সিলেট | |
প্রকাশিত: 4:36 PM, October 24, 2023
মুহূর্তেই ঘোষণা এল ঘরবাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। না হলে মহাবিপদ। মাথার ওপর বোমা পড়বে। একটু দূরে পড়লেও তার প্রভাবে ঝলসে যাবে পুরো দেহ (সাদা ফসফরাস বোমা)। এর ওপর আকাশ থেকে একের পর এক চিরকুট পড়ছে। তাতে লেখা ‘বাড়ি ছেড়ে পালাও, নইলে মরবে’।
শিকড়ের টানেই এত বছর ধরে চলছে ইসরায়েল–ফিলিস্তিনি সংঘাত। আর এই লড়াই তো ১০০ বছরের এক আখ্যান। সেই আখ্যানের পেছনেও রয়েছে আরেক কাহিনি। কী সেই কাহিনি? বিস্তারিত জানতে আপনাকে কিছু সময় ব্যয় করতে হবে।
ইহুহি কারা? এরাই কি ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা? সেই আলোচনা তর্কসাপেক্ষ। এই ভূখণ্ড নিয়ে এতদিনের সংঘাতের শুরুটা আসলে কোথায়?
কী ছিল সেই চিঠিতে, পরে যা হলো
নিজভূমিতে ইহুদিদের সংখ্যা বাড়তে দেখে শঙ্কায় পড়ে যায় ফিলিস্তিনিরা। এ ছাড়া শাসক ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনিদের জমি-জমা, ঘরবাড়ি জব্দ করে সেগুলো ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের দিতে থাকে।ফিলিস্তিনে ক্রমেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরিণামে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এর নাম ‘আরব বিদ্রোহ’, যা ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ১৯৩৬ সালে নবগঠিত আরব জাতীয় কমিটি ফিলিস্তিনে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকবাদ এবং ইহুদি অভিবাসনের প্রতিবাদে ইহুদি পণ্য বর্জন এবং কর দেওয়া বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়। অনেকটা ভারতীয় উপমহাদেশের স্বদেশী আন্দোলনের মতো।
দ্বিতীয় পর্বের বিদ্রোহ শুরু হয় ১৯৩৭ সালে। ভারতীয় উপমহাদেশের মতোই এ বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয় ফিলিস্তিনি কৃষক প্রতিরোধ আন্দোলন।
বহিরাগত ইহুদিদের নিয়ে গঠন করা হয় বিশেষ বাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী নাম করে সশস্ত্র গোষ্ঠী গঠন করা হয়, নাম দেওয়া হয় স্পেশাল নাইট স্কোয়াড। বসতি স্থাপনকারীরা গোপনে ‘ইসউভ’ নামের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগেই অবশ্য তারা অস্ত্র পাচার করে আনতে শুরু করে। অস্ত্র তৈরির কারখানাও তৈরি হয়। ইহুদি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘হাগানাহ’ গঠিত হয়, যা পরে ইহুদি সেনাবাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘের পরিকল্পনা ও কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা
অবস্থা এমন হয় যে, ১৯৪৭ সালের দিকে এসে দেখা যায় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তারা তখন মোট জনসংখ্যার এক–তৃতীয়াংশ। অথচ ওই সময় তারা দেশটির মাত্র ৬ শতাংশ ভূখণ্ডের মালিক ছিল।
এর পর যা ঘটে, তা ফিলিস্তিনিদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটাই বলা যায়।
‘নাকবা’ ও ঘরছাড়া ফিলিস্তিনিদের আর্তনাদ
১৯৪৮ সালের এপ্রিলে জেরুজালেমের উপকণ্ঠে দেইর ইয়াসিন গ্রামে শতাধিক নিরীহ ফিলিস্তিনিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর মধ্য দিয়েই মূলত বিশেষ এসব অভিযানের ধরন ঠিক করে ফেলা হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক ফিলিস্তিন শহর, বাজার, গ্রাম ও নগর ধ্বংস করা হয়। এই ধ্বংস তৎপরতাকে ফিলিস্তিনিরা উল্লেখ করে ‘নাকবা’ হিসেবে। আরবিতে নাকবার অর্থ ‘মহাবিপর্যয়’। লাখো মানুষ ঘরছাড়া হয়।
সেই নাকবার কাহিনি এখনকার ফিলিস্তিনবাসী না দেখলেও, ভয়াবহতার গল্প শুনেছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে সেই দুর্যোগের কাহিনি। এ কারণে গাজায় চলমান ইসরায়েলি হামলার মধ্যে সেই নাকবার কথাই সবচেয়ে বেশি মনে হচ্ছে তাদের। নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত প্রায় ৬০ লাখ ফিলিস্তিনি এখন লেবানন, সিরিয়া, জর্দান ও মিসরের শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণায় শুরু যুদ্ধের ভয়াবহতা
অন্তত দেড় লাখ ফিলিস্তিনি নব্য প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েলি রাষ্ট্রে থেকে যায়। তাদের প্রায় ২০ বছর কঠোর সামরিক দখলদারির মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য করা হয়। পরে ধীরে ধীরে ইসরায়েলের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। নিজেদের মাটিতেই নাগরিকত্ব নিতে ফিলিস্তিনিদের অপেক্ষা করতে হয়েছে এক যুগের বেশি সময়।
মিশর গাজা উপত্যকা দখলে নেয়। ১৯৫০ সালে পশ্চিম তীরের ওপর প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু করে জর্দান।
১৯৬৪ সালে ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা বা পিএলও গঠন করা হয়। এক বছর পরে রাজনৈতিক দল ফাতাহ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদ আসতে থাকে একের পর এক।
ছয়দিনের যুদ্ধ ও আরবের হার
এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় দফা ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করা হয়। একে বলা হয় ‘নাকসা’। আরবি এই শব্দটির অর্থ ‘বিপত্তি’।
পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় এর মধ্যেই ইহুদি বসতি স্থাপনের তৎপরতা শুরু হয়। সকল সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় বসতি স্থাপনকারীদের। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাদের কোনো নাগরিক বা রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়নি। কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে তাদের জীবন কাটাতে বাধ্য করা হয়।
প্রথম গণজাগরণ (১৯৮৭-১৯৯৩)
গণজাগরণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম তীরে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ট্যাংকবহর ফিলিস্তিন তরুণদের ছোঁড়া ইট-পাটকেলের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে। দখলদার ইসরায়েলিদের প্রতিরোধের মুখেই গঠিত হয় হামাস আন্দোলন। সেই হামাসই গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে দিকে ৫ হাজারের বেশি রকেট ছুড়ে বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে।
কঠোর হাতে গণজাগরণ দমন করতে নামে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজহাক রবিন ঘোষণা দেন, ‘ফিলিস্তিনিদের হাড় গুড়িয়ে দেওয়া হবে’। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ফিলিস্তিনি তরুণেরা, রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে গঠিত ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিডারশিপ অব দ্য আপরাইজিং। লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
অসলো চুক্তি ও শক্ত দেয়াল
দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের আওতায় ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় পিএলও। পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ এবং ওই অঞ্চলের বেশির ভাগ জায়গা ও পানিসম্পদ ইসরায়েলকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়া হয়। কথা ছিল পিএ প্রথম ফিলিস্তিনি সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে এবং পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকাকে নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। এ সরকারের রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। তবে এমনটি আজও হয়নি।
দ্বিতীয় গণজাগরণ
দ্বিতীয় গণজাগরণ শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে। ইসরায়েলের রাজনৈতিক দল লিক্যুদ পার্টির নেতা অ্যারিয়েল শ্যারন পবিত্র আল–আকসা চত্বর পরিদর্শন করেন। একে কেন্দ্র করে জেরুজালেমের পুরোনো নগরীর ভেতরে ও বাইরে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়।
ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ শাসিত অঞ্চলগুলো আবার দখল করে নেয় ইসরায়েল। সেখানে প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু করে। সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের এ জন্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, দিতে হয় চরম মূল্য। দখল করা অঞ্চলে বসতি নির্মাণকে আন্তর্জাতিক আইনে পরিষ্কারভাবে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। ইহুদিদের জন্য বসতি স্থাপন করার তোড়ে ফিলিস্তিনি অঞ্চল ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকে। দখল করা ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের মধ্য দিয়ে কেবল বসতি স্থাপনকারীদের জন্য রাস্তা ও অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। এতে ফিলিস্তিনের নগর ও শহরগুলো ছিটমহলের মতো হয়ে যায়।
ফিলিস্তিনিদের বিভক্তি ও গাজা অবরোধ
পিওলওর নেতা ইয়াসির আরাফাত ২০০৪ সালে মারা যাওয়ার পর এক বছর যেতে না যেতেই দ্বিতীয় গণজাগরণের অবসান ঘটে। এরই মধ্যে গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি বসতি সরিয়ে নেওয়া হয়। ৯ হাজার ইসরায়েলি সেনাসহ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ওই এলাকা ছেড়ে চলে আসে।
গাজা উপত্যকার ২০০৮, ২০১২, ২০১৪ ও ২০২১ সালে চারবার সামরিক হামলা চালায় ইসরায়েল। নির্বিচার হামলায় নারী শিশুসহ অনেক নিহত হয়। হাজারো ঘরবাড়ি, স্কুল ও সরকারি ভবন গুড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে ফসফরাস বোমার মতো আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ অস্ত্রও ব্যবহার করে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী (আইডিএফ)।
হামাসের রকেট হামলা ও নতুন বিপর্যয়
এরপর নতুন করে আবার শুরু হয় সংঘাত। গাজায় বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলের সেনাবাহিনী। স্থল হামলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এমনকি পশ্চিম তীরেও মারা যাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। এ পর্যন্ত ৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। হামাসের হামলায় মারা গেছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ইসরায়েলি।
গাজাবাসীকে অন্যত্র সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘ বলছে, প্রায় ২৩ লাখ মানুষের বসবাসের শহর গাজা থেকে নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। অর্থাৎ অবরুদ্ধ এই উপত্যকার প্রায় অর্ধেক মানুষই বর্তমানে বাস্তুচ্যুত।

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আব্দুল হক
ঢাকা অফিস : ২৩৪/৪ উত্তর গোড়ান, খিলগাঁও, ঢাকা ।
সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ, ১৪৯ আরামবাগ, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-৫৯৩৬৫৩, ০১৭১২-০৩৩৭১৫
E-mail: provatbela@gmail.com,
কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম
আমাদের সর্ম্পকে গোপনীয়তা যোগাযোগ
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি