নজরুল: সিলেট আগমনের শতবর্ষ

প্রকাশিত: 2:09 AM, June 26, 2026

নজরুল: সিলেট আগমনের শতবর্ষ

মোঃ মোস্তফা মিয়া

কবি কাজী নজরুল ইসলাম কোনো একটি যুগের কবি নন। তিনি বিংশ শতাব্দীর বিদ্রোহের আগুন নিয়ে জন্মেছিলেন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ আজও একবিংশ শতাব্দীর প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে। তাই বলা যায়, নজরুল যুগ থেকে যুগান্তরে বিচরণকারী এক চিরজাগ্রত চেতনা। যার পরিধি শুধু উপমহাদেশ না, তাঁর বিচরণ বিশ্বব্যাপী।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এবং চা-বাগানের লীলাভূমি সিলেটে কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালে প্রথম আগমন করেন। বিদ্রোহের কবি নজরুলের সিলেট আগমন বিষয়ে নিম্নের সূত্র গুলো পরিলক্ষিত হয়।যথা-
১. ১৯২৬ সাল- এটা সব সূত্রে একমত।
২. প্রেক্ষাপট: ১৯২৬ সালে তিনি ফেনী, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, দৌলতপুর এবং সিলেটে কংগ্রেসের সভায় যোগ দিতে এসে ছিলেন।
৩. দ্বিতীয়বার আসেন ১৯২৮ সালে। ১৯২৮ সালে সিলেটে থাকার সময় তিনি সাদির ভবন, আম্বরখানায় ছিলেন এবং ২ কার্তিক ১৩৫ বঙ্গাব্দে [১৯২৮ সাল] একটি কবিতা লেখেন। নির্দিষ্ট করে লেখা কবিতার নাম জানা সম্ভব হয় নাই।
১৯২৬ সাল, ব্রিটিশ ভারত তখন পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। ঠিক সেই সময়, বিদ্রোহের আগুন হাতে নিয়ে সিলেটে পা রাখলেন এক যুবক কবি—কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর বয়স তখন মাত্র ২৭। কিন্তু কণ্ঠে ছিল কোটি মানুষকে জাগানোর শক্তি। সিলেটবাসীর স্মৃতিতে সেই আগমন আজও অমলিন, কারণ সেদিন নজরুল শুধু আসেননি, তিনি সিলেটের মাটিতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিদ্রোহ, প্রেম আর মানবতার বাণী।
আগমনের পটভূমি ও উদ্দেশ্য:
১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতার ‘লাঙল’ ও ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে নজরুল তখন সারা বাংলায় পরিচিত নাম। মুসলিম লীগের সিলেট জেলা শাখার আমন্ত্রণে তিনি সিলেট আসেন সাহিত্য সম্মেলন ও রাজনৈতিক সভায় যোগ দিতে। উদ্দেশ্য ছিল দ্বিমুখী—একদিকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জনমত গঠন, অন্যদিকে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা।
সিলেট তখন ছিল আসামের অংশ। চা-শ্রমিক, কৃষক আর মধ্যবিত্তের সংগ্রামের শহর। নজরুল জানতেন, শোষিতের কান্না এখানে সবচেয়ে জোরে শোনা যায়। তাই তিনি এলেন সরাসরি মানুষের কাছে।
সিলেটের মানুষের অভ্যর্থনা:
সিলেট রেলস্টেশনে নজরুলকে বরণ করে নেন তৎকালীন মুসলিম নেতা মৌলভী আব্দুল মুত্তালিব মজুমদার, মৌলভী গোলাম রহমান, এবং তরুণ সাহিত্যিকরা। শহরে তখন রব উঠেছিল—“বিদ্রোহী কবি এসেছেন!”
আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ, সিলেট টাউন হলে পরপর কয়েকটি সভা হয়। হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে যুবকরা ভিড় করে শুনতে আসে। নজরুলের গর্জন—“বল বীর, বল উন্নত মম শির!”—সিলেটের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দেয়। মানুষ প্রথমবার এত কাছ থেকে শোনে সেই বিদ্রোহী কণ্ঠ, যা ব্রিটিশের কারাগারকেও ভয় পায়নি।
সিলেটে রচিত সৃষ্টি ও স্মৃতি:
বিশ্বাস করা হয়, সিলেট অবস্থানকালে নজরুল ‘শাত-ইল-আরব’ কবিতার কিছু অংশের অনুপ্রেরণা পান সুরমা নদীর তীরে বসে। সুরমার রূপ, পাহাড়ি হাওয়া, আর চা-বাগানের বিস্তীর্ণ প্রান্তর তাঁর কবিতায় নতুন রঙ আনতে সক্ষম হয়।
সিলেটের সুফি-সাধক শাহ জালের মাজার জিয়ারত করেও তিনি গভীরভাবে আলোড়িত হন। পরবর্তীতে ‘আলী আমার মাওলা’ জাতীয় ইসলামি গানে সেই আধ্যাত্মিক প্রভাবের ছাপ পাওয়া যায়। সিলেটের মুসলিম পুনর্জাগরণের নেতা সৈয়দ মুজতবা আলীর সঙ্গেও তাঁর এই সময়েই পরিচয় হয় বলে ধারণা করা হয়।
প্রভাব ও তাৎপর্য:
নজরুলের ১৯২৬ সালের সিলেট আগমন ছিল শুধু সাহিত্যিক সফর নয়, এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ। যা পরবরতি রাজনৈতিক ঘটনাবলীতে সিলেটের তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়।
১. যুব জাগরণ: তাঁর বক্তৃতা ও গান সিলেটের তরুণদের অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে।
২. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: তিনি হিন্দু-মুসলমানকে এক মঞ্চে এনে ‘মানুষের ধর্ম’ নিয়ে কথা বলেন। সিলেটের বহু-ধর্মীয় সমাজে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
৩. সাহিত্য আন্দোলন: সিলেট সাহিত্য সংসদ ও পরবর্তী লেখকরা নজরুলের প্রগতিশীল ধারায় প্রভাবিত হন।
আজকের সিলেটের জন্য শিক্ষা:
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা যখন নজরুলের শতবর্ষী সিলেট আগমন স্মরণ করি, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সেই বিদ্রোহ ধরে রাখতে পেরেছি?
নজরুল শিখিয়েছিলেন: অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলো, মানুষকে মানুষ ভাবো, ভাষা ও ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাকে ভালোবাসো। সিলেটের চা-বাগানের শ্রমিক, বন্যাকবলিত মানুষ, প্রবাসী পরিবার—সবার জন্যই এই বার্তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
কাজী নজরুল ইসলাম সিলেটে মাত্র কয়েকদিন ছিলেন। কিন্তু সেই কয়েকদিনে তিনি বুনে দিয়ে গেছেন আগুনের বীজ। সেই বীজ থেকে আজও সিলেটের সাহিত্য, রাজনীতি আর সংস্কৃতিতে বিদ্রোহের ফসল ওঠে।
সুরমার পাড়ে দাঁড়িয়ে আজও মনে হয়, যদি কবি আবার আসতেন, তবে বলতেন—
“উঠরে জাগো সিলেটবাসী, ভাঙো পরাধীনতার শিকল।
তোমার অধিকার তুমিই ছিনিয়ে নাও, ভয় কীসের, মরণ কীসের?”
নজরুল শুধু অতীত নন, তিনি সিলেটের বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও কবি।
নজরুল চিরকালীন পথিক:
নজরুল কোনো যুগের সীমানায় বন্দী নন। তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কবি, আবার ধর্মনিরপেক্ষতার দূত। তিনি প্রেমের কবি, আবার শোষিতের কণ্ঠ, আবার ইসলামী চেতনার কবি।
তাই তিনি যুগ থেকে যুগান্তরে বিচরণ করেন। সময় বদলায়, শাসক বদলায়, সমস্যা বদলায়—কিন্তু অন্যায় যখন থাকে, নজরুলের কবিতা তখন জেগে ওঠে।
শেষ করি তাঁরই ভাষায়:
“আমি চির উন্নত শির, শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির”
নজরুল মরে যাননি। তিনি প্রতি প্রজন্মে নতুন করে জন্ম নেন। যুগে যুগে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে তিনি চিরজাগ্রত হয়ে ভূমিকা পালন করে। তিনি আছেন, তিনি থাকবেন। তাঁর সিলেট আগমনের শতবর্ষে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে, তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।

আরও পড়ুন  জননেতা আব্দুল মান্নান, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং সেই  তৃপ্তির হাসি

লেখক: শিক্ষাবিদ ও এনজিও ব্যক্তিত্ব

সর্বশেষ সংবাদ