নূর হোসেনের আলোজলমল রংমহল এখন মৃতপূরী

প্রকাশিত: 9:53 AM, January 20, 2017

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা :  অন্ধকার হলেই শুরু হয়ে যেত হিন্দি ‘আইটেম সং’ আর দামি ব্রান্ডের মদের সঙ্গে সুন্দরী নারীদের উদ্দাম নৃত্য। এটা কোনো সিনেমার শুটিং নয়, বাস্তবে প্রতিরাতে এসব কাজ করতেন ৭ খুন মামলার অন্যতম প্রধান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূর হোসেন।

এই জায়গাগুলো রংমহল নামেই পরিচিত ছিল। এসব জায়গায় একসময় আসতেন ক্ষমতাসীন দলের অনেক রথী মহারথী আর প্রভাবশালী কর্মকর্তারা। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথেই জ্বলে উঠত রঙ্গীন আলোয় ভরা ঘরগুলো।

হিন্দি গানের তালে তালে মদের সঙ্গে সুন্দরী নারীদের উদ্দাম নৃত্য চলত ভোররাত পর্যন্তই। কেউ কেউ আবার রাত কাটাতেন এসব ললনাকে সঙ্গে নিয়ে আবার কেউ চলে যেতেন নির্দিষ্ট গন্তব্যে।

এখন ‘গডফাদার’ নূর হোসেনের সেই আলোচিত ৩ রংমহল শুধুই স্মৃতি। অনেক আগেই পালিয়ে গেছেন নূর হোসেনের তিন রংমহল আলো করে থাকা সাদিয়া, মিতা ও নূরজাহান নামের ৩ অপরূপা ‘রক্ষিতা’।

বহুবার দেখা হলেও ৭ খুন মামলার রায় ঘোষণার পর নূর হোসেনের এসব রংমহল নতুন কৌতূহলের বশে আবারো দেখতে আসছেন এলাকার মানুষ।

নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজের নিচে বিআইডব্লিউটিএ’র ল্যান্ডিং স্টেশন সংলগ্ন দোতলা একটি ভবন, শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন পুকুরের মাঝে টিনশেড বাড়ি এবং বন্দরের কুড়িপাড়ায় কিলার সেলিমের (মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত) বাড়িটি ব্যবহৃত হতো রংমহল হিসেবে। আর ওই তিন ললনা ছিল এ তিন রংমহলের দায়িত্বে।

জানা যায়, পুলিশ-প্রশাসন থেকে শুরু করে বিশেষ বাহিনীর অনেকের সঙ্গেই ছিল নূর হোসেনের গভীর সখ্য। ডাকসাইটের অনেক গণমাধ্যম কর্মীও নূর হোসেনের সঙ্গে রাখতেন সার্বক্ষণিক যোগাযোগ। নূর হোসেনের বিশাল মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, পরিবহন ব্যবসা, দখলবাজিসহ প্রতিটি ক্ষেত্র নিরাপদ রাখতে যখন যাকে প্রয়োজন, তাকেই ব্যবহার করতেন নূর হোসেন। এমনকি দখল করা ট্রাকস্ট্যান্ডে মাসের পর মাস চলে আসা অশ্লীল নৃত্য আর জুয়ার মেলার সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদার করে নিয়েছিলেন বিশেষ পেশার অনেককেই।

আরও পড়ুন  এবার শাহজালালের মাজারে ওরস হচ্ছে না !

তবে রংমহলের বাতি জ্বালিয়ে রাখতে নূর হোসেনের সাম্রাজ্য ঘিরে থাকতেন ওই তিন মহিলাসহ ঢাকা মিডিয়াপাড়ার অনেকেই। এ কাজের জন্য মাসে নির্দিষ্ট হারে বেতন পেতেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, মূলত কাঁচপুর ব্রিজের নিচে বিআইডব্লিউটিএ’র ল্যান্ডিং স্টেশন সংলগ্ন দোতলা ভবনটি এবং বন্দরের কুড়িপাড়ায় কিলার সেলিমের বাড়িটি ছিল নূরের প্রধান রংমহল। সমাজের নামিদামি অনেকেই এখানে আসতেন নূরের বিশেষ দাওয়াতে। রাতের খাবারের মেন্যুতে কমন থাকত কবুতরের মাংস, হাঁসের মাংস, গরুর ভুনা। সঙ্গে থাকত বিশ্বের দামি ব্রান্ডের মদ আর সুন্দরী ললনা।

এসব উপঢৌকনের মাধ্যমে নূর একদিকে যেমন তার সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখত, তেমনি যে কোনো কাজ বাগিয়ে আনা ছিল সহজতর। অপরদিকে শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন পুকুরের মাঝে টিনশেড বাড়িটি মূলত ছিল মাছের খামার। প্রশাসনের শৌখিন মৎস্য শিকারিদের এখানে এনে বশ করতেন নূর হোসেন।

এ প্রসঙ্গে এলাকাবাসী জানান, পুলিশ, প্রশাসন এবং বিশেষ বাহিনীর অনেকেই আসতেন এখানে মাছ ধরতে। এ খামারে বিশাল আকৃতির মাছ চাষ করা হতো শুধু তাদের জন্যই। বড়শিতে মাছ না পেলেও জাল টেনে মাছ দিয়ে দেয়া হতো ওসব কর্তাকে।

আরও পড়ুন  ডেভিড বেকহ্যামের উত্তরসূরি যখন হ্যারি কেইন

নূরের পতনের পর চুপসে গেছেন তার মাসিক বেতন পাওয়া সরকারি দলের অনেক নেতাও। নূরের দেশে ফিরে আসার পর থেকে তারা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন নূর বন্দনা থেকে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, নূর হোসেনের অবৈধ আয়ের মূল উৎস শিমরাইলের ট্রাকস্ট্যান্ডে মাদক ও জুয়ার আখড়া। এ স্ট্যান্ডে প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মাদক বিক্রি হতো। এর বাইরে জুয়ার আসরে হাতবদল হতো কোটি টাকা।

এ স্ট্যান্ডের দেখভাল যারা করতেন তাদের মধ্যে এলাকায় আছেন শুধু আমির হোসেন ভাণ্ডারি। সড়ক ও জনপদ বিভাগ এবং সিটি কর্পোরেশনের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণে সার্বিক মদদদাতা ছিলেন হাসমত আলী হাসু, বড় হজরত, ছোট হজরত ও জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া।

এক সময় আদমজী জুট মিলের শ্রমিক নেতা সাদেকুর রহমান সাদেক বর্তমানে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। নূর হোসেনের প্রথম জীবনে রাজনৈতিক গডফাদারের ভূমিকায় ছিলেন তিনি। টাকার বিনিময়ে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্ব ছিল তার। নূর হোসেনের প্রায় ৪০ বছরের পরীক্ষিত বন্ধু আবুল কালাম ওরফে হিটলার কালাম। মাসিক এক লাখ টাকা পারিশ্রমিকে তিনি নূর হোসেনের অবৈধ নানা ব্যবসার দেখভাল করতেন। যদিও এখন তিনি ‘সাফসুতরা’ হয়ে গেছেন।

সর্বশেষ সংবাদ