হাকালুকিতে ত্রানবাহী নৌকা দেখলেই ছুটে আসে বানবাসীরা

প্রকাশিত: ৭:০৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০১৭

ময়নুল হক পবন: ত্রানবাহী নৌকা দেখলেই ছুটে আসেন বানবাসী মানুষ। ভীড় লেগে যায় হাকালুকি হাওরে। এ চিত্র প্রতিদিনকার। মেম্বার চেয়ারম্যানদের লিষ্ট মোতাবেক ত্রান বিতরন করতে গিয়ে বানভাষী মানুষের রোষানলে পড়েন ত্রান বিতরনকারী সরকারী বেসরকারী কর্তৃপক্ষ। যদিও এ পর্যন্ত ৩শ ৪০ মে:টন চাল ,নগদ ১৭ লক্ষ টাকা বিতরন হয়েছে কুলাউড়ার বন্যা কবলিত ৬ ইউনিয়নে। ২৪ হাজার জন ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি পেয়েছেন সরকারী ত্রান সহায়তা। কিন্তু বানভাষী মানুষের চাহিদা ব্যাপক। কারন মার্চের ২৮ তারিখ থেকে শুরু হওয়া ১ম দফা অকাল বন্যায় হাকালুকির সমস্থ বোরো ধান পানিতে পচে নষ্ট হওয়ার পর জুন থেকে শুরু হওয়া ২য় দফা বন্যায় মানুষের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে পড়ায় মানুষের দুঃখ কষ্টের শেষ নেই। এদিকে গত ৩ দিন থেকে পানি কিছুটা কমলেও হাকালুকির মানুষের দূর্ভোগ মোটেই কমেনি বরং দূর্ভোগের সাথে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট,ভাইরাস জ্বর,ডায়রিয়া ,নিউমেনিয়াসহ পানিবাহিত রোগবালাই।

সরেজমিনে শুক্রবার (৭ জুলাই) বিকেল ২ টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া উপজেলা অংশের শতভাগ ক্ষতিগ্রস্থ ভুকশিমইল ইউনিয়নের কাড়েরা,জাবদা,চিলারকান্দি,বড়দল ,কানেহাত ও ভুকশিমইল গ্রাম ঘুরে দেখা যায়,মানুষের বাড়িতে এখনো হাটু পানি। রাস্তাঘাট পানীর নীচে। বাড়ী থেকে বোরোনোর কোন সুযোগ নেই। যাদের নৌকা রয়েছে তারা যাতায়াত করতে পারছেন। আর যাদের নৌকা নেই তারা বাড়ী থেকে ত্রান বিতরনকারী কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করছেন যে যেভাবে পারছেন সেভাবে। কথা হয় বড়দল গ্রামের গৌরাঙ্গ,জামাল ও রিয়াজসহ কয়েকজনের সাথে। তাদের বক্তব্য সরকার থেকে সাহায্য পাচ্ছেন । কিন্তু তা একেবারেই নগন্য। কেউ পেয়েছেন ঈদের আগে একবার ১০ কেজি চাল। আবার কেউ পেয়েছেন ঈদের পরে ১৩ কেজি করে গম। আবার কেউ কেউ আবার পেয়েছেন ৫ শ টাকা করে। অনেকে আরও বেশীও পেয়েছেন। কিন্তু বোরো ধান হারানো এবং বর্তমানে বন্যার জন্য আয় রোজগার বন্ধ মানুষের এ ত্রান পেয়ে অভাব লাঘব হচ্ছেনা। বড়দল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী মো:গোলাম রাব্বি নৌকা যোগে দূর্গত মানুষের বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে শুকনো খাবার ও চাল বিতরন করছেন। সঙ্গে ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির,কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা:জাকির হোসেন,জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবুল কাশেম রয়েছেন। তারা দূর্গত মানুষের মধ্যে পানি বিশুদ্ধকরন ট্যাবলেট বিতরন করছেন।

আরও পড়ুন  সিলেট জেলা বিএনপি’র কাউন্সিল || কাইয়ুম সভাপতি, এমরান সম্পাদক

এসময় ইউএনও চৌধুরী গোলাম রাব্বি সাংবাদিকদেরকে জানান,দূর্গত মানুষের চাহিদা অসীম। কুলাউড়া উপজেলায় এ পর্যন্ত ২৪ হাজার মানুষের মধ্যে ত্রান বিতরন করা হয়েছে সরকারীভাবে। বেসরকারীভাবে বিভিন্ন ব্যাংক,প্রবাসী ও ব্যাক্তি উদ্যোগেও ত্রান বিতরন করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারী হিসাবে ২১ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। তিনি জানান, গত ৪ জুলাই দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রান মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী মহোদয় সরেজমিনে হাকালুকির দূর্গত মানুষের চিত্র দেখে ৩শ মে:টন চাল,নগদ ৩০ লক্ষ টাকা এবং ১ হাজার বান্ডিল ডেউটিন বরাদ্ধ দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেছেন। মন্ত্রী ময়োদয়ের আশ্বাসকৃত বরাদ্ধ পেলেই হাওরের বানভাসী মানুষের দূর্ভোগ নিরসন হয়ে যাবে। আর সরকারের চলমান সাহায্য সহযোগীতা অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও জানান, সরকারের পক্ষ বরাদ্ধ দেওয়া ত্রান বিতরনে চেয়ারম্যান মেম্বারকে সততার সহিত বিতরনের নিদের্শ দেওয়া হয়েছে। কোন অনিয়ম হলে কোন ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

এদিকে কুলাউড়াসহ ৪ উপজেলার ৪৮ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এদিকে উপজেলা প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে,হাকালুকি হাওরের মানুষের দূর্ভোগ লাঘবে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ বিশেষ করে স্বাস্থ্য,জনস্বাস্থ্য,এলজিইডি,ত্রান ও পূর্নবাসন,কৃসি,পশু সম্পদ বিভাগ সমন্বিতভাবে বানভাষী মানুষের কল্যানে কাজ করছে। ইতিমধ্যে জনস্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ৮ হাজার পানি বিশুদ্ধকরন ট্যাবলেট বিতরন করা হয়েছে এবং আরও ৭ হাজার মজুদ রয়েছে বলে জানান উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবুল কাশেম। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ১৮ টি মেডিকেল টিম মাঠে সার্বক্ষনিক মাঠে কাজ করছে। বানভাসী মানুষের মধ্যে স্যালাইন,পানি বিশুদ্ধকরন ট্যাবলেট,সরকারী ঔষুধ এবং চিকিৎসাপত্র দেওয়া হচ্ছে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা:মোহাম্মদ নুরুল হক।

আরও পড়ুন  দুর্গাপূজা উপলক্ষে এসএমপি'র মতবিনিময় সভা

এব্যাপারে শতভাগ ক্ষতিগ্রস্থ ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, হাওরের মানুষের যে পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা চলমান সরকারী সাহায্য দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব হচ্ছেনা। মানুষের চরম অভাবের মধ্যে আছেন। আমরা সরকারের তরফ থেকে যা পাচ্ছি সাথে সাথে তা মানুষের মধ্যে বিতরন করে ফেলছি।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী মো:গোলাম রাব্বি জানান,কুলাউড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ৬ ইউনিয়নের মধ্যে ৭০ টি গ্রাম বন্যা কবলিত । এর মধ্যে ১ হাজার ৮ শত ৪৩ টি ঘরবাড়ী আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ৪শ ৫০ টি পুকুর বন্যায় ডুবেছে ৪ হাজার ৭ শ হেক্টর বোরো ও আউশ ক্ষেত বন্যায় ভেসে গেছে। ৪৫ কি:মি পাকা রাস্তা,৭ কি:মি: কাচা রাস্তা,৫ টি কালভার্ট,৯টি ব্রীজ,৩ টি বাধ,৭টি স্লুইচ গেইট ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়াও পশু পাখির খাদ্য,খড়,ঘাস ক্ষয়ক্ষতিসহ মোট ২১ হাজার মানুষ সরাসরি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে গত তিনমাসে জিআর ১১৪ মে:টন,বিশেষ ভিজিএফ ৭৯ মে:টনসহ মোট ৩শ ৪০ মে:টন চাল ও গম এবং জিআর নগদ ৪ লাখ ২০ হাজারসহ মোট ১৬ লক্ষ ৯৫ হাজার টাকা বিতরন করা হয়েছে। আরও বরাদ্ধ আসার প্রক্রিয়া রয়েছে। পেলেই বিতরন করা হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ