সিলেট | |
প্রকাশিত: 7:12 PM, January 8, 2017
((শাহবাগী হুজুরকে নিয়ে না বলা কথা-০৬))
মাওলানা মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, কাতার: উসতাদুল আসাতিজা মারহুম আজিজুর রাহমান শাহবাগীকে নিয়ে আজ লিখবো এমন একটা বিষয় সম্পর্কে, যা নিয়ে তিনি বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলেন। আমি তখন সুজাউল মাদ্রাসার কামেল শ্রেণীতে অধ্যয়নরত । মাদ্রাসা ছাত্র সংসদের জিএস। সাথে বড়লেখা উত্তর সাংগঠনিক থানা শিবিরের সভাপতি। গতকাল আমার মাদ্রাসায় যাওয়া হয়নি এবং আমি সুজাউল এলাকায়ও ছিলাম না। পরদিন যখন মাদ্রাসায় পৌছি, তখন ১০টা ছুই ছুই। আামি মাদ্রাসায় পৌঁছেছি সরাসরি বড়লেখা থেকে। মাদ্রাসার সামনের রাস্তায় পৌঁছেই কেমন যেন মনে হলো। অবস্থাটা সচরাচর যেমন দেখা যায়, তেমন নয়। অনেক ছাত্র মাদ্রাসা ক্যাম্পাসের বাহিরে রাস্তায় হাটাহাটি করছে-যা কখনই হয়না। সকাল ১০টার মধ্যে সবাই মাদ্রাসায় পৌছে, ক্লাস শুরু হয়-সাধারণতঃ এই সময়ে কোন ছাত্রকে বাহিরে দেখা যায়না। কিন্তু এমন কি হলো? বড় একটা সংখ্যা বাহিরে ঘুরাঘুরি করছে। বিষয়টা নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরুর আগেই আমার চারপাশে ছাত্রদের ভীড় জমে উঠলো। তারা আমাকে জানালেন যে, গতকাল প্রিন্সিপাল মুহতারাম শাহবাগী হুজুরের পক্ষ থেকে একটা নির্দেশ জারি করা হয়েছে, যার সারমর্ম হলোঃ কোন ছাত্র প্যান্ট পরে মাদ্রাসায় আসতে পারবেনা। মাদ্রাসায় আসলে তাকে ক্লাসে করতে দেয়া হবেনা। মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন মাওলানা মুহিবুর রাহমান মারহুম-যাকে আমরা “ছতরনগরী হুজুর” বলেই ডাকতাম। তিনি ছাত্রদের পেন্ট পরা এবং মাথায় লম্বা চুল রাখা বিষয়গুলো খুবই কঠোর ভাবে দেখতেন।
কিন্তু শাহবাগী হুজুরকে এতো কঠোর হতে কখনো দেখিনি। আমি বুঝতে পারলাম যে, বিষয়টা ছতরনগরী হুজুর প্রিন্সিপালের মাধ্যমে করিয়েছেন। ছতরনগরী হুজুর খুবই ঠান্ডা প্রকৃতির লোক ছিলেন। কারো সাথে গরম বা উচ্চ আওয়াজে কথা বলেছেন এমনটা আমি কখনো দেখিনি বা শুনিনি। তার ব্যক্তিত্বটা এমন ছিল যে, তার সাথে কথা বলার মতো সাহস আমার ছিলনা। তিনি দুনিয়া কোন দিকে যাচ্ছে, তার কোন খবর রাখতেন না। তার পেশা এবং নেশা একটাই ছিল-তার ছাত্রছাত্রী। যথা সময়ে মাদ্রাসায় হাজির হওয়া, শিক্ষকদের সংশ্লিষ্ট ক্লাশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা, অনুপস্থিত শিক্ষকের ক্লাশে বিকল্প শিক্ষক পাঠানো, সন্ধ্যার পর কোন ছাত্র বাজারে বসে সময় নষ্ট করছে কিনা-তা দেখা এবং ছাত্ররা সিরাতে ছুরতে সুন্নতের অনুসারী কিনা তার তত্ত্বাবধান করা। সেই ছত্রনগরী হুজুর আমি ৯ম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় মাদ্রাসা চলাকালে সকল ছাত্রদের সামনে আমার চুল সামনে থেকে এক গোছা এমন ভাবে কেটে ছিলেন, যার কারণে আমার পুরো মাথাকেই ‘রোনাল্ডো স্টাইলে ’হেয়ার কাট করতে হয়।
চলে আসি মূল প্রসংগে। শাহবাগী হুজুরের গতকালের নির্দেশঃ কোন ছাত্র প্যান্ট পরে ক্লাসে আসতে পারবেনা। আমি এই নির্দেশটাকে খারাপ চোঁখে দেখতাম না। কারণ সময়ের ব্যবধানে মাদ্রাসা ছাত্রদের অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে, মাদ্রাসা ছুটির পর ছাত্ররা যখন টুপি খুলে নিতো, তখন সে যে মাদ্রাসা ছাত্র তা বুঝার কোন উপায় থাকতো না। আমি ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৮৯ সাল থেকে নিয়মিত ভাবে পায়জামা-পানজাবী পরি। সেদিন থেকে নিয়ে আজ অবধি (মাত্র ৩দিন বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া) আমাকে এই লেবাস ছাড়া অন্য লেবাস ধারণের প্রয়োজন হয়নি। আমি ছাত্রদের কাছ থেকে বিষয়টা জানার পর সবাইকে বাড়ীতে গিয়ে পায়জামা পানজাবী পরে আসার নির্দেশ দিলাম। ছাত্ররা হতাশ হয়ে গেলো। এর মাঝে বেয়াড়া কিছু ছাত্র ছিল। তারা বললো, পায়জামা নেই। বললাম, লুঙ্গি পরে আসুন। তারা বললো, নজরুল ভাই, আপনার কি মনে আছে সেই শ্লোকঃ “———- দেখা যায়”। আমাদের লুঙ্গির অবস্থা এমন যে, ——- দেখা যাবে। তখন যেন শাহবাগী হুজুর বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে না পড়েন।”
আমি পড়লাম মহা মুসিবতে। সকলের চাপাচাপিতে আমার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে গিয়ে পড়লো। আমাকে এক সময় বাধ্য হতে হলো শাহবাগীর সাথে আলোচনা করতে। কারণ সে সময় অনেক নেতৃস্থানীয় ছাত্র ছিলেন, যারা নিয়মিত পানজাবীর সাথে প্যান্ট পরতেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমি যে পায়জামা পরতাম, তা দেখতে পায়জামা হলেও আসলে ওটা ছিল প্যান্ট। রং সাদা হওয়ার কারণে ওটা বুঝা যেতো না। প্রায়ই আমাকে সফর করতে হতো। এজন্য পানজাবীর পকেট নিরাপদ ছিলনা বলে প্যান্টে লম্বা লম্বা পকেটও ছিল বটে। আমি শাহবাগী হুজুরের সাথে আলাপ করতে গেলাম। দেখে মনে হলো, তিনি যেন আমার প্রতিক্ষায়ই ছিলেন। তিনি উনার পক্ষ থেকেই বাহিরে অবস্থান নেয়া প্যান্ট পরা ছাত্রদের একহাত নিলেন এবং সুন্নাতে রাসুলের অনুসরণের উপর গুরুত্ব দিলেন এবং কড়া ভাষায় আমাকে নসিহত করলেন। যেন আমি ছাত্রদের বুঝাই। তারা যেন প্যান্ট ছেড়ে পায়জামা বা লঙ্গি পরে মাদ্রাসায় আসে। আমি শাহবাগী হুজুরের বক্তব্য শুনার পর তাঁর বক্তব্যের সাথে ১০০ ভাগ ঐকমত্য পোষন করে আমার অভিমত পেশ করতেই তিনি আমার উপর খুশী হয়ে গেলেন। তার চেহারার রাগান্বিত ভাব চলে গেলো, সন্তুষ্টির ভাব ফুটে উঠলো। আমি মওকা বুঝে হুজুরকে বললাম, হুজুর তলে তলে এরা কতটুকু দুষ্ঠু হয়েছে তা কল্পনাই করতে পারবেন না। ওদের অনেকেই আছে, যাদের প্যান্ট ছাড়া পায়জামা নেই। তাই তাদেরকে কমপক্ষে ১/২ সপ্তাহ সময় দিন। আর এই সময়টা তাদেরকে ক্লাস করার সুযোগ দিন । অনেক দেনদরবারের পর উনি রাজি হয়ে গেলেন। সুযোগ বুঝে আমি পাড়ি দিলাম দ্বিতীয় প্রসংগে। তখন আমার পরনে সাদা রঙের সেই পায়জামা-যা আসলে একটি সাদা প্যান্ট। আমার পরনের লম্বা পানজাবী প্যান্টের অর্ধেক ঢেকে আছে, তাই ওটা যে প্যান্ট, তা বুঝার সুযোগ নাই। শাহবাগী হুজুরকে বললাম, হুজুর! দেখেনতো আমার এই পায়জামাতে চলবে কিনা, না আমাকেও নতুন পায়জামা বানাতে হবে। তিনি বললেন, তুমিতো ঠিক আছো। তোমাকে নিয়ে গর্ব করি। কিন্তু তোমার চেলা (অনুসারী) যারা আছে, তারাতো এক একটা মুহমল, ছিরত নাই-ছুরত নাই, শুধু ইসলামী হুকুমাত করবে। বাবারে, ইসলামী হুকুমাত করতে হলে প্রথমে সাড়ে ৩হাত বডির মাঝে ইসলাম কায়েম করো।
আমি হুজুরের এই ধরণেরই একটি বক্তব্যের অপেক্ষায় ছিলাম বা সুযোগ খুঁজছিলাম। তার বক্তব্যের পর আদবের সাথে আমার পানজাবীটা উঠিয়ে উনাকে আমার পায়জামার পুরোটা দেখালাম এবং বললামঃ হুজুর! যদি এটা জায়েজ হয়ে থাকে, তাহলে কেবলমাত্র রং সাদা না হওয়ার কারণে অন্যদেরটা না জায়েজ কেন হবে? যদি কেউ নেওয়ারী (নেওর বা পায়জামার রশি) দিয়ে রঙ্গিন কাপড় দিয়ে পায়জামা বানায়, তাহলে তো আমার মনে হয় ওটাকেও আপনারা না জায়েজ বলবেন। শাহবাগী হুজুর আমার এই ধরণের আচরণের বা বক্তব্যের প্রত্যাশী ছিলেন না। তিনি রীতিমতো কিংকর্তব্য বিমুড়। কি বলবেন এখন আমাকে। বললেন, তোর ছোট কালের সেই দুষ্ঠুমী এখনো যায়নি। এখন বড় হয়েছো, এগুলো একটু ছাড়ো। আমি অত্যন্ত বিজ্ঞজনের মতো প্রসংগ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলাম। এই যাত্রা শাহবাগী হুজুর যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। এর পর প্যান্ট আর পায়জামার মাসলা সুজাউল মাদ্রাসায় আর উঠেনি। আমি চলে আসার পর কি হয়েছে জানিনা। তবে ২০১৫ সালে আমি একটা অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলাম সুজাউল মাদ্রাসায়। দেখলাম ছাত্রী যারা আছে, তারা ড্রেস কোড মেনে একই ধরণের ওড়না পরে এসেছে। কিন্তু ছাত্ররা সেই আগের মতোই আছে। তখনই মনে পড়েছিল শাহবাগী হুজুরের কথা। যদি সে দিন পায়জামার আইনটা জারি রাখা যেতো, তাহলে আজ ধবধবে সাদা পায়জামার সাথে কোন একই রঙের পানজাবী পরা বিশাল ছাত্র সমাবশে দেখতে পেতাম।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও আলেমে দ্বীন।

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আব্দুল হক
ঢাকা অফিস : ২৩৪/৪ উত্তর গোড়ান, খিলগাঁও, ঢাকা ।
সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ, ১৪৯ আরামবাগ, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-৫৯৩৬৫৩, ০১৭১২-০৩৩৭১৫
E-mail: provatbela@gmail.com,
কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম
আমাদের সর্ম্পকে গোপনীয়তা যোগাযোগ
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি