শাবানা : শান্ত বাংলার নায়িকা

প্রকাশিত: 8:44 PM, May 11, 2017

শাবানা : শান্ত বাংলার নায়িকা

 

শাহনাজ শারমিন: শাবানা একজন বাংলাদেশী কিংবদন্তী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। ১৯৬৭ সালে চকোরী চলচ্চিত্রে চিত্রনায়ক নাদিমের বিপরীতে তার চলচ্চিত্রে আবির্ভাব ঘটে। শাবানার প্রকৃত নাম রত্না, শাবানা তার চলচ্চিত্রের নাম, যা চিত্র পরিচালক এহতেশাম দিয়েছিলেন। তার পুরো নাম আফরোজা সুলতানা রত্না। পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে।

বাঙ্গালী নারীর শাশ্বত রূপ তুলে ধরেছিলেন এই অভিনেত্রী। একের পর এক ব্যবসা সফল এবং দর্শকের মন জয় করা সিনেমা করেছেন তিনি। শাবানা মানেই এক মমতাময়ী মা, অন্যায়ের প্রতিবাদী এক নারী, ব্যক্তিত্ববান স্ত্রী, কখনো বা মমতাময়ী ভাবী। তার চোখের পানিতে টলটল করতো আমার মা বোনদের চোখ, সিনেমায় আঘাতপ্রাপ্ত হতে দেখলে ক্ষেপে উঠতো দর্শকের দল, কখনো বা সিনেমা দেখতে দেখতে কেউ কেউ চিৎকার করে উঠতেন “মার শালাকে, মার!”

এমনই মনোযোগ ধরে রাখতে পেরেছিলেন শাবানা। তার জায়গা আজও কেউ নিতে পারেননি। এখন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক ভালো ভালো প্রযুক্তির ব্যবহার হয়, কিন্তু সেই সাদা কালো যুগের শাবানাকে কেউ পেছনে ফেলতে পারেননি।

মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৬২ সালে প্রথম অভিনয় করেন ‘নতুন সুর’ সিনেমায়। ছোট মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করলেন। খুব বেশি বড় কোনো চরিত্র না হলেও এই সিনেমা তার মাঝে অভিনয় ক্ষুধা জাগায়। পরবর্তীতে বাবার হাত ধরে ১৯৬৩ সালে উর্দু ‘তালাশ’ সিনেমায় নাচের দৃশ্যে অংশগ্রহণ করেন। ‘আবার বনবাসে রূপবান’ এবং ‘ডাক বাবু’ সিনেমাতে তিনি সহ-নায়িকার কাজ পান।

আরও পড়ুন  পরীমণিকে ধর্ষণচেষ্টা: নাসির উদ্দিন গ্রেফতার

চলচ্চিত্রে শাবানার অভিষেক আজিজুর রহমানের হাত ধরে হলেও শাবানাকে রত্না থেকে শাবানা করে তুলেছেন পরিচালক এহতেশাম। এহতেশাম সম্পর্কে হালকা বলে নিচ্ছি। বাংলা চলচ্চিত্রের অনেক গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিষেক হয়েছে তার হাত ধরেই। ১৯৬৭ সালে এহতেশামের ‘চকোরী’ সিনেমায় নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করে অভিনয় জগতে নিজের স্থান পোক্ত করে নিতে শুরু করলেন শাবানা।

যে সময়ে রাজ্জাক-কবরী জুটি বেঁধে অভিনয় করতেন, শাবানা বিভিন্ন নায়কের সাথে জুটি বেঁধে অভিনয় করে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, তিনি কারো সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করার জন্য আসেন নি, তিনি নিজের অভিনয় গুণ দিয়ে যেকোনো অভিনেতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। আশির দশকের শেষ থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত যখন তার সময়ের অভিনেত্রীরা মূল চরিত্রে অভিনয় দূরে থাক, অভিনয় থেকে ইস্তফা নিয়েছেন, তখনও শাবানা দাপটের সঙ্গে একের পর এক ব্যবসা সফল সিনেমায় অভিনয় করে গিয়েছেন।

শাবানার অভিনীত ছবির সংখ্যা প্রায় পাঁচ শতাধিক। শাবানা শুধু একজন সফল অভিনেত্রীই ছিলেন না, একজন সফল প্রযোজকও ছিলেন। স্বামী সাদিক ওয়াহিদের সঙ্গে নিজস্ব প্রযোজনা এস এস প্রোডাকশন তৈরি করেছিলেন।

আমজাদ হোসেনের পরিচালনা এবং শাবানার অভিনীত ‘ভাত দে‘ সিনেমাটি প্রথম কান চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছিল। ছবিটির স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে আমজাদ হোসেনের এক মাস সময় লেগেছিল। একটি গরীব বাউল পরিবারের নিদারুণ কষ্টের ছবি তুলে ধরেছেন আমজাদ হোসেন।

আরও পড়ুন  না-ফেরার দেশে আশা ভোসলে

ওরা ১১ জন একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। বিখ্যাত পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৭২ সালে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এটিই প্রথম ছবি। এতে অভিনয় করেন শাবানা-রাজ্জাক, খসরু, মুরাদ, নান্টু।

এছাড়াও জননী, সখি তুমি কার, দুই পয়সার আলতা, অপেক্ষা, রাঙা ভাবী, সত্য মিথ্যা, মরণের পরে এবং অচেনা- এই সিনেমাগুলোতে শাবানা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার লাভ করেছেন। দেশীয় পুরস্কারের পাশাপাশি শাবানা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতেও অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, রুমানিয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালসহ আরো বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৯৭ সালে আজিজুর রহমানের পরিচালিত ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’ সিনেমার মধ্য দিয়ে নিজের অভিনয় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটান এককালের জনপ্রিয় এ নায়িকা। বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে তিনি আমেরিকায় বসবাস করছেন।

ইদানিং হিন্দি, ইংরেজি সিনেমার আড়ালে হারিয়ে গেছে বর্ণালী সেই সিনেমাগুলো। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে দর্শক পর্যন্ত সবাই পশ্চিমা ধাঁচের সিনেমা তৈরিতে এবং দেখতে ব্যস্ত। তবুও শাবানা, রাজ্জাক, আলমগীর, ববিতা এবং সালমান শাহদের যুগকে, বাংলা সিনেমার স্বর্ণালী সেই যুগকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না, তাদের মতো তেমন ভালো অভিনেতা আমরা আরো পাব কিনা জানিনা।

সর্বশেষ সংবাদ