটি হাওরে পানি ঢুকে বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।। পজে গেছে বোরো ধান। একমাত্র ফসল হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় দিন কাটছে কৃষকদের। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওর, দিরাই উপজেলার তুফানখালী হাওর, বারাম হাওর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওর, ধর্মপাশার চন্দ্রর হাওর, মেঘনা হাওর, ঘুরমার হাওর, ছাতক উপজেলার জল্লার হাওর, নাইনদার হাওর, জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওর, দোয়ারাবাজারের বন্দেহারী বিল, তাহিরপুর ও শাল্লা উপজেলার বেশ কয়েকটি হাওরের ফসল তলিয়ে পচে গেছে।

হাকালুকিতে মাছ মরেছে ২৫ টন
হাকালুকি হাওরের পানিতে তলিয়ে থাকা ধান পচে অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। আধা কাঁচা ধান পচে গত কয়েকদিনে হাওরে গ্যাস সৃষ্টি হয়ে মাছ, গৃহপালিত হাঁস, শামুক, কাঁকড়াসহ নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী মারা যায়। কিন্তু দুদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়া অনুকূলে আসায় ও মৎস্য বিভাগ হাওরের পানিতে চুন ও ওষুধ ছিটালে পানির স্বাভাবিকতা ফিরে আসে।
শনিবার মৎস্য অধিদপ্তরের আয়োজনে মৌলভীবাজার শহরের শমসেরনগর রোডে মৎস্য অফিসে সম্মেলন কক্ষে আয়োজিদ এক সংবাদ সম্মেলনে এ সব তথ্য জানানো হয়।সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আ ক ম শফিক উজ-জামান জানান, ১৫ এপ্রিল থেকে হাকালুকি হাওরে মাছ মরে পানিতে ভেসে থাকতে দেখা যায়। এর মধ্যে কুলাউড়া উপজেলায় সাত টন, জুড়ী উপজেলায় আট টন এবং বড়লেখা উপজেলায় ১০ টন মিলে মোট ২৫ টন মাছ মারা গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এরপর মৎস্য বিভাগ মাছ মরার কারণ অনুসন্ধানে জানতে পারে হাওরের ধান পচে পানিতে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বিষক্রিয়ার ফলে পানির অক্সিজেন ও পিএইচ কমে গিয়ে অ্যামোনিয়া বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছ মরে যায়। হাওরের এ পরিস্থিতি পরিদর্শন করতে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সৈয়দ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সমন্বিত দল স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে হাকালুকি হাওর যান।
হাওরের তীরবর্তী ভূকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির বলেন, হাকালুকি হাওর কেবল এশিয়ার সর্ববৃহৎ হাওর নয়, দেশের সর্ববৃহৎ মিঠা পানির মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র। এবছর অকাল বন্যায় ধানের পচনে গ্যাস সৃষ্টি হয়ে ডিমওয়ালা মা মাছ, পোনা মাছ, হাঁস ও জলজ প্রাণীর মড়ক লেগেছে। ফলে মিঠা পানির এই মৎস্য প্রজননের হাওরটি হুমকির মুখে পড়ছে। হাকালুকির বিল ইজারাদার আনোয়ার হোসেন, আব্দুর রব কামাল, সমছির আলী সহ অনেকেই জানান বিলগুলোতে সরকারের রাজস্বসহ প্রায় কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তারা। বিলগুলোর সব মাছ মরে সাফ। কি করে ক্ষতি পোষাবেন তা ভেবে দিশাহারা। এদিকে হাকালুকিতে ৩ দিনের জন্য মাছ ধরা বন্ধ থাকায় প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। বাজার গুলোতে যেমন কম মাছ উঠছে তেমনি দামও চওড়া। তাছাড়া রোগ জীবাণুর ভয়ে মাছের ক্রেতাও কমে গেছে বলে জানালেন স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
সুনামগঞ্জের হাওরে জেলেদের কান্না
সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে আকস্মিক বন্যার পর মাছ ও হাঁস মারা যাওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। মরা মাছ ও হাঁস হাওরের পানিতে ভাসছে দেখা যাচ্ছে। মৎস্য বিভাগ বলছে এখন পর্যন্ত হাওরগুলোতে ৫০ টন মাছ মরেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সৈয়দ মেহেদী হাসান ওই এলাকার হাওরগুলো পরিদর্শন করেছেন। হাওরের এই অবস্থা স্থানীয়দের যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তেমনি হতবাকও করেছে। তাহেরপুর উপজেলার আনন্দপুর গ্রামের মনির মিয়া নামের এক ব্যক্তি জানান, গত ফেব্রুয়ারিতেই বিলের পানিতে ১০ কেজি কার্প মাছের ডিম ছাড়া হয়েছিল। প্রতি কেজি ডিম থেকে আড়াই লাখ মাছের পোনা হওয়ার কথা। কিন্তু এপ্রিলের শুরুর দিকেই সব ভেসে গেছে।
পরিদর্শনকালে তিনি দ্য ডেইলি স্টারের মৌলভীবাজার প্রতিনিধিকে মরা মাছের পরিমাণ সম্পর্কে জানিয়েছেন।আগামী এক সপ্তাহ মারা মাছ ও হাঁস না খেতে স্থানীয়দের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে গতকালও এলাকাগুলোতে মাইকে প্রচারণা চালানো হয়েছে। সিলেটের মৎস্য বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, মাছ না খাওয়ার পাশাপাশি হাওরে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতেও স্থানীয়দের অনুরোধ জানানো হচ্ছে।মেহেদী হাসান জানান, হাওরের বেশিরভাগ অংশের পানি এখনও দূষিত। তার মতে, প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত পানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সহায়ক হবে।

আরও পড়ুন  সিলেটে এন্টিজেন টেস্ট শুরু, ২০ মিনিটেই মিলবে ফল

ধান মাছের পর মরছে হাঁস
হাওরাঞ্চলে ধান গেল, মাছ গেল এবার মরছে খামারিদের হাজার হাজার হাঁস ও পাখি। মরে ভেসে ওঠা মাছ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খামারিদের হাঁস ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি মারা যাচ্ছে। এছাড়া সার্বিকভাবে সুনামগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোনার হাওর এলাকায় ধান, মাছ, হাঁস, পাঁখি পচে চারদিকে পূতিগন্ধময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বন্যার পানি কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দুর্গন্ধ। হাওর-নদীর পানি কালো হয়ে গেছে। তবে আশার কথা বৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে।
হাকালুকি ও সুনামগঞ্জের হাওরে হাওরে ব্যাপক হারে মাছের মড়কের পর এখন শুরু হয়েছে হাঁসের মড়ক। দূষিত পানি ও পচা মাছ খেয়ে মরছে হাঁস। গতকাল কথা হয় ছয়জন হাঁসের খামারির সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নূরপুর গ্রামের আজিজুল ইসলাম জানান, তাঁর ৮০০ হাঁসের মধ্যে ২০০, বুড়িস্থল গ্রামের আবদুল মুমিনের ৯৭০টির মধ্যে ২২০, ভৈষারপাড় গ্রামের কামাল হোসেনের ১ হাজার ১০টির মধ্যে ১৭৯, একই গ্রামের পবন মিয়ার ১২০০ হাঁসের মধ্যে ১৩৫, লালপুর গ্রামের নুরুল আমিনের ১ হাজার ৫০টি হাঁসের মধ্যে ৪৫০ এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার আলী আকবরের ২ হাজার হাঁসের মধ্যে মারা গেছে ৬০০।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, হাওর-নদী-জলাশয়ে মরে যাওয়া মাছ খেয়ে খামারিদের হাজার হাজার হাঁস ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি মারা যাচ্ছে। পচা মাছ খেয়ে এ পর্যন্ত উপজেলার পাইলগাঁও ইউনিয়নের পালপুরা বন হাওরের খামারি কাশেম মিয়ার খামারের চার হাজার হাঁসসহ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে পাঁচ হাজারের বেশি হাঁস মারা গেছে। খামারি কাশেম মিয়া চোখের সামনে হাঁসগুলোর মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। এনজিও থেকে উত্তোলনকৃত ঋণের টাকায় হাঁস কিনে ডিম বিক্রি করে সংসার চালানোর আশা করেছিলেন তিনি। হাঁসপালনকারী অন্যান্য হাওরবাসীরও একই অবস্থা।
এদিকে পচা ফসল, মরা মাছ, মরা হাঁস ও পাখির মরদেহের দুর্গন্ধে হাওর ও নদীর পারে বসবাসকারী মানুষ পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। হাওর ও নদীর সাদা পানি কালো হয়ে গেছে। মানুষ নদী ও হাওরের পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। যাবতীয় কাজ সারতে হচ্ছে নলকূপের পানি দিয়ে।
প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা প্রসঙ্গে হাওর-অধ্যুষিত উপজেলাগুলোর মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পানিতে চুন ছিটালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতো। কিন্তু মানুষের কাছে তো চুন কেনার টাকা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে জেলা মৎস্য বিভাগকে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা এই টাকা দিয়ে জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরে কিছু চুন ছিটিয়েছেন।

হাওরে পানি পরীক্ষা
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে গতকাল শুক্রবার পানি দূষণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য মৎস্য মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষজ্ঞ দল ৩টি বৃহৎ হাওরের পানি পরীক্ষা করেছেন। হাওরগুলো হচ্ছে তাহিরপুর ও ধর্মপাশার টাঙ্গুয়ার হাওর, তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওর এবং বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওর। এরমধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরে অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ কম এবং পানি স্বাভাবিকের কাছাকাছি পাওয়া গেছে, মাটিয়ান হাওর ও শনির হাওরে অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ একটু বেশি, তবে ঐ দুই হাওরের পানি দূষণের অবস্থারও কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞদলের নেতৃত্বদানকারী মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সৈয়দ মেহেদী হাসান।
এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের ৫ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং দুদক’র ৬ সদস্যের তদন্ত দল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত শনির হাওরের ডুবে না যাওয়া বাঁধের পরিমাপ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের দলের নেতৃত্বে রয়েছেন উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান। দুদক’র তদন্ত দলের নেতৃত্বে রয়েছেন দুদক পরিচালক বেলাল হোসেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা মৎস্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. রমজান আলী, সিলেট বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশারফ হোসেন, সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঙ্কও রঞ্জন দাস, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হারুন অর রশীদ, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানা, ভাইস চেয়ারম্যান সোলেমান তালুকদার প্রমুখ।

পচা ধান মরা মাছ হাঁস বাতাসে দুর্গন্ধ
চলতি বছর অকাল বৃষ্টি ও আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ এলাকার হাওরাঞ্চলের বিস্তির্ণ কৃষিভূমির বোরো ধান। তবে ধানের ক্ষতির পর হাওরাঞ্চলের দ্বিতীয় সম্বল মাছও সম্মুখীন হয়েছে দুর্যোগের।
মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা অংশে হাওরে নিমজ্জিত বোরো ধান পঁচে পানিতে সৃষ্টি হয়েছে বিষক্রিয়ার আর এর ফলে বড় মাছের পোনাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ মারা যাচ্ছে।
কৃষি ও মৎস সম্পদ সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ বছর হাওরে আগাম বন্যা দেখা দেওয়ায় আধাপাঁকা বোরো ধান ও গাছ পঁচে যায় এবং ধানক্ষেতে অতিমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগের ফলে পানিতে বিষক্রিয়া দেখা দেয়।
মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ‘অকাল বন্যায় তলিয়ে যাওয়া এইসব আধাপাকা ধান ও ধানগাছ পচে পানির গুণাগুণ নষ্ট করেছে। এছাড়া ধানগাছ এবং ঘাসে নিধনের বিষের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে হঠাৎ পানির পিএইচ (পটেনশিয়াল অব হাইড্রোজেন) কমে গিয়ে স্বাভাবিক ৭ মাত্রা থেকে পিএইচ ৫.৮ মাত্রায় নামায় অ্যামোনিয়ার পরিমান বৃদ্ধি এবং দ্রবীভূত অক্সিজেন হ্রাস (৫ পিপিএম) হওয়ায় ধান ও মাছ পচে হাওরের পানি দূষিত হয়ে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।’
গত মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাকালুকি হাওর এবং তীরবর্তী এলাকার বোরো ধান তলিয়ে যায়। এতে হাওরের বোরো ধান নষ্ট হয়ে যায়।
গত শুক্রবার থেকে আধাপাকা বোরো ধান পচে গিয়ে দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে হাওরের পানি দূষিত হয়ে যায়। এতে ব্যাপক হারে হাওরের রুই, বোয়াল, আইড়, গ্রাস কার্প, কালিয়ারা, বাউশসহ বিভিন্ন প্রজাতির বড় মাছ ও ছোট মাছের পোনা মরে পানিতে ভেসে ওঠা শুরু করেছে বলে স্থানীয়রা জানান।
হাকালুকির চকিয়া বিলের ইজারাদার আনোয়ার হোসেন জানান, গত দুই বছর ধরে চকিয়া বিলে মাছ ধরা বন্ধ ছিলো। এই দুই বছর ধরে বিলে রুই, কাতলসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১৫ লক্ষাধিক পোনা ছেড়েছিলেন তারা। চলতি বছরের শেষের দিকে আবার এই বিলে মাছ ধরা শুরু হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু এখন হাওরের পানি দূষিত হয়ে পুরো হাওর জুড়ে ব্যাপক হারে মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠছে। এতে করে তাদেরকে ব্যপক লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
তিনি আরও জানান, গত দুইদিন ধরে হাওরের প্রায় কয়েক কোটি টাকার মাছ মরে গেছে। হঠাৎ করে হাওরে মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠতে দেখে সংশ্লিষ্ট মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের অবহিত করেন তারা। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা ও উপজেলা মৎস্য বিভাগের কমকর্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এবং পানিতে চুনসহ বিভিন্ন ঔষধ প্রয়োগ করে পানি বিষমুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ কান্তি দাস সোমবার প্রভাতবেলাকে বলেন, ‘শনিবারের তুফানের পরই মাছ মরতে দেখা গেছে। পানির নিচে বোরো ধান পচে যাওয়ায় প্রচুর মাছ মরছে। অনেক বড় মাছ মানুষ ধরেছে। গতকাল (রোববার) সবচেয়ে বেশি মাছ মরেছে। পানিতে দুর্গন্ধ হয়ে গেছে।’
কুলাউড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ প্রভাতবেলাকে জানান, ‘হাওরে আকস্মিক বন্যায় বোরো ধান পচে দূর্গন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং ধান ক্ষেতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পানি দূষিত হয়ে যায়। বন্যায় দুর্গন্ধ ও কীটনাশকের বিষ পুরো হাকালুকি হাওরে ছড়িয়ে পড়ে। পানি দূষিত হয়ে যাওয়া হাওরের মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠছে। আমরা হাওরের পানি বিষমুক্ত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। স্থানীয় জেলেদেরকে আপাতত হওরের মাছ না ধরার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।’
বড়লেখা উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস কর্মকর্তা আবু ইউসুফ প্রভাতবেলাকে বলেন, সোমবার সরেজমিনে হাওর ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে মাছ মারা যাবার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। হাওরের পানিতে প্রচন্ড গন্ধ। পানির রঙ বদলে গেছে। যেখানে পানি গভীর সেখানে বাদামি রঙ এবং যেখানে কম পানি সেখানকার রং লাল ও কালচে হয়ে গেছে। মানুষ প্রচুর মাছ ধরেছে। কিন্তু সব মাছতো আবার ধরতেও পারেনি। তাই পচা মাছের গন্ধ পানিতে। ধারণা করা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১৫-২০ টন মাছ মারা গেছে।’
মৌলভীবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আকম শফিক-উজ্-জামান প্রভাতবেলাকে জানান, ‘কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী হাকালুকি হাওর এলাকায় চলতি বছরে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়। ধান আধাপাকা থাকা অবস্থায় পুরো হাওরের বোরো ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়। ধান আধাপাকা থাকার কারণে পানিতে পচে গিয়ে দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। এতে করে হাওরের পানিতে মারাত্মক বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ায় মাছ মরে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। আমরা দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

আরও পড়ুন  করোনা শনাক্তে বাংলাদেশকে ৫০০ কিট দিচ্ছে চীন

কারণ অ্যামোনিয়া গ্যাস নাকি অন্য কিছু?
হাওরে ধানের পর মাছ, এরপর মরতে শুরু করেছে হাঁস। হাওরবাসীর সারা বছরের জীবিকার সব অবলম্বনই শেষ হতে চলেছে। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়। পচা ধান ও মাছের উৎকট গন্ধ হাওর ছাপিয়ে জনবসতি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
গত দুই দিনের বৃষ্টিতেও দূষণের মাত্রা, উৎকট গন্ধ কমছে না। সরকারি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁচা ধান পচে এই গন্ধ হচ্ছে। আর ধান পচার কারণে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমেছে এবং অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে। ফলে মাছ মরে যাচ্ছে।
শুধু কাঁচা ধান পচে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, নাকি অন্য কিছু? উৎসের সন্ধানে গতকাল শুক্রবার সকালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সৈয়দ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল হাওর এলাকায় এসেছে। দিনভর সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, মাটিয়ান হাওর ও খরচার হাওরের পানি, দূষিত হয়ে মারা যাওয়া মাছসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে দলটি। ‘মাদার ফিশারিজ’ হিসেবে সংরক্ষিত টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী মেঘালয়ের পাদদেশে। বিশেষজ্ঞ দল সেখানে কোনো মরা মাছের সন্ধান পায়নি। তবে টাঙ্গুয়ার হাওরের পাশে ফসলি হাওর হিসেবে পরিচিত তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওর ও খরচার হাওরে পানিদূষণ পাওয়া গেছে। এ দুটো হাওরের ধান পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে পচেছে।
দূষণ ও গন্ধের উৎস মেঘালয়ের ইউরেনিয়াম ও কয়লাখনির বর্জ্য থেকে কি না, এর জবাবে সৈয়দ মেহেদী হাসান প্রভাতবেলাকে বলেন, ‘এটা এখন কোনোভাবেই বলা যাচ্ছে না। আমাদের সংগ্রহ করা নমুনা নিয়ে উচ্চতর পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে। তারপর বলা যাবে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা মনে করছি, কাঁচা ধান পচে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলে দূষণের মাত্রা কমার সম্ভাবনা আছে।’
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষণায়ও এ রকম কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, ‘ইউরেনিয়াম দূষণে মাছ মারা গেছে কি না, তা আণবিক শক্তি কমিশন ছাড়া আর কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না। তবে আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত যেসব তথ্যপ্রমাণ আছে, তাতে ইউরেনিয়াম দূষণের কোনো লক্ষণ পাইনি।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী প্রভাতবেলাকে বলেন, ‘গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের দ্য শিলং টাইমস খবর ছেপেছে যে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে ইউরেনিয়াম ও কয়লাখনি উত্তোলনের কারণে একটি নদীতে মাছ মরে যাচ্ছে। আমি মনে করি, ঢলের সঙ্গে সেই দূষিত পানি এসে হাওর-নদীর পানি দূষিত করছে।’ তাঁর মতে, এভাবে কখনো পানিদূষণ হয়নি কিংবা মাছ ও জলজ প্রাণী মারা যায়নি। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম নওশাদ আলমের মতে, হাওরে এর আগেও অনেকবার বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবেছে। তাই বলে এত ব্যাপক হারে মাছের মড়ক লাগেনি। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। মারাত্মক কোনো বিষক্রিয়া না হলে এভাবে মাছের মড়ক লাগতে পারে না বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে বিএফআরআইয়ের একদল বিশেষজ্ঞ ১১টি হাওরের মাছ ও পানির নমুনা পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, পানিতে অক্সিজেন কমে যাওয়া এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস বেড়ে যাওয়ার কারণে হাওরে মাছ মরছে।
বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা গতকাল শুক্রবার হাওরে মাছের মৃত্যু নিয়ে করা তাঁদের প্রাথমিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছেন। এতে বলা হয়েছে, পানির নমুনাগুলোতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে দশমিক শূন্য ১ থেকে দশমিক ৮ মিলিগ্রাম। সাধারণত নিরাপদ মাছ চাষের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে ৫-৮ মিলিগ্রাম থাকার কথা। নমুনায় কয়েকটি জায়গায় দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যের কাছাকাছি ছিল। ওই পানিতে মাছের পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিন। টানা কয়েক দিন পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্য থাকলে সেখানে মাছের মড়ক লেগে যায়।
বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক বলেন, গাছের পচনে অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়াও মাছের মড়কের অন্যতম কারণ। নমুনায় পানিতে বিষাক্ত অ্যামোনিয়ার পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে দশমিক ৪ থেকে দশমিক ৬ মিলিগ্রাম। সাধারণত পানিতে বিষাক্ত অ্যামোনিয়ামের পরিমাণ প্রতি লিটারে দশমিক শূন্য ২ মিলিগ্রামের বেশি থাকলে মাছের জন্য তা অসহনীয়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ