হযরত শাহ্ জালাল ইয়ামেনী (রহ.)

প্রকাশিত: ৮:৪৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০১৬

‘তুমি রহমতের দরিয়া, দোয়া করো মোরে হযরত শাহজালাল আউলিয়া।’ সুরমা পারের কবি দিলওয়ার তার গানের সুরে যে মহান দরবেশের দোয়া কামনা করেছেনÑসেই দোয়া লাভের প্রত্যাশা নিয়ে প্রতিদিন এখানে ছুটে আসে শত শত ভক্ত পূর্ণার্থী। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই এখানে প্রবেশ অবারিত। কেউ আসে পূণ্য লাভের আকাক্সক্ষায় কেউ আসে মানত পূরণের অভিলাষ নিয়ে। তবে প্রতিবছর ঊরূসের সময় এখানে বসে ভক্তের মেলা। মানুষ আসে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত। মাজার প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা শহরে।

‘এ কি সচকিত অপরূপ তজল্লী-অস্থির
শ্যামল পূর্ব-পাকিস্তানের ভাল্!
পাক-বাংলার নাভিশিরা বেয়ে শোর উঠে গম্ভীর
কোমলের দেশে, সবুজের দেশে একি জ্বালোয়ার লালী
শ্যামল কিশলে এল কি ফাগুন নিয়ে কুসুমের ডালি?
তূর উপবনে ও কি তবে সেই আলোক স্তম্ভ জ্বেলে
কলীমের পথে বসে আছে আশা-উন্মুখ আঁখি মেলে?
নতুবা কেমনে এ সবুজ দেশ সামালিছে তার তাল,
একটি হরিৎ পাতাও পোড়েনিÑএকটি সবুজ ডাল!
অথচ সে নূর রোশনী ছড়ায় সুদূর গহন পুরে
গৌরগোবিন্দের প্রাসাদ পুরী ছারখার হয় পু’ড়ে।
মনে করায় সে শিশু-খুনী ফেরাউনরে!
সাওর গিরির গুহা বিমুক্ত নূরের রৌশনী দিয়ে
তামসীরে চমকিয়ে
লাউর শৃঙ্গ শামাদানে এনে স্থাপিলে সে নূরশিখা,
গিরি সিঁড়ি হল যাঁর পদতলেÑ
পেশানীতে যাঁর জুহল-তারার টিকা,
বংগাসামের সেই বীর আব্দাল
আসে আউলিয়া বাহিনীর আগে হযরত শা-জালাল!’

শায়খ জালাল। পুরো নাম জালালুদ্দীন। তবে তিনি শাহ্ জালাল নামে সমধিক পরিচিত।
‘শায়খ’ সম্মানসূচক শব্দ। ‘শায়খ’ কখন, কিভাবে ‘শাহ্’-এ পরিণত হল তা অজ্ঞাত। সিলেট শহরের আম্বরখানায় প্রাপ্ত ১৫১২ খ্রিস্টাব্দে হোসেন শাহী শিলালিপিতে ‘মাশায়েখ মখদুম শেখ জালাল মজররদ বিন মুহম্মদ’ নামে অঙ্কিত আছে। চিরকুমার বলে শাহ্ জালাল ‘মজররদ’ নামে খ্যাত ছিলেন।
শাহ্ জালাল আরবের ইয়ামন দেশের কুনিয়া নামক স্থানে বিখ্যাত কোরেশ বংশের শায়খ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে বিতর্ক আছে। মৃত্যুর সন থেকে অনুমান করা হয় শাহ্ জালালের জন্ম সাল ১২৭১ খ্রিস্টাব্দ। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ বিন ইব্রাহিম কোরেশী। মাতার নাম সৈয়দা হাসিনা ফাতিমা বিনতে জালালুদ্দিন সূরুখ বোখারী। মাতামহের নাম সৈয়দ সুরুখ বোখারী।
শাহ জালালের জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা মোহাম্মদ বিন ইব্রাহিম ধর্মযুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। মা শাহ্ জালালের জন্মের তিন মাসের পর ইন্তিকাল করেন। ফলে তাঁর লালন পালনের ভার পড়ে মামা সৈয়দ আহমদ কবীরের উপর। সৈয়দ আহমদ কবিরের তত্ত্বাবধানেই তিনি কোরআন, হাদীস, ফিকাহ, সমাজনীতি, রাজনীতি, রণনীতিতে শিক্ষা লাভ করেন। মামার সান্নিধ্যেই তিনি রূহানী জীবনের উৎকর্ষ সাধন করেন। পরে শাহ্ জালাল তাঁর পিতার পীর হযরত আবু সইদ তাবরিজীর মুরীদ হন এবং পিতার মতো তাবরিজী উপাধি গ্রহণ করেন। শাহ্ জালাল তাই ইয়ামনী ও তাবরিজী নামেও পরিচিত।

সিলেটে প্রথম আজান ধ্বণি
মুসলিম বাহিনী প্রতিরোধের শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে গৌড় গোবিন্দ সুরমা নদী তীরের সকল প্রকার নৌযান প্রত্যাহার করলে হযরত শাহজালাল ও তাঁর বিশিষ্ট সঙ্গীসহ পবিত্র জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নদী পাড়ি দেন। সিলেটে প্রবেশ করে হযরত শাহজালাল হযরত শাহনূর-কে আজান দিতে নির্দেশ দেন। তাঁর আজানের সুরে সুরে সৈনিক বাহিনী একসঙ্গে আজান দিতে শুরু করেন। ‘আল্লাহু আকবর’, ‘আল্লাহু আকব’, জয়ধ্বণির অপূর্ব সূর লহরী সিলেট বিজেতা আউলিয়াদের অন্তর্জগতে উম্মাদতা এবং বহির্জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করিল। আজানে ঘাত প্রতিঘাতে ভূকম্পন অনুভূত হইল। সেই ভূকম্পনে মনারায়ের টিলায় অবস্থিত অত্যুচ্চ গগনস্পর্শী সপ্ততল বিশিষ্ট শ্রীহট্টকেশ্বর দেব মন্দির ভূমিস্যাৎ হয়।

আরও পড়ুন  বয়কট বর্জনে বনফুলে বন্ধ্যা

৬শাহজালাল (র.) মাজার গেইট
নগরীর প্রধান সড়ক থেকে কয়েকশ গজ ভেতরে হযরত শাহজালালের (র.) মাজার। দরগাহের প্রবেশ পথেই আধুনিককালে নির্মিত পবিত্র কলেমা খচিত একটা গেইট রয়েছে। ১৯৮৯ সালের ২৮শে এপ্রিল গেইটের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে একই বছর আগস্টে শেষ হয়। এই গেইটটি নির্মাণ করতে পাঁচ লাখেরও বেশি টাকা ব্যয় হয়। কলেমা খচিত গেইটটি পেরিয়ে কিছু দূর যাবার পর আধুনিককালে নির্মিত একটি মনোরম তোরণ। আধুনিককালে নির্মিত হলেও এতে রয়েছে মোগল স্থাপত্য শিল্পের ছাপ। গেইটের ঠিক পশ্চিমে মোগল ফৌজদার ফরহাদ মসজিদ বানিয়েছিলেন, এই মসজিদের নির্মাণ শৈলীর সাথে তোরণটির একটি সামঞ্জস্য রয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের স্থাপত্য অধিদপ্তর এই তোরণের ডিজাইন করে। ২০০৩ সালের মে মাসে এই তোরণের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ৩রা অক্টোবর ২০০৩ তোরণটির উদ্বোধন করা হয়। বিশাল এই তোরণটির গম্বুজসহ উচ্চতা ২৮ ফুট। ৪৪ ফুট দীর্ঘ ও ১৮ ফুট প্রস্থের ভূমিতে তোরণটি তৈরী হয়েছে। মূল প্রবেশ পথের প্রস্থ ২৪ ফুট। প্রবেশ পথের দুপাশে তোরণের অংশ হিসেবে দোতলা বিশিষ্ট চারটি রুম তৈরি করা হয়েছে। একটি ভিআইপি, একটি মোতাওয়াল্লীর কক্ষ এবং অপরটি দরগাহ শরীফের অফিস কক্ষ। সিলেট জেলা পরিষদ এ তোরণটি নির্মাণ করে। সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের ব্যক্তিগত উৎসাহে তোরণটি নির্মিত হয়।

২হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া ও জালালী কবুতর
মক্কা থেকে হযরত শাহ জালাল হিন্দুস্থানের পথে পাড়ি জমালেন। সঙ্গী হলেন বারো জন আউলিয়া। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হাজী ইউসুফ, হাজী খলিল, হাজী দরিয়া।
হিন্দুস্থানের দিকে অগ্রসর হলেন হযরত শাহজালাল। দীর্ঘ পথ-যাত্রার পর শাহজালাল যখন দিল্লীতে পৌঁছেন তখন হযরত নিজামউদ্দীন আউলিয়ার কাছে তাঁর জনৈক ভক্ত হযরত শাহজালাল সম্পর্কে কুৎসা প্রচার করলেন, দরবেশ নিজাম উদ্দিন জানতেন এই পথে শাহজালাল আসছেন, তাই তিনি কুৎসা রটনাকারীকে তাড়িয়ে দিলেন এবং সুযোগ্য দু’জন শিষ্যের মাধ্যমে হযরত শাহজালালের দরবারে সালাম পাঠালেন। জবাবে শাহজালাল হযরত নিজামউদ্দিনের সমীপে একটি কৌটা পাঠালেন। কৌটা খুলে নিজামউদ্দিন অবাক বিস্ময়ে ভাবলেন, হযরত শাহজালাল দুনিয়ার সকল অমঙ্গলের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখার মধ্যে নিজেকে ও সমাজকে হেফাজত করতে পারবেন। প্রেরিত কৌটাটি প্রজ্জ্বলিত অঙ্গারের মধ্যে তুলা ভরে পাঠিয়েছিলেন শাহজালাল। নিজামউদ্দিন আউলিয়া কৌটা খুলে দেখলেন তুলা যেমনটি ছিল তেমনটি আছে, আগুন তাকে গ্রাস করতে পারেনি। ফলে দুই দরবেশের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। বিদায় কালে প্রীতির নিদর্শন স্বরূপ হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া শাহ জালালকে দুটি কবুতর উপহার দেন। সেই কবুতরের বংশধররাই এখন জালালী কবুতর নামে পরিচিত।
শাহ জালালের স্মৃতিধন্য সুরমা রঙের দৃষ্টিনন্দন কবুতরগুলো স্বভাবে শান্ত এবং মানুষঘেষা। সিলেটের সর্বত্র মনের সুখে ঘুরে বেড়ায়। জনসাধারণ এই কবুতরগুলিকে বড় আদর যতœ করে এবং দরগাহ প্রাঙ্গণে কবুতরগুলিকে খাদ্য প্রদান করে।

আরও পড়ুন  বিশ্বে করোনায় মৃতের সংখ্যা সাড়ে ১৬ হাজার

দরগাহ শরীফের ডেকচি ৩
দরগাহ লঙ্গরখানার পূর্বদিকে অন্য একটি ঘরে বিরাটাকার দুটি ডেকচি রয়েছে। ডেকচির গায়ে লিখিত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, ১১০৬ হিজরী সনে জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা) নিবাসী আবু সাঈদ নামক জনৈক ধনাঢ্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান এগুলো তৈরী করিয়েছিলেন এবং মীর মোরাদ বখশ নামক অপর এক ব্যক্তি এগুলো সিলেটে হযরত শাহজালালের দরগায় প্রেরণ করেছিলেন। এই বিরাটাকায় ভারী ডেকচি দুটি ঢাকা থেকে সিলেট প্রেরণ সম্বন্ধেও সিলেটের জনসাধারণের মধ্যে অনেক অলৌকিক কাহিনী শোনা যায়।

শায়েখ জালালের ঝরনা
সিলেট আগমনের পর হযরত শাহজালাল (র.) যে জায়গায় আস্তানা স্থাপন করেছিলেন সেখানে পানির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অথচ ওজু গোসলের নিমিত্তি সব সময় পানির দরকার। তাই হযরত শাহজালাল নিজ ভক্তবৃন্দের সহায়তায় সেখানে একটি কূপ খনন করেছিলেন। দরগার টিলার পশ্চিমে সামান্য দূরে যে কূপটি বর্তমানে দর্শকবৃন্দের নজরে পড়ে এটাই সেই বিখ্যাত কূপ। জনসাধারণ এই কূপটিকে মক্কা মোয়াজ্জমার জমজম কূপের সমান শ্রদ্ধা করে থাকে।৫

গজার মাছ
হযরত শাহজালালের (র.) মাজার চত্বরের উত্তর দিকে পাথর বাঁধানো একটি পুকুরে বিশাল আকৃতির অসংখ্য গজার মাছ রয়েছে। এসব মাছকে পবিত্র জ্ঞান করে দর্শনাথীরা ছোট ছোট মাছ খেতে দেয়। পুকুরের পাশেই ছোট ছোট মাছ বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে। পুকুরে অজুরও ব্যবস্থা রয়েছে। পুকুরের দক্ষিণ দিকে যে দোতলা বিল্ডিং রয়েছে এটি দরগাহে হযরত শাহজালালের মাজার শরীফে আসা মুসাফিরদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে সব সময় এটি খোলা থাকে না। উরূসের সময় এটি খোলা দেখা যায়।

হযরত শাহজালালের জীবন ইতিহাস বনাম প্রচলিত কিংবদন্তী
হযরত শাহজালালের সিলেট আগমন এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। শাহজালালের সিলেট আগমণ এবং সিলেটে বসতি স্থাপন নিছক কোন প্রমাদ ভ্রমণ নয়। তাঁর আগমণের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্নতর। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে এই মহাপুরুষের জীবন ইতিহাসের উপকরণ এখন উপাখ্যান হয়ে যাচ্ছে। পনেরশ’ শতকে বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের ফলে অনেক সঠিক তথ্য হারিয়ে গেছে ইতিহাসের পাতা থেকে। সহজভাবে বললে, শাহ জালাল সম্বন্ধে ১৩০৩ থেকে ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় চারশত বৎসরের মধ্যে কোন ঐতিহাসিক কর্তৃক গ্রন্থ প্রকাশিত না হওয়ায় প্রতœবস্তু বিভিন্ন স্থানের নামকরণ ও লোকমুখে প্রচলিত লোকগাঁথা সংগ্রহ পূর্বক গ্রন্থ রচনা শুরু হয়। সেই স্থান দখল করে নিয়েছে কিৎবদন্তী-নির্ভর তথ্য এবং মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া কল্পকাহিনী। পরবর্তীতে এই কল্পকাহিনী বিভিন্ন স্থানের নামকরণ ও লোকমুখে প্রচলিত লোকগাঁথা সংগ্রহপূর্বক গ্রন্থ রচনা শুরু হয়।
[সূত্র: কবি আহমদ মারুফের ‘হযরত শাহ্ জালাল ও ৩৬০ আউলিয়া গ্রন্থ থেকে সংকলিত]

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ