‘পথের কাটা’ সরিয়ে দিতেই মিতুকে হত্যা করা হয়

প্রকাশিত: ৩:১২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৭, ২০১৭

সংবাদদাতা, চট্রগ্রাম:  সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার তদন্তে নিয়োজিত পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যই পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে বাবুল ও মিতুর দাম্পত্য জীবনের নানা টানাপড়েনের কথা। জানা গেছে, মিতুর সংসার ভাঙতে চেয়েছিল তার স্বামী বাবুল আক্তারের পরিবার। তারা চাননি মিতু বাবুলের বউ হয়ে থাকুক। তাদের কাছে মিতুর একটাই অপরাধ—বাড়ির অন্য বউদের তুলনায় সে কম শিক্ষিত। অন্য বউরা উচ্চ শিক্ষিত। কেউ অনার্স পাস, কেউ মাস্টার্স পাস। কিন্তু মিতু এতদূর লেখাপড়া করেননি। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে একটি বেসরকারি গার্হস্থ্য কলেজে ভর্তি হলেও তিনি অনার্স শেষ করতে পারেননি। তাই মিতুকে তালাক দিয়ে ছেলের জন্য ‘শিক্ষিত’ বউ আনার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন বাবুলের মা। সহযোগিতায় ছিলেন ভাই-বোনেরাও। ছেলের জন্য বউ দেখার কাজও সেরে ফেলেছিলেন তারা। বাকি ছিল বাবুলকে ঘটা করে বিয়ে করানো। সেই দিনেরই অপেক্ষায় ছিলেন তারা।

বৃহস্পতিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে মিতু ও বাবুলের জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন মিতুর মা শাহেদা মোশাররফ নীলা ও পিতা মোশাররফ হোসেন। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মিতু ও বাবুলের দাম্পত্য সম্পর্ক, শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক, পরকীয়াসহ নানা দিকও উঠে আসে। মিতুর পিতা-মাতা বাবুলের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে তদন্ত কর্মকর্তাকে অনুরোধ করে বলেছেন, তাদের মধ্যেও যদি কেউ বাবুলকে ব্যবহার করে মিতুকে হত্যার কলকাঠি নাড়িয়ে থাকে তাহলে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হোক। এসব তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন, মিতু হত্যার ঘটনাটি সুপরিকল্পিত এবং এর সঙ্গে মিতুর স্বামী বাবুল আক্তারের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

আরও পড়ুন  সিলেট রেঞ্জে ২৬ থানার ওসি রদবদল

ডিবি কার্যালয় থেকে বের হয়ে মিতুর পিতা মোশাররফ হোসেন বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ নানা কারণেই বাবুল আক্তারের পরিবারের সঙ্গে মিতুর দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। এই টানাপড়েন চলছিল দীর্ঘদিন ধরেই। তারা বাবুলের জন্য বউ দেখার কাজও করেছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। হয়তো বাবুল এটা চাইত না। সে মিতুকে নিয়েই থাকতে চেয়েছিল। বাবুলকে রাজি করাতে না পেরে হয়তো তারা মিতুকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। এ কারণে বাবুলের পরিবারের কারো মিতু হত্যায় সম্পৃক্ত থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুলিশকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অনুরোধ করেছি।

এদিকে তদন্ত সূত্র আরো জানায়, ‘পথের কাঁটা’ মিতুকে সরিয়ে অন্য কাউকে বউ করে আনার পরিকল্পনা নেয় মিতুর পরিবার। এই কাজে বাবুলের মা ও বোনের উত্সাহই সবচেয়ে বেশি ছিল বলে জানা গেছে। এর আগে বাবুলের মেজ ভাই লাবুও ‘পরিবারের চাপে’ দ্বিতীয় বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পেশায় আইনজীবী ওই ভাইয়ের প্রথম সংসার খুব বেশিদিন টেকেনি। মাত্র ছয় মাসের মাথায় চুরির অপবাদ দিয়ে প্রথম স্ত্রীকে সংসার থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর বোনের এক স্বামী পরিত্যক্তা বান্ধবীকে বিয়ে করেন বাবুলের মেজ ভাই।

আরও পড়ুন  ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত ১৫২৭, মৃত্যু ১৫

জানা গেছে, বড় ভাইয়ের বউকেও কোনো এক অজুহাতে সংসার থেকে সরিয়ে দেয়ার দুরভিসন্ধি আঁটেন বাবুলের বোন। বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন মিতু। এ কারণে সবসময় তার মন খারাপ থাকতো। স্বামী ও স্বামীর পরিবারের সাথে তিক্ততা ক্রমশ বেড়েই চলছিল। মিতুর পিতা-মাতা তদন্ত কর্মকর্তাকে বাবুলের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, পরিবারের কোনো সদস্য অথবা বাইরের কেউ বাবুলকে ব্যবহার করে মিতুকে হত্যা করেছে কীনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। হয়তো কেউ বাবুলের জীবনে আসতে চেয়েছিল; কিন্তু বাবুল তাকে চাইতো না। সে মিতুকে নিয়েই থাকতে চেয়েছিল। বাবুলের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর সে হয়তো ক্ষুব্ধ হয়ে থাকতে পারে। হয়তো সেই বিশেষ কারো জন্য মিতু ছিল পথের কাঁটা। তাই পথের কাঁটা সরিয়ে দিতেই তারা টাকা-পয়সা দিয়ে লোক ভাড়া করে মিতুকে হত্যা করিয়েছিল।

গতকাল সিএমপি সদর দফতরে মিতুর পিতা-মাতার সাথে প্রায় চার ঘণ্টা কথা বলেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর) মো. কামরুজ্জামান। ডিবি কার্যালয় থেকে বের হয়ে তারা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। মিতুর মা শাহেদা মোশাররফ নীলা সাংবাদিকদের বলেন, আমি আমার মেয়ের হত্যাকাণ্ডের মোটিভ জানতে চাই। কী কারণে তাকে খুন করা হলো। সে চাকরি করতো না, ব্যবসা করতো না। তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকাও ছিল না। তাহলে কিসের লোভে আমার মেয়েকে খুন করা হলো।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ