হামাস কী চায়, তাদের সমর্থক কারা?

প্রকাশিত: ১২:১৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৯, ২০২৩

হামাস কী চায়, তাদের সমর্থক কারা?
ইসরাইলে বিভিন্ন শহরে নজিরবিহীন হামলা চালিয়ে এখন বিশ্বের প্রধান শিরোনাম ফিলিস্তিনের সবচেয়ে বড় সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। শনিবার ইসরাইলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ২০ মিনিটে পাঁচ হাজার রকেট ছুঁড়ে গোটা বিশ্বকে চমকে দেয় হামাস। বোকা বানায় বিশ্বের সর্বাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোমকে। ♦বিশ্বভূবন ডেস্ক♦

 

ইসরাইলও এই হামলার জবাবে গাজায় নৃশংস অভিযান শুরু করে। তাদের দাবি হামাসের ঘাঁটি লক্ষ্য করে এসব হামলা চলছে। দুই পক্ষের হামলা ও পাল্টা হামলায় এরি মধ্যে প্রায় এক হাজার মানুষ মারা গেছে। আর আহত বা গুরুতর জখম হয়েছে দেড় হাজারের বেশি। হামাম ও ইসরাইলের লড়াই এখনো চলছে।

 

ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের আকস্মিক হামলা বিষ্মিত করেছে অনেককে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, সাধারণত ইসরাইলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা হামলা চালিয়ে আসছিলো হামাস। এবার হামাস আগে হামলা চালাল, আর এর কারণ জানতে চলছে নানা বিশ্লেষণ। এসব জানতে হলে সবার আগে জানতে হবে হামাসকে।

 

১৯৪৮ সাল থেকেই ফিলিস্তিন দখল করতে শুরু করে ইসরাইল। এর আগে থিউডোর হার্জেল সুলতান আব্দুল হামিদের কাছে ফিলিস্তিনের ভূমি চেয়ে কোনো ফল পায়নি। এরপর থেকেই তারা দখলদারিত্ব, অন্যায়ভাবে হত্যা, খুন-গুমের মাধ্যমে ফিলিস্তিন দখল করার চেষ্টা শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতা এখনও চলছে।

 

আর ইসরাইলের এই আগ্রাসের বিরুদ্ধে একচেটিয়া ও নির্লজ্জ সমর্থন ও সহায়তা দিয়ে আসছে আমেরিকা ও পশ্চিমারা। এই দখলদারিত্বের প্রতিবাদেই প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে ফিলিস্তিন। ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাজেশন- পিএলও এই যুদ্ধ শুরু হয়।

 

মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিন নামের যে এলাকা, সেটি ছিলো অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানদের পরাজয়ের পর ব্রিটেন ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন ফিলিস্তিনে যারা থাকতো তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল আরব, সেই সঙ্গে কিছু ইহুদী, যারা ছিল সংখ্যালঘু।

 

কিন্তু এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করলো যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্রিটেনকে দায়িত্ব দিলো ইহুদী জনগোষ্ঠীর জন্য ফিলিস্তিনে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। ইহুদীরা এই অঞ্চলকে তাদের পূর্বপুরুষদের দেশ বলে দাবি করে। কিন্তু আরবরাও দাবি করে এই ভূমি তাদের।

 

১৯২০ থেকে ১৯৪০ দশকের মধ্যে ইউরোপ থেকে দলে দলে ইহুদীরা ফিলিস্তিনে যেতে শুরু করে এবং তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ইউরোপে ইহুদী নিপীড়ন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভয়ংকর ইহুদী নিধনযজ্ঞের পর সেখান থেকে পালিয়ে এরা নতুন এক মাতৃভূমি তৈরির স্বপ্ন দেখছিল।

 

ফিলিস্তিনে তখন ইহুদী আর আরবদের মধ্যে সহিংসতা শুরু হলো, একই সঙ্গে সহিংসতা বাড়ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধেও। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে এক ভোটাভুটিতে ফিলিস্তিনকে দুই টুকরো করে দুটি আলাদা ইহুদী এবং আরব রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হলো।

 

জাতিসংঘের ঘোষণায় বলা হলো, জেরুজালেম থাকবে একটি আন্তর্জাতিক নগরী হিসেবে। ইহুদী নেতারা এই প্রস্তাব মেনে নেন, কিন্তু আরব নেতারা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে জাতিসংঘের এই পরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। ব্রিটিশরা এই সমস্যার কোনো সমাধান করতে ব্যর্থ হয়ে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ছাড়ে।

আরও পড়ুন  চলমান বিধিনিষেধ ঈদ পর্যন্ত শিথিল

 

ইহুদী নেতারা এরপর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। বহু ফিলিস্তিনি এর প্রতিবাদ জানান এবং এরপর যুদ্ধ শুরু হয়। প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সৈন্যরাও যেখানে যায় যুদ্ধ করতে। হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে তখন হয় তাদের ঘরবাড়ি ফেলে পালাতে হয় অথবা চলে যেতে বাধ্য করা হয়।

 

ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনাকে ‘আল নাকবা’ বা ‘মহা-বিপর্যয়’ বলে থাকে। পরের বছর এক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যখন যুদ্ধ শেষ হলো, ততদিনে ইসরাইল ফিলিস্তিনের বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে নিয়েছে। জর্ডান দখল করেছিল একটি অঞ্চল, যেটি এখন পশ্চিম তীর বলে পরিচিত। আর মিশর দখল করেছিল গাজা।

 

জেরুজালেম নগরী ভাগ হয়ে যায়, ইসরাইলি বাহিনী দখল করে নগরীর পশ্চিম অংশ, আর জর্ডানের বাহিনী পূর্ব অংশ। দুই পক্ষের মধ্যে যেহেতু কখনোই কোনো শান্তি চুক্তি হয়নি, তাই উভয় পক্ষই অপর পক্ষকে দোষারোপ করতে থাকে। দুই পক্ষের মধ্যে পরের দশকগুলোতে এরপর আরও বহু যুদ্ধ হয়েছে।

 

১৯৬৭ সালে আরেকটি যুদ্ধে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের পূর্ব জেরুজালেম এবং পশ্চিম তীর, সিরিয়ার গোলান মালভূমি, গাজা, এবং মিশরের সিনাই অঞ্চল দখল করে নেয়। বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি শরণার্থী থাকে গাজা এবং পশ্চিম তীরে।

 

প্রতিবেশী জর্ডান, সিরিয়া এবং লেবাননেও আছে অনেক ফিলিস্তিনি। ইসরাইল এই ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধরদের কাউকেই আর তাদের বাড়িঘরে ফিরতে দেয়নি। ইসরাইল বলে থাকে, এদের ফিরতে দিলে সেই চাপ ইসরাইল নিতে পারবে না এবং ইহুদী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। ইসরাইল এখনও পশ্চিম তীর দখল করে আছে। গাজা ছেড়ে দিয়েছে।

 

গত ৫০ বছর ধরে ইসরাইল এসব দখল করা জায়গায় ইহুদী বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে। ছয় লাখের বেশি ইহুদি এখন এসব এলাকায় থাকে। ফিলিস্তিনিরা বলছে, আন্তর্জাতিক আইনে এগুলো অবৈধ বসতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায়। তবে ইসরাইল তা মনে করে না।

 

পূর্ব জেরুজালেম, গাজা এবং পশ্চিম তীরে যে ফিলিস্তিনিরা থাকেন, তাদের সঙ্গে ইসরাইলিদের উত্তেজনা প্রায়ই চরমে ওঠে। গাজা শাসন করে কট্টরপন্থি ফিলিস্তিনি দল হামাস। ইসরাইলের সঙ্গে তাদের অনেকবার যুদ্ধ হয়েছে। গাজার সীমান্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ইসরাইল এবং মিশর।

 

ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যে অনেক বিষয় নিয়ে এখনও বিরোধ চলছে। এর মধ্যে আছে ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু, পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতির ইস্যু, জেরুজালেম নগরী কি ভাগাভাগি হবে- এসব প্রশ্ন। আর সবচেয়ে জটিল ইস্যু হচ্ছে- ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন।

 

হামাস কিন্তু ফিলিস্তিনের মূল কর্তৃপক্ষ নয়। হামস মূলত গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণ করে। হামাস প্রথমে একটি রাজনৈতিক সংগঠন ছিল। কিন্তু শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনেও ইসরাইলি দমন-পীড়ন এবং হত্যাযজ্ঞের জন্য হামাস বিকল্প পন্থা ভাবতে থাকে। তখন হামাস মনে করে, সামরিক প্রতিরোধেই ফলপ্রসূ কিছু সম্ভব।

 

আরও পড়ুন  তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা, পরিত্রাণ মুশকিল!

তাই তারা সামরিক শাখা চালু করে, যা ‘কাসসাম ব্রিগেড’ নামে পরিচিত। হামাস শব্দটির অর্থ হলো, আশা বা উদ্দীপনা। ফিলিস্তিনের কট্টর ইসলামপন্থি সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হামাস।

 

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে ইসরায়েলি দখলদারির অবসানের দাবিতে ‘ইন্তিফাদা’ বা ফিলিস্তিনি গণজাগরণ শুরু হলে ১৯৮৭ সালে গঠিত হয় হামাস। সংগঠনের সনদ অনুযায়ী তারা ইসরাইলকে ধ্বংস করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আর তাদের দাবি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে বর্তমান ইসরাইল, গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে।

 

এআহমেদ ইয়াসিন এবং আবদেল আজিজ আল-রান্টিসি মিশরীয় মুসলিম ব্রাদারহুডের একটি অঙ্গসংগঠন হিসাবে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হামাস মানে, হরকাত আল-মুকাওয়ামাহ আল-ইসলামিয়া, যার অর্থ- ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন।

 

গোষ্ঠীটি বলছে, ইসরাইল ১৯৬৭ সাল আগের সীমান্তে পিছু হটলে, ক্ষতিপূরণের সঙ্গে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিলে একটি যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে। আরও বলেছে, তারা মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক শেষ করবে। ইসরাইল অবশ্য হামাসের এসব দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছে।

 

হামাসের রয়েছে একটি সাংস্কৃতিক শাখা- দাওয়াহ এবং একটি সামরিক শাখা- ইজ আদ-দিন আল-কাসাম ব্রিগেড। হামাস ইরান সমর্থিত এবং সিরিয়া ও লেবাননের ইসলামপন্থি দল হিজবুল্লাহ নিয়ে গঠিত একটি ব্লকের অংশ। ব্লকের সব সদস্য এই অঞ্চলে মার্কিন নীতির বিরোধিতা করে।

 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, শনিবারে হামাসের হামলা দখলকারীদের বিপক্ষে ফিলিস্তিনি জনগণের আস্থার প্রমাণ। ফিলিস্তিন অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশে হামাসের সমর্থক রয়েছে। এই অঞ্চলে, ইরান, সিরিয়া এবং ইয়েমেন হামাসকে ‘বীরত্বপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করে হামলায় সমর্থন দিয়েছে।

 

কাতার পরিস্থিতির জন্য একমাত্র ইসরাইলকে দায়ি করেছে। আরব লীগ এবং জর্ডানও ইসরাইলের নীতি এবং বর্তমান সংঘাতের সঙ্গে এর যোগসূত্রকে দায়ি করেছে। মিশর, মরক্কো ও সৌদি আরব সংযমের আহবান জানিয়েছে। আর আমেরিকার যথারীতি ইসরাইলের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।

 

বিশ্বব্যাপী ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয় ইউনিয়ন, কানাডা, মিশর এবং জাপান হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে দেখে থাকে। ২০১৮ সালে হামাসের কার্যকলাপের নিন্দা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাতিল করা হয়। সেই প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীন ভেটো দিয়েছিলো।

 

ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে হামাসের উত্থান, ইয়াসির আরাফাতের দল ফাতাহ-এর সঙ্গে সংঘর্ষে নিয়ে আসে। ১৯৯০ দশকে একটি আধা-সামরিক সংস্থা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ফাতাহ। পরে সশস্ত্র প্রতিরোধ ছেড়ে দেয় এবং ইসরাইলের সঙ্গে ১৯৬৯ সালের সীমানা অনুযায়ী একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে রাজি হয়।

 

২০০৪ সালের ১১ নভেম্বর ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর ফাতাহ নেতৃত্বে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, শক্তিশালী হয়ে ওঠে হামাস। ২০০৭ সালে ফাতাহর সঙ্গে গৃহযুদ্ধের পর গোষ্ঠীটি গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়। অন্যদিকে ফাতাহ পশ্চিম তীরে ক্ষমতা ধরে রাখে। হামাস নিজেদের ইসলামপন্থি হিসেবে পরিচয় দিলেও ফাতাহ ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে।

 

তথ্য সূত্র: বিবিসি, আজ জাজিরা, এনডিটিভি

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ