মেধাবী ছাত্রদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ছিল অফুরান

প্রকাশিত: ১১:১৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৬, ২০১৭

মেধাবী ছাত্রদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ছিল অফুরান
শাহবাগী হুজুরকে নিয়ে না বলা কথা-০৫
 মাওলানা মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, কাতার:
আমাদের সম্মানিত উস্তাদ মুহতারাম আজিজুর রাহমান শাহবাগীর নিজ ছাত্রদের প্রতি আন্তরিকতা ও ভালবাসা ছিল ব্যতিক্রমী। বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটার প্রতি মালির যেমন আকর্ষণ থাকে, তার ছাত্রদের মধ্যে যারা মেধাবী-তাদের প্রতিও শাহবাগী হুজুরের আন্তুরিকতা, ভালবাসা আর আকর্ষণ ছিল অন্যরকমের। তাই তিনি বাছাই করে সেরা ছাত্র গুলোকে তার মাদ্রাসায় চাকুরী প্রদান করেছেনে । চাকুরীর ব্যবস্থা করেছেন । গড়ে তুলেছেন মেধা আর মননের এক অপরূপ সমাবেশ । সুজাউল আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক সমাবেশ। সুজাউল মাদ্রাসায় হাতে গোনা ২/৩জন ছাড়া বাকী সবাই-ই এই মাদ্রাসারই এক সময়ের ছাত্র। তার ভাল ছাত্রদের চাকুরী দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি কোন আপোষ করেননি। ১৯৮৪ সালের ঘটনা। সুজাউল আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র মঈন উদ্দিন-যিনি ডাবল কামিল নিয়ে সুজাউল আসলে অতিরিক্ত প্রভাষক হিসাবে তাকে নিয়োগ প্রদান করেন আমাদের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক জনাব আজিজুর রহমান শাহবাগী। একজন মেধাবীকে মেধার রাজ্যে ধরে রাখা, নিজ জানাশোনা ছাত্রকে নিজের কাছে রাখা, মেধার মূল্যায়নের অভিপ্রায়ে সৃষ্ট পদে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি আমাদের পরিচিত পকুয়ার হুজুর মাওলানা মাঈন উদ্দিন। তার নিয়োগ নিয়ে মাদ্রাসায় একটি নোংরা রাজনীতি শুরু হয়। আমি তখন ১০ম শ্রেণীর ছাত্র। যারা আগামী দিনে এই মাদ্রাসায় বড় পদে আসীন হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তাদের কেউ কেউ আমাদেরকে মিসগাইড করে তথা সকল ছাত্রদের মিসগাইড করে উনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামান। কোন এক সন্ধ্যায় হাফেজ নিজাম ভাইয়ের লজিংএ (যিনি বর্তমানে বিয়ানী বাজার মাদ্রাসার শিক্ষক) ছাত্রদের সমাবেশ আহবান করা হয়। আমরা সেখানে উপস্থিত হলে অনুষ্ঠানে এক পর্যায়ে কুরআন নিয়ে আসা হয়। কুরআনের উপর হাত রেখে আমরা শপথ নেই যে, ছাত্রদের এই আন্দোলনে আমরা কখনো পলায়ন করবো না। ছাত্র নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যাই পদক্ষেপ নেয়া হোক না কেন, আমরা সাথে থাকবো। কুরআন নিয়ে শপথ। ছোট খাটো কথা নাকি। সেই সময়ে আমি ইসলামী ছাত্রশিবির করতাম না। অপর দিকে যারা ছাত্রশিবির করতেন, তাদের বুঝানো হয় যে, মাওলানা মাঈন উদ্দিন কট্টর জামায়াত বিরোধী একজন ব্যক্তি। তিনি এই মাদ্রাসায় আসলে এই মাদ্রাসায় আর শিবির করা যাবেনা। মাদ্রাসা কওমী মাদ্রাসা হয়ে যাবে ইত্যাদি।
১৯৮৪ সালের উত্থাল দিন গুলো এখনো চোঁখে ভাসে। ক্লাস বর্জন, মিছিল সমাবেশ সব কিছুতে আমরা ছোট হলেও সাথে ছিলাম। এক সময় এই আন্দোলন চরম আঁকার ধারণ করে। আন্দোলনের ধাক্কায় প্রিন্সিপাল আজিজুর রাহমান সাহেব কিংকর্তব্য বিমুড়। কারণ তাকে বুঝানো হচ্ছে, মাওলানা মঈন উদ্দিন সরকারী মাদ্রাসাকে পছন্দ করেন না, তিনি সরকারী মাদ্রাসায় পড়া হারাম ফতোয়া দিয়েছেন, তিনি জামায়াত বিরোধী লোক। অপর দিকে প্রিন্সিপাল আজিজুর রাহমান শাহবাগী বুঝতে পারতেছেন না যে, এই বিষয়টার সাথে জামায়াত শিবিরের স্বার্থের কি সম্পর্ক আছে। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে আপাদমস্তক একজন জামায়াতী লোক। তাকে বিভিন্ন জামায়াতী চ্যানেল থেকেও বুঝানো হলো।
সেই সময়ে বিষয়টি সমাধান করার জন্য  মাওলানা হাবীবুর রাহমান (এখন জামায়াতের সিলেট জেলা আমীর-তখন কি ছিলেন জানা নেই) পর্যন্ত সুজাউল মাদ্রাসা সফর করেছিলেন। এক পর্যায়ে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার হয়ে আসলেন কাজী আব্দুল মতিন। জামায়াতী চ্যানেল থেকে তাকে বুঝানো হলো, যাতে তিনি গভনিং বডির পদাধিকার বলে চেয়ারম্যান হওয়ার সুবাদে প্রিন্সিপালের উপর প্রভাব খাটান। এতো কিছু হলো। এমন কি যারা আন্দোলনে ছিল, তাদের মধ্যে শতাধিক ছাত্র টিসি নিয়ে এক সাথে গাংকুল মাদ্রাসায় চলে গেল (আমিও তাদের একজন ছিলাম)। কিন্তু শাহবাগী হুজুর তার আদর্শ হতে এক চুল পরিমাণ সরে আসেননি। কারণ তিনি মেধার মূল্যায়ন করতেন, নিজ ছাত্রদের উপর আস্থা রাখতেন। ৩২/৩৩ বছর পর যদি সেই ঘটনার পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে আমরা দেখবোঃ ১. মাওলানা মাঈন উদ্দিন সাহেব তার শিক্ষকতা জীবনে একটি দিন বা একটি মিনিটের জন্য জামায়াত বা শিবির বিরোধী কোন ভূমিকা রাখেন নি। ২. আমি যখন বড়লেখা উত্তর সাংগঠনিক থানা শিবিরের সভাপতি ছিলাম, তখন শিবিরের একজন অভিভাবক হিসাবে তাকে পেয়েছিলাম। আর্থিক এবং নানাবিধ সহযোগিতা তার থেকে আমি পেয়েছি। ৩. সুজাউল মাদ্রাসা কওমী মাদ্রাসা হয়নি। ৪. তিনি অতিরিক্ত প্রভাষক থেকে প্রভাষক এবং অদ্যাবধি সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন এমনকি একবার জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ট শিক্ষক হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১-৯২ সালে যখন বড় হয়ে সুজাউল মাদ্রাসায় ফিরে আসলাম, তখন মাওলানা আজিজুর রাহমান শাহবাগী হুজুর আমাদের ছোট কালের সেই ঘটনাটির কারণ বলেছিলেন। তার আলোচনা থেকে আমি তার নিজ ছাত্রদের প্রতি আন্তরিকতা ও ভালবাসা আর আকর্ষণ উপলব্দি করেছিলাম।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও আলেমে দ্বীন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ