স্বপ্ন ভঙ্গের যন্ত্রণা আছে, আছে হাতভরা প্রাপ্তি

প্রকাশিত: ৮:৩১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০১৮

স্বপ্ন ভঙ্গের যন্ত্রণা আছে,  আছে হাতভরা প্রাপ্তি

 মাকসুদা লিসাঃ দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল  নিদাহাস ট্রফি ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের শোক গাঁথা স্মৃতি নিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছে সাকিব আল হাসানের দল। এবারের এই ফেরাটা অন্য রকম। গৌরবের। মাথা উঁচু করে ফেরা। বরণ করে নেবার। স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা আছে। সেই বেদনাকে পেছনে ফেলেছে অনেক প্রাপ্তি। অনেক অসম্ভবে সম্ভব করার গল্প।

বিশ্ব ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ ফিরেছে স্ব-মহিমায়। পরাজয়ের বৃত্ত থেকে বেড় হয়ে বাঘের থাবা বসিয়েছে প্রতিপক্ষের ঘাড়ে। সমালোচনার মোক্ষম জবাব দিয়েছে ব্যাটে-বলে।

সব চেয়ে বড় কথা, ক্রিকেটারদের লড়াই করার মানসিকতা। এক অপূর্ব, তেজস্বী শক্তি টাইগারদের জাগ্রত করেছে নবচেতনায়। নতুন উদ্দোমে। হার জিত থাকবেই। যা কিছু অর্জন কমতো নয়।

নিদাহাস ট্রফি বাংলাদেশকে দিয়েছে হাত ভরে। তবুও অন্তরে আপেক্ষ। চূড়ান্ত আনন্দ উদযাপনের সুযোগ হাত ছাড়া হবার। অল্পের জন্য হলো না। বড় কোন টুর্নামেন্টের ফাইনালে জয়ের এত কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ হাসিটা ধরে রাখা গেলনা।

অতৃপ্তি রয়ে গেল আবারও। কোটি হৃদয়ের হাহাকার। অশ্রু গড়ালো ক্রিকেট পাগল ভক্ত সমর্থকদের। বঞ্চিত হতে হলো চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে চুমু খাবার বাসনা।

অভিজ্ঞতা বলে একটা কথা আছে। বাংলাদেশ দল ক্রিকেটের বড় আসরের ফাইনালের চাপ নেবার মত ক্ষমতা, দক্ষতায় এখনও পিছিয়ে আছে। বাড়ছে আত্মবিশ্বাস। হারতে হারতে একদিন জিততে শিখো যাবে টিম বাংলাদেশ

এই বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ জয় করে তাক লাগালেও অবাক হবার কিছু থাকবেনা। তবে এনিয়ে পাঁচ পাঁচবার ফাইনালে পৌঁছে জয় হাতছাড়া হবার ব্যর্থতা পুড়ায় সবাইকে।

ফাইনালে হারার রেকর্ড বাড়ছে।

সদ্য সমাপ্ত নিদাহাস ত্রিদেশীয় এই টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট দেখে অনেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশকে মেলানোর চেষ্টা করছেন। উচ্চারণ করছেন ‘চোকার’ শব্দটি।

দক্ষিণ আফ্রিকা দলের নামের সাথে সমার্থ হয়ে আছে একটি শব্দ। চোকার। বিশ্বের বড় আসরে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভেঙে পড়ার জন্যই এই নাম যোগ হয়েছে। গত ১৫ বছরে দাপুটে এই দলটি আইসিসির ৯টি নক আউট ম্যাচে হেরেছে ভারতের বিপক্ষে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির বি‘ গ্রুপের শেষ ম্যাচটাও ছিল তাদের জন্য বাঁচা মরার লড়াই।

সেই ম্যাচেও বিশ্ব র‍্যাংঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকার অসহায়ত্ব বরণ। বারবার বড় আসর হতে ছিটকে পড়া। দক্ষিণ আফ্রিকা দলের নামের সাথে সমার্থ হয়ে আছে একটি শব্দ। চোকার। বাংলাদেশের ফাইনালের হারার ময়নাতদন্তে যাই বেড়িয়ে আসুক না কেন। সাধুবাদ দিতেই হবে ক্রিকেটারদের। এই অর্জনকে কোন ভাবেই খাটো করে দেখার নয়। এই আসরে গৌবরময় অর্জন প্রেরণা যোগাচ্ছে সামনে চলার।

শ্রীলঙ্কা তাদের স্বাধীনতার ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ ও ভারতকে নিয়ে আয়োজন করেছিল নিদাহাস ট্রফির। গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচেই ভারতের কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ। তবে শ্রীলঙ্কাকে দুবারই হারায় টাইগাররা। প্রথম ম্যাচে ২১৫ রান তাড়া করে টাইগারদের জয় এনে দেন মুশফিক আর অলিখিত সেমিতে বাংলাদেশকে দারুণ আরেকটি জয় উপহার দেন মাহমুদউল্লাহ

ফাইনালে হারের বড় কারন অনভিজ্ঞতা। ভারতের যেখানে অভিজ্ঞতার ভান্ডার পূর্ণ। সেখানে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করছে। বড় ম্যাচের চাপ, মানসিক শক্তি, গেম প্লান সবকিছুতে পিছিয়ে আছে টাইগার্স। ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে

আরও পড়ুন  কারাফটকে হাত নাড়ছেন পরী ,ডোন্ট লাভ মি বিচ

টপ অর্ডারদের ব্যাটিং ব্যর্থতা। বোলারদের বেহিসাবি রান দেবার প্রবণতা। বাজে ফিল্ডিংয়ের খেসারত দিতে হয়েছে।

 সাব্বির রহমানের ৭৭ রানের নান্দনিক ইনিংস। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের ছোট কার্যকরী ২১ রান। মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান ও লোয়ার মিডল অর্ডার  ব্যাটসম্যানদের দক্ষতায় শেষ পর্যন্ত ১৬৬ রান স্কোর বাংলাদেশের। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে লড়াই করার মত পুঁজি। ব্যাটিং খারাপ হবার পরও আস্থা ছিল। বোলাররা ববারবই ভাল করেন। অধিনায়ক সাকিব আল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান, রুবেল হোসেন, নাজমুল ইসলাম অপুর মত বোলাররা কারিশমা দেখাবেন। বাংলাদেশ দলের ফিল্ডিংয়ের মান ভাল। তবে মাঝে মাঝে নিজেদের মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন ক্রিকেটাররা। যার মাশুল দিতে হয় দলকে।

ফাইনালের দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশকে খুব অসহায় মনে হয়েছে। বোলিংয়ের বেহাল দশা। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের তান্ডবে দিশেহারা অবস্থা। অধিনায়ক সাকিব একজন দক্ষ স্পিনারের অভাব অনুভব করেছেন নিশ্চয়। এক সময় এমন মনে হয়েছে বোলিংয়ে কাকে আনবেন চিন্তার ফেলে দিয়েছে সাকিবকে। সৌম্য সরকারের মত আনকোরা, ওকেশনাল বোলারকে ব্যবহার করতে হয়েছে।

ভারতে সুন্দর, চাহালরা যে কাজটা করে দিখিয়েছেন দক্ষতায়। বাংলাদেশী বোলাররা সেখানে ছিলেন ম্রিয়মান। তাদের নিয়ে ছেলেখেলায় করেছেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। বল সীমানা ছাড়া করার প্রতিযোগিতায়। দাওয়ান, শর্মা, রাইনা, রাহুল, কার্তিক, বিজয়দের ঝড় তোলা ব্যাটিং। হতাশায় পুড়িয়েছে বাংলাদেশকে।

সাকিবের মত বিশ্বের সাবেক নাম্বার ওয়ান বোলারও পাত্তা  পাচ্ছিলেন না। ব্যাতিক্রম ছিলেন একজন মোস্তাফিজুর রহমান। ফাইনাল জয়ের লালিত স্বপ্ন। সাধনা।  শেষ ওভারের রোমাঞ্চে ঠেকে।

বাংলাদেশের জয় যেন পুরোপুরি হাতের মুঠোয়। ১৮তম ওভারে যে মাত্র ১ রান দিয়ে ১ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন কার্টার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমন। এক ওভারেই যেন বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশকে মোস্তাফিজ জয়ের কিনারায় নিয়ে এসেছিলেন এক উইকেট ও পাঁচ ডট বল দিয়ে। কিন্তু ভাগ্যলিপিতে লিখা ছিল অন্য কিছু। কে জানতো জেতা ম্যাচ হারতে হবে।

রুবেল হোসেনের করা ১৯তম ওভারে একাই দিনেশ কার্তিক নিলেন ২২ রান। দুটি ছক্কা আর দুটি বাউন্ডারির সঙ্গে একটি ডাবল। রুবেলের এই বেহিসাবি বোলিং , এখানেই হেরে যায় বাংলাদেশ শেষ ওভারে ভারতের প্রয়োজন ছিল ১২ রান

বড় ম্যাচের ফাইনালের চাপ শেষ ওভারে। বোলার তখন সৌম্য সরকার। প্রথম বলই দিলেন ওয়াইড। পরের বলে কোনো রান দেননি।  স্টাইক প্রান্তের ব্যাটসম্যান বিজয় শঙ্কর দ্বিতীয় বলে নিলেন ১ রান নেন। দিনেশ কার্তিক স্ট্রাইকেএসে পরের বলে ১ রান নিলেন। চতুর্থ বলে শঙ্কর মারলেন বাউন্ডারি পঞ্চম বলে ছক্কা মারতে গিয়ে হলেন আউটহলেন

আর শেষ বলে দিনেশ কার্তিক স্ট্রাইকে। ১ বলে প্রয়োজন ৫ রান। সৌম্য সরকারকে ছক্কা মেরে বিজয় উদযাপন করলেন তিনি। বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছাসে ভাসে ভারত। ভাল একটা থাবা দিয়েছিল টাইগার্স। অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। বাংলাদেশ শিবির ফাইনালের পরাজয়ে কাঁদে। কাঁদে লাখো বাঙ্গালী। সৌম্য কাঁদলেন অঝোর ধারায়। কাঁদালেন কোটি ক্রিকেট পাগল সমর্থক।

আরও পড়ুন  করোনা আপডেট ৬ জুলাই: নতুন শনাক্ত ৩২০১, মৃত্যু ৪৪

দিনেশ কার্তিকের ঠান্ডা মাথার আগ্রাসী ব্যাটিংটা ক্রিকেট সৌন্দয্যের এক অসাধারণ মাত্রা। সময়ের দাবী মেটানো,প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করা তাঁর ইনিংসটি

 ফাইনালে না পাবার বেদনাঃ  

“চোকার’ শব্দটি এখনও ঠিক যায় না বাংলাদেশের পাশে। তবুও আপেক্ষ থাকে। আপসোস রয়ে যায়। কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয় কাউকে। ব্যর্থতার দায় মাথায় নিতে হয়। ফাইনালে এক ওভারে ২২ রান দেয়া রুবেল নিজের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নিয়েছেন। ক্ষমাও চেয়েছেন। তবে এমন ঘটনা এটাই প্রথম নয়।

২০০৯ সালের ১৬ জানুয়ারি প্রায় একই পরিস্থিতিতে রুবেলের শেষ দুই ওভারে দেয়া ৩৩ রানে নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হয়েছিল বাংলাদেশের। সেটাও ছিল তিনজাতি ক্রিকেট  টুর্নামেন্ট। আগেরটা ম্যাচটি ছিল ৫০ ওভারের আসর। আর শ্রীলঙ্কায় টি টোয়েন্টি আসরের ফাইনাল ওই ম্যাচে হাতে ২ উইকেট থাকা অবস্থায় শেষ ৩০ বলে ৩৫ রান দরকার ছিল শ্রীলঙ্কার। বাংলাদেশ জয়ের কাছাকাছি ছিল। ইনিংসের ৪৬ নম্বর ওভারে পেসার রুবেল হোসেন ২০ রান দিয়ে ডুবালেন দলকে।  জয়ের পথ থেকে ছিটকে পড়ে টাইগাররা। খলনায়কে পরিণত হয়েছিলেন রুবেল। এই রুবেলই ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ওভারে রুবেল জেমস অ্যান্ডারসন এবং স্টুয়ার্ট ব্রডকে বোল্ড করে বাংলাদেশকে তুলেছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়তির নিষ্ঠুরতা।

ফাইনালের বিস্মৃতিঃ বার বার ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে খেলতে এসে নকআউটে হেরে বসার রেকর্ড গড়ে চলেছে বাংলাদেশ। ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল২০১৬ এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টির ফাইনাল২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল এবং ২০১৮ নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে এসে হারলো বাংলাদেশ ভারত যোগ্যতায় এগিয়ে থাকা দল। বাংলাদেশ পরাজিত হয় মানসিকতা ও ফাইনালের কঠিন ও স্নায়ুর চাপ নিতে না পেরে।

ফাইনালে পরাজয়ের শুরুটা ২০০৯ সালের ত্রিদেশীয় ট্রফির ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হারতে হয়েছিল বাংলাদেশকে

এরপর ২০১২ সালের ২২ মার্চ ফাইনালে পাকিস্তানিদের ২৩৬ রানে বেঁধে ট্রফি জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়েছিল মুশফিক বাহিনী।  সেই শেষ ওভারের ট্র্যাজেডি। হতাশায় ডুবতে হয়েছিল আবারও। হাতে ৩ উইকেট রেখে ৬ বলে ৯ রান করতে না পেরে হেরে যায় মুশফিক রহিমের দল

তৃতীয়বার,  ২০১৬ সালের ৬ মার্চ। হোম গ্রাউন্ডে খেলা। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের এশিয়া কাপের ফাইনাল ম্যাচটি প্রবল ঝড়ো বাতাস ও ভারি বর্ষণে কারটেল ওভারে গড়ায়। ২০ ওভার থেকে কমে ১৫ ওভার। বাংলাদেশ ১২০ রানের মামুলি স্কোর নিয়ে ৮ উইকেটে হারে যায়।

এই চলতি বছরে দেশের মাটিতে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৭৯ রানে হেরে যাওয়া বাংলাদেশ

নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে এসে আবারও থাকলো ট্রফি অধরা। বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত  কোনো টুর্নামেন্টের ট্রফি জয়েরই স্বাদ পায় নি। সুদূর ভবিষ্যৎ একদিন বাংলাদেশ হাসবে। হাসাবে দেশবাসিকে। তুলে ধরবে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। প্রত্যাশার থাকবে। জয়ের তৃপ্তি নিয়ে একদিন মাঠ ছাড়বে বাংলাদেশ দল। এখন শুধু অপেক্ষায়।

সামনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর। প্রস্তুতি শুরু করতে হবে নতুন ভাবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ