অ্যাকাডেমি নির্ভর হয়ে গেছে আমাদের সিলেটের ক্রিকেট –– রাহি

প্রকাশিত: ১১:১৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৫, ২০২৪

অ্যাকাডেমি নির্ভর হয়ে গেছে আমাদের সিলেটের ক্রিকেট –– রাহি

 

আবু জায়েদ চৌধুরী –– সিলেটে যিনি রাহি নামেই পরিচিত। ডানহাতি এই পেস বোলার বাংলাদেশের হয়ে ১৩টি টেস্ট খেলে ৩০টি উইকেট শিকার করেছেন। ছিলেন ২০১৯ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে। ২টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন, যার একটিতে ৫ উইকেট তুলে নেবার কীর্তি আছে সিলেট নগরীর রায়নগরের এই তরুণের। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত ৩১০ উইকেট লাভ করেছেন।

 

লাল বলে দুর্দান্ত বোলিং দক্ষতার সুবাদে দীর্ঘদিন ‘টেস্ট বোলার’ হিসাবে অভিহিত হয়েছেন। তাঁকে বলা হয় বাংলাদেশের এক অনন্য পেস বোলার যিনি বলকে দুই দিকেই সুইং করাতে পারেন। অনেকটা ইংলিশ সিমার জিমি অ্যান্ডারসনের মতো অ্যাকশনে বল করা রাহি সর্বশেষ জাতীয় লিগে শিকার করেছেন ১৬টি উইকেট। সিলেট লিগেও দুইবার ইনিংসে ৫ উইকেট পেয়েছেন, ব্যাট হাতে অর্ধশতক হাঁকিয়েছেন। তাঁর দল বঙ্গবীর অগ্রগামি ক্রীড়া চক্র মাহা ১ম বিভাগ ক্রিকেট লীগ ২০২৩-২৪-এ হয়েছে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন।

 

ব্রাদার্সের ইউনিয়ন ক্লাবের সঙে লিগের শেষ ম্যাচ খেলার পর দৈনিক প্রভাতবেলার ক্রীড়া প্রতিবেদক তানজীল শাহরিয়ারের সঙে বিশেষ সাক্ষাৎকারে খোলামেলা কথা বলেছেন সিলেটের ক্রিকেট নিয়ে। তা এখানে তুলে ধরা হলো ––

 

 

এবার লিগে ৯ ম্যাচ খেলেছেন, উইকেট কেমন ছিলো? একজন পেস বোলার হিসাবে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

 

আবু জায়েদ রাহি : আমার কাছে ভালো লেগেছে। যেরকম আশা করেছিলাম তার চাইতে উইকেট ভালো ছিলো। অনেক সময় মনে হয়েছে আউটার স্টেডিয়ামের (সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের অ্যাকাডেমি মাঠ) মত বাউন্স ছিলো উইকেটে।  ঘন ঘন ম্যাচ হয়েছে, আমাদেরও বুঝতে হবে, উইকেটে মাঝেমধ্যে সেরকম পেস ছিলো না। বেশিরভাগ সময় উইকেটে পেস পেয়েছি।

 

 

সাম্প্রতিক সময়ে অনেক পেসার উঠে আসছে সিলেট থেকে। আপনি জাতীয় দলে খেলেছেন, খালেদ খেলছে, তানজিম সাকিবও জাতীয় দলে খেলছেন। এবারের লিগে প্রতিপক্ষ দলে অনেক পেস বোলার দেখেছেন, কাকে ভালো লেগেছে?

 

আবু জায়েদ রাহি : বেশিরভাগ পেসারকেই আমার ভালো লেগেছে, নির্দিষ্ট করে কারো কথা বলবো না, অনেকের বোলিং দেখে মনে হয়েছে তাদের মধ্যে ‘জেদ’ রয়েছে। আজকেও যেমন আমাদের প্রতিপক্ষ দলে (ব্রাদার্স ইউনিয়ন) যে পেসার খেলেছে তাকে ভালো লেগেছে, অফ দ্য পিচ বেশ গতি ছিলো বলে। বেশিরভাগ দলেই এক-দুইজন ভালো পেস বোলার রয়েছে। আমার মনে হয় পেস নিয়ে সিলেটে কোনো সমস্যা নেই, ব্যাটিং নিয়েই সব চিন্তা!

 

 

এবার লিগে পেস বোলারদের পুলে রাখা হয়নি, পুলে রাখা হলে অনেক ক্লাবই পেসারদের নিতে চায় না, পুলভুক্ত পেসারদের দল পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। পেসারদের পুলে রাখা না রাখা নিয়ে আপনার মতামত কী?

 

আবু জায়েদ রাহি : একটা দল পেস বোলারের চাইতে ব্যাটার নেওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যেহেতু সিলেট লিগে ব্যাটারদের দরকার বেশি, স্পিনারদের প্রয়োজন বেশি। আমার মনে হয় এবারের পরিকল্পনাটা খুবই ভালো ছিলো। আপনি যদি হিসাব করে দেখেন, অন্য কোনো দলই পুল থেকে পেস বোলার নেয়নি, আমরা (বঙ্গবীর অগ্রগামী ক্রীড়া চক্র) নিয়েছি। রাজা ছিলো, সাকিব খেলেছে, আমি খেলেছি, জয়নুল খেলেছে, রুহেলকেও খেলানো হয়েছে। ৫টা পেসারকে খেলিয়েছে। এই ক্লাব না নিলে এই পেসারদের অনেকেই সিলেট লিগ খেলতে পারতো না। সিলেট লিগ খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়ে যেতো। বলতে পারতো না যে সিলেট লিগ খেলেছে। এটা খারাপ (না খেলানো), অপমানজনক! আমি যদি আজকে সিলেট লিগ খেলতে না পারি, এটা অপমানজনক। আমি খারাপ খেলি বিষয়টা তা নয়, সিলেটে ব্যাটারদের চাহিদা বেশি। সবাই ভালো ব্যাটার নিতে চায়। সেদিক থেকে চিন্তা করলে আমার মনে হয় পুল (পেসারদের জন্য) না থাকাই ভালো।

আরও পড়ুন  সিলেট হকি লিগে চ্যাম্পিয়ন মৌসুমী ক্রীড়া ও সমাজকল্যাণ সংস্থা

 

 

আমরা দেখেছি আপনি, খালেদ জাতীয় দলে খেলা অবস্থায়, শুধুমাত্র পুলে আছেন, এ কারণে কোনো ক্লাব আপনাদের নিচ্ছে না, এখানে ক্লাবগুলো কি পেস বোলারদের খেলানোর জন্য আলাদা করে কোনো উদ্যোগ নিতে পারে? বড়ো ক্লাব কি এগিয়ে আসতে পারে?

 

আবু জায়েদ রাহি : আমার মনে হয় আগ্রহ থাকা উচিত, নিজের ক্লাবের জন্য ফিলিংস থাকা উচিত। আমার মনে হয় অনেক ক্লাবের মালিকেরই দলগঠন নিয়ে ফিলিংস নেই! আপনি কিন্তু চাইলেই দল করতে পারেন। দেখুন, আমরা ৪ জন পেস বোলার খেলিয়েছি, চাইলে আরো স্পিনার খেলানো যেতো। কিন্তু, পুলের কারণে খেলানো যায়নি। আমার মনে হচ্ছে ক্লাব মালিকদের ইচ্ছা শক্তি কম। ভালো দল করবো। চ্যাম্পিয়ন ফাইট দেওয়ার মতো দল করবো, আপনি যদি খরচ করেন, তখন দলের প্রতি (খেলোয়াড়দের) দায়ভার থাকে। খেলোয়াড়রা যেখান থেকে আয়-রোজগার করতে পারছে না সেখানে দলের জন্য তার ফিলিংস আসবে কিভাবে?

 

একটা ভালো ব্যাট কিনতে পারছে না, গ্লাভস নিতে পারছে না। যদি ৯-১০ বছর আগের কথা চিন্তা করেন, আমি তখন যে পেমেন্ট পেয়েছি, আজকে সেই পেমেন্টের সমপরিমাণ টাকায় একটা টিম হয়ে যাচ্ছে, আমার মনে হয় মালিকদের দল নিয়ে ফিলিংস নাই! যদি থাকতো তাহলে অন্যকিছু হতে পারতো।

 

 

গত প্রায় ১০ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে ২-৩টা ক্লাব শিরোপা জেতার জন্য দল করছে। বাকি ৭-৮টা ক্লাব গড়পড়তা দল করছে। ফলে দেখা যায় ‘বড়ো’ দলের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগেই ‘ছোটো’ দল হেরে বসে আছে। লিগে প্রতিদ্বন্দিতা নেই! ক্লাব অফিশিয়ালদের কথা ছেড়ে আমরা যদি টিমের কোচ, ম্যানেজমেন্ট –– যারা টিম চালাচ্ছেন, তাদের কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

 

আবু জায়েদ রাহি : আমার মতে (ক্রিকেট কোচিং) অ্যাকাডেমি নির্ভর হয়ে গেছে আমাদের সিলেটের ক্রিকেট। এটা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যেমন ধরেন, অ্যাকাডেমি আছে তিনটা, দুইজন টিম নিয়ে যাবেন নিজের অ্যাকাডেমির ক্রিকেটারদের খেলানোর জন্য। অ্যাকাডেমির ক্রিকেটার নয়, আমি সিলেটের সেরা খেলোয়ারদের খেলাবো, এই ইচ্ছাটা থাকা লাগবে।

 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা অনেকটা ‘ব্যবসার’ মতন হয়ে গেছে। যে আমি তোমাকে প্রথম বিভাগ লিগে খেলাবো, তুমি আমার অ্যাকাডেমিতে অনুশীলন করো। আমি সরাসরি বলছি, এটা সিলেটের ক্রিকেটের জন্য ক্ষতির কারণ হবে। আমি যদি মনে করি যে আমার অ্যাকাডেমি আছে, কিন্তু অন্য অ্যাকাডেমি থেকে প্লেয়ার আনবো। মানসম্পন্ন প্লেয়ার আনছি না। দেখানোর জন্য হয়ত আনছি।

 

আমার কাছে টিম আছে, আমার অ্যাকাডেমিতে অনুশীলন করলে তুমি ১ম বিভাগ লিগে খেলবে! এই জিনিসগুলো সিলেটের ক্রিকেটের জন্য খুব খারাপ হচ্ছে। অ্যাকাডেমির খেলোয়াড়দের দিয়ে সিলেটে ক্রিকেটের উন্নতি করতে পারবেন না। আমার অ্যাকাডেমির খেলোয়াড়দের নিয়ে আমি খেলবো, অমুক উনার অ্যাকাডেমির খেলোয়াড় নিয়ে খেলবে, এভাবে হবে না।

 

অ্যাকাডেমি খারাপ কিছু না। অ্যাকাডেমির মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকতে হবে। তিন অ্যাকাডেমি মিলিয়ে চিন্তা করতে হবে। প্রয়োজন হলে অন্য অ্যাকাডেমি থেকে ভালো ক্রিকেটার আমার দলে রাখবো। অন্য অ্যাকাডেমিও হয়ত চিন্তা করবে যে আমার অ্যাকাডেমি থেকে ক্রিকেটার নেবে। ‘সিণ্ডিকেট’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে সিলেটের ক্রিকেট উন্নত করতে পারবেন না।

আরও পড়ুন  এশিয়া কাপের চ্যাম্পিয়ন ভারত

 

আমি যখন ম্যাচে (নবীন) ক্রিকেটারদের বলতাম যে ‘সিঙেল’ নাও না কেনো, তারা কোনো উত্তর দিতে পারতো না। কারণ, তারা কোচের কাছ থেকে এই বিষয়গুলো শেখেনি! তাদের উচিত হলো কোচকে জিজ্ঞাসা করা কিভাবে রান করবো, কিভাবে ব্যাটিং করবো, কিভাবে বোলিং করবো। এভাবে জিজ্ঞাসা করা হয় না।

 

 

আপনার কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে আপনি চান যে দল করার ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন ক্রিকেটারকে গুরুত্ব দিয়ে দল সাজাতে হবে, আমি চিনি, আমার অ্যাকাডেমির খেলোয়াড় এটাকে ভিত্তি করে দল গঠন করা হবে না ––

 

আবু জায়েদ রাহি : আমি মনে করি অ্যাকাডেমির কোচদের কোর্স করা উচিত। সার্টিফাইড হতে হবে একজন কোচ হিসাবে। আমি শুধু ক্রিকেট খেলেই কোচ না, কোচিং কোর্স করে কোচ। বিসিবি (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) এত কোচিং করায়, আমি যদি গিয়ে দুইটা ক্লাস করি, লেভেল এ তো যে কেউ করতে পারে, আমার কথা হচ্ছে অ্যাকাডেমির কোচেরা কেনো লেভেল এ করে না, তাহলে তারাও তো কিছু শিখবে, আপনি যদি না শেখেন, তাহলে আপনি শেখাবেন কিভাবে! আমার কাছে মনে হয় কোচদের উচিত হলো নিজে কোচিং (কোর্স) করা।

 

রানা ভাই আমাদের ডিস্ট্রিক্ট কোচ, উনি নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। উনার অধীনে যে ৭ জন কোচ আছেন, তারা সবাই খুব বেশি কোয়ালিফাইড না। বা অন্য অ্যাকাডেমির কোচ সবাই কোয়ালিফাইড না। তারা দেখে শিখেছে। আমার মনে হয় কোচদের জন্যে আপনারা ‘ইনভেস্ট’ করুন, আপনারা তো ইনকাম করছেন, আপনি যদি আপনার ৫ জন কোচকে ঢাকায় পাঠিয়ে কোচিং (কোর্স) করিয়ে আনেন। তাহলে আমার মনে হয় সিলেটের ক্রিকেট কিছুটা উন্নত হবে। তাদের কাছ থেকে তখন প্লেয়াররা কিছু শিখবে।

 

 

আপনি জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন, দীর্ঘদিন টেস্ট খেলেছেন, নতুন যারা পেস বোলার হতে চায় তাদের কী পরামর্শ দেবেন?

 

আবু জায়েদ রাহি : আমার সঙে যারা কথা বলে আমি তাদের পরামর্শ দেই। এখানে খুব বেশি কষ্ট করা লাগবে না। একটা কম্পিটিশন আছে। দেখো আমরা কী করছি, কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। যেহেতু এখানে আমরা ৬-৭ জন পেস বোলার আছি, যে পেস বোলারের মোটামুটি কোয়ালিটি থাকবে, সে এমনিতেই উপরের দিকে চলে যাবে। কারণ হচ্ছে, সে বুঝে যাবে কম্পিটিশনটা ডিফেরেন্ট।

 

 

এবার বঙ্গবীর অগ্রগামী দলে সব মিলিয়ে কেমন লেগেছে?

 

আবু জায়েদ রাহি : বঙ্গবীরে খেলার কারণ হচ্ছে সিলেটের ক্রিকেটকে আরো উন্নত করা। আমরা চেয়েছি একটা (শক্তিশালী) দল করতে। সবাইকে দেখানোর জন্য যে আপনি চাইলেই চ্যাম্পিয়ন হতে পারবেন। যদি আপনারা কোনো টিম চান যে চ্যাম্পিয়ন হতে, পারবেন। ইনভেস্ট করতে হবে। ইচ্ছা থাকতে হবে। শুধু ভোটের জন্য টিম নয়, টিমের প্রতি ফিলিংস থাকতে হবে।

 

 

ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য, চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় অভিনন্দন 

 

আবু জায়েদ রাহি : ধন্যবাদ।

 

সর্বশেষ সংবাদ