গণপরিবহন বন্ধ: ছাতকে  শ্রমিকদের মানবেতর জীবন যাপন

প্রকাশিত: ২:০০ অপরাহ্ণ, মে ৭, ২০২০

গণপরিবহন বন্ধ: ছাতকে  শ্রমিকদের মানবেতর জীবন যাপন

 

প্রতিনিধি,ছাতক:

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেড় মাস ধরে গাড়ি চলাচল বন্ধ। যার ফলে এই অঞ্চলের প্রায় ৮ হাজার সিএনজি চালিত অটোরিক্সা ও বাস বন্ধ থাকায় পরিবহন খাতের শ্রমিকরা বেকার হয়ে মানবতের জীবন-যাপন করছেন।

 

উপজেলার ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে একাধিকবার সরকারী খাদ্য সহায়তা ও নগদ অর্থ প্রদান করা হলেও পরিবহন শ্রমিকদের ভাগ্যে কিছু জুটেনি। এসব শ্রমিকদের ত্রানের আওতায় আনা হবে কি না, এই বিষয়ে পরিস্কার করে বলতে পারছেন না স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ। সরকারী কোন সহায়তা না পাওয়ায় পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

 

সিএনজি চালিত অটোরিক্সা চালক সুমন চন্দ্র পাল। তিনি ছাতক পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের শ্যামপাড়া এলাকার বাসিন্দা। হতাশা ভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, গাড়ী বন্ধ প্রায় দেড় মাস ধরে। করোনার প্রভাবে নেই প্রতিদিনের আয়-রোজগার। জমানো প্রায় ১০হাজার টাকা ছিল, গাড়ী বন্ধ থাকায় সব টাকাই শেষ। এখন ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। পরিবারের স্ত্রী ও ছোট একটি মেয়ে এবং বাবা-মাকে নিয়ে বড় কষ্টে আছি। পুলিশের ভয়ে গাড়ী বের করার সাহস পাই না। প্রতিদিনই পুলিশ সড়কে নানা অজুহাতে গাড়ী আটক করে থানায় নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে আর কতদিন চলবে। আমাদের পরিবহন শ্রমিকদের খবর তো ভাই কেউ রাখে না।

 

তিনি বলেন, আমরা শুনেছি সরকার ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার পাড়া-মহল্লা ও বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌছে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা আজ পর্যন্ত কোন প্রকার সরকারী সহায়তা পাইনি। আর কখনও সাহায্য পাব কি না তাও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলতে পারছে না।

আরও পড়ুন  হবিগঞ্জের ফয়সল এখন স্কটল্যান্ডের এমপি

 

গণক্ষাই এলাকার অটোরিক্সা চালক হোসেন আলী বলেন, আমি ও আমার আরও এক ভাই দুজনই অটোরিক্সা চালিয়ে সংসার খরচ যোগাতাম। এখন আমরা দুই ভাই বেকার হয়ে পড়েছি। ১৫ হাজার টাকা সঞ্চয় ছিলো, ওই টাকাও শেষ হয়ে গেছে। আমরা শুনেছি, সরকার বলছে করোনার এই দুর্যোগে দেশের একটি লোকও না খেয়ে মারা যাবে না। এভাবে চলতে থাকলে করোনায় নয়, আমাদের মতো মানুষ না খেয়েই মারা যাবে। সরকারী সাহায্য ও ত্রান নিয়ে জনপ্রতিনিধিরা কি করছেন, এমন প্রশ্ন এখন দৈনিক খেটে খাওয়া শত শত পরিবহন শ্রমিকের।

ছাতক বাস টার্মিনালের একাধিক চালক ও হেলপার বলেন, ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বাস চালিয়ে যে টাকা পেতাম, সেই টাকায় সংসার চলতো। প্রতিদিনের আয় চলতো আমাদের পরিবার। প্রায় দেড় মাস ধরে বাস বন্ধ, তাই আয়ও বন্ধ। ঘরে চাল-ডাল নেই। ঘরে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানের মুখের দিকে তাকাতেও কষ্ট হয়। সামনের দিন গুলো যে কীভাবে কাটবে, তা নিয়েই দুশ্চিন্তার শেষ নেই।

 

ছাতক শিবটিলা অটোরিক্সা ষ্ট্যান্ডের সভাপতি মো.রজব আলীসহ একাধিক পরিবহন শ্রমিকরা বলেন, আমাদের ষ্ট্যান্ডে প্রায় সাড়ে ৩শতাধিক গাড়ী বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। প্রতিটি গাড়ীর রোজগারে একটি পরিবারের সংসার চলে। সরকারী ত্রাণ ও সাহায্যের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গিয়ে ছিলাম। তিনি বলেছেন, আমার কাছে আপনাদের দেওয়ার মতো কোন ত্রান নেই। ছাতক পৌরসভা কার্যালয়ে বার বার ধরনা দিয়েও মেয়র সাহেবের দেখা পাইনি।

আরও পড়ুন  তামাবিল স্থলবন্দরে পাথর আমদানি বন্ধ

 

ছাতক বাজার সিএনজি চালিত অটোরিক্সা ষ্ট্যান্ডের উপ-কমিটির সাধারন সম্পাদক ফজলুল হক ফজলু বলেন, গাড়ী চলাচল বন্ধ হওয়ার পর থেকে আমাদের গাড়ী চালকদের সরকারী সাহায্য-সহায়তা পেতে বিভিন্ন দপ্তরে দোৗড়-ঝাপ করেও কোন লাভ হয়নি। ছাতক উপজেলার শিবটিলা, ফকিরটিলা, কোর্টরোড, নোয়ারাই, গোবিন্দগঞ্জ, লাফার্জ ঘাট, দোলারবাজার, জাউয়াবাজার, বড়কাপন, ধারনবাজার, জাহিদপুর, লক্ষিবাউর, চাঁনপুর, আইন্দরীগাঁওসহ বিভিন্ন অটোরিক্সা ষ্টাান্ডের আওতায় সিএনজি চালিত প্রায় ৮হাজার অটোরিক্সা চলাচল করছে। আর সিলেট-ছাতক-সুনামগঞ্জ সড়কে প্রতিদিনই চলাচল করছে অর্ধশতাধিক বাস। এসব সড়কে চলাচলকারী সকল যাত্রীবাহী বাস চলাচল এখন বন্ধ রয়েছে।

 

করোনা ভাইরাসের কারনে পুরো উপজেলায় ছোট-বড় সকল প্রকার গাড়ী চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। মাঝে মধ্যে যে সকল চালক পেট চালাতে যে ২/৪টি গাড়ী সড়কে চলাচল করছে সে গুলোও অধিকাংশ সময়ই আটক করছে থানা কিংবা ট্রাফিক পুলিশ।

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম কবির বলেন, এলাকার দরিদ্র মানুষদের জন্য সরকারী ভাবে এখন পর্যন্ত পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তিন দফা ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। ২ হাজার ৫০০ পরিবারকে চাল ও নগদ অর্থ ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। মূলত তালিকাভুক্ত লোকজনকেই ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। পরিবহন শ্রমিকদের সরকারী ত্রাণের কোন বিশেষ বরাদ্দ পওয়া যায়নি।

 

প্রভাতবেলা/এমএ

সর্বশেষ সংবাদ