সিলেট | |
প্রকাশিত: 1:54 PM, May 11, 2017
রেজাউল হক ডালিম: ‘শব’ ফারসি শব্দ। অর্থ- রাত। ‘বারাত’ শব্দটি আরবি এবং ফারসি দু’ভাষাতেই ব্যবহৃত হয়। ‘শবে বারাত’র শাব্দিক অর্থ ‘ভাগ্যের রজনী’।শবে বারাত পালন নিয়ে বিগত কয়েক বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে খুব বেশি। এক পক্ষ পালনের পক্ষে, আরেক পক্ষ বিপক্ষে। হক্কানির মতে- দুপক্ষই বাড়াবাড়ি করছেন।
তাদের মতে মূল কথা হচ্ছে- শবে বরাত নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোনো বিভেদ-বিবাদ থাকতে পারে না। যারা বিভেদ-বিবাদ সৃষ্টি করতে চায় তাদের প্রকৃতপক্ষে কোনো সহিহ নিয়ত নেই। আছে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে মানুষকে দ্বীন থেকে সরিয়ে রাখার কু-উদ্দেশ্য। তবে হক্কানি আলেমদের দ্বিমত আছে এই দিনকে কেন্দ্র করে আমলের নামে একটি দলের বাড়াবাড়ি নিয়ে। যে সকল বিদায়াত আমাদের সমাজে প্রচলিত হয়েছে সে সকল বিদায়াত নিয়ে।
যারা শবে বরাতকে সরাসরি অস্বীকার করেন বা শবে বরাতের অস্তিত্বই অস্বীকার করেন তাদের ইসলামের দোস্ত ভাববার অবকাশ নেই। হক্কানি আলেমদের মতে- শবে বরাত সরাসরি কুরআন দিয়ে সেভাবে প্রমাণিত না হলেও অনেক হাদীস দ্বারা তার অস্তিত্বের প্রমাণ মিলে, এর ফযিলতের বয়ানও মিলে। এর মাঝে সহীহ হাদীসের সাথে রয়েছে বেশ কিছু জয়িফ বা দুর্বল হাদীস। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, জয়িফ হাদীসসমূহ একাধিক সনদে বর্ণিত হলে তা ‘হাসান হাদীস’ রূপে পরিগণিত হয়। কাজেই যেহেতু এখানে শবে বরাতের ফযিলতের বিষয় তাই হাসান হাদীস থেকে তা মানুষ বিদায়াতহীন আমল করতেই পারেন।
তবে আমাদের সমাজে যারা শবে বরাত নিয়ে উৎসাহ একটু বেশি প্রকাশ করেন তারা কখনো কখনো সীমা ছাড়িয়ে যান। আর সমস্যাটা মূলত শুরু সেখানেই। বেশিরভাগ সময়ই সেই অতি উৎসাহ বিদায়াতের দিকে ধাবিত হয়। আর এটা যারা করেন তারা মূলত কুরআন সুন্নাহের দিকে না তাকিয়ে সমাজে চলে আসা রীতি বা গতির দিকে তাকিয়ে করে থাকেন। আমরা দেখি শবে বরাতের মর্যাদা বা মহিমা নিয়ে যারা কথা বলেন তারা শবে বরাতের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে এতোবেশি কথা বলেন যে বেশিরভাগ সময় তা মর্যাদার দিক দিয়ে লাইলাতুল ক্বদরকে ছাড়িয়ে যায়। অথচ লাইলাতুল ক্বদরের মর্যাদা, এ রাতে আমলের গুরুত্ব এতো বেশি যে লাইলাতুল ক্বদরের ধারে কাছেও আর কোনো রাত আসতে পারবে না। লাইলাতুল ক্বদর এতো গুরুত্বপূর্ণ যে এই রাত নিয়ে হাদীস তো আছেই সরাসরি কুরআনের একটি সূরাই নাযিল হয়েছে ক্বদর নামে। কিন্তু আমাদের সমাজে দেখা যায় লাইলাতুল ক্বদর ঠিক সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হয় না যতোটা না লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বা শবে বরাত পালন করা হয়। কাজেই আমাদের এটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। এখানে শবে বরাত নিয়ে কোনো সমস্যা নেই বরং সমস্যা হলো শবে বরাত পালন নিয়ে। আরো স্পষ্ট করে বললে শবে বরাতে পালন করা এমন কিছু কাজ নিয়ে যা উৎসাহের দিক দিয়ে বিদায়াতের কাছে চলে যায়।
শবে বরাতের ফযিলত অনেকগুলি হাদীস দ্বারা প্রমানিত। সুতরাং তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু শবে বরাত নিয়ে যে বিদয়াত প্রচলিত তাতো অস্বীকার করতেই হবে। যেমন কিছু লোক দেখা যায় এশার সালাত আদায় করে না, আবার ফজরের সালাতও আদায় করে না। তবে রাত জেগে নফল ইবাদত করে, মাজারে যায়। আবার কিছু মহিলা পাওয়া যায় রুটি ও হালুয়া তৈরি করতে করতে সালাত আদায় করতে ভুলে যায়, কিন্তু তারা আবার রাত জেগে শুধু নফল সালাত আদায় করে। এটা তো দু:খজনক।
শবে বরাত কি: শবে বরাত বা লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বা মধ্য শাবানের রজনী হচ্ছে আরবী শা’বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে শব-ই-বরাত নামে পালিত একটি পূণ্যময় রাত। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের মুসলমানগণ বিভিন্ন কারণে এটি পালন করেন। এই রাতকে লাইলাতুল বরাত বলাও হয়। মধ্য শাবানের এ রজনী নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। এ রাতের ফজিলতের মহাগুরুত্ব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আছে। কুরআন-সুন্নাহর সঠিক জ্ঞানই এই পথ থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে। আর এতে মুসলিম উম্মাহর বিভাজনের রেখা অনেকাংশেই মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায়, রাসুল (সাঃ) প্রতি চন্দ্র মাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখতেন। উল্লেখ্য যে, সঠিক কোনো প্রমাণ না থাকলেও ইবাদতের শুরুতে মুসলিম সমাজে বিদয়াত চালু হয়েছে ব্যক্তি বিশেষের দোহাই দিয়ে। উদাহরণস্বরূপ কাউকে যদি বলা হয়, কেন তুমি এভাবে জিকর বা ইবাদত করছ? সে সঙ্গে সঙ্গে বলবে, অমুক অলি, অমুক পীরসাহেব, অমুক আলিম করেছেন তাই করি। সে এ কথা বলে না যে, আল্লাহ বলেছেন তাই করি, রাসুল (সা.) বলেছেন, করেছেন বা সম্মতি দিয়েছেন তাই করি বা অমুক সাহাবী করেছেন তাই করি। এটা কাম্য নয়।
শবে বরাতের অস্তিত্ব প্রমাণে বিভিন্ন সহীহ হাদীস বিদ্যমান। কতিপয় জয়িফ হাদীসও রয়েছে। একাধিক সনদে জয়িফ হাদীসসমূহ বর্ণিত হওয়ায় তা হাসান হাদীস রূপে পরিগণিত। মনে রাখতে হবে বির্তকিত ও দুর্বল (জয়িফ) হাদীসের সংখ্যা বেশি হলেও কিছু সংখ্যক সহীহ হাদীসও রয়েছে বিধায় এ রাতের অস্তিত্ব অস্বীকার করার কোনো সুয়োগ নেই।
হাদীসে এসেছে, হযরত আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, একরাতে আমি রাসূল সা. এর সাথে ছিলাম। এক সময় উনাকে বিছানায় না পেয়ে আমি মনে করলাম যে, তিনি হয়ত অন্য কোন স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন। অতঃপর আমি খোঁজ করে তাকে জান্নাতুল বাক্বীতে পেলাম। সেখানে তিনি প্রার্থণা করছেন। এ অবস্থা দেখে ফিরে এলে তিনিও ফিরে এলেন এবং বললেন, আপনি কি মনে করেন আল্লাহর রাসূল সা. আপনার সাথে আমানতের খিয়ানত করেছেন? আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ সা. আমি ধারনা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোন আহলিয়ার হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর রাসূল সা. বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রিতে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর তিনি বণী কালবের মেষের গায়ে যত পশম রয়েছে তার চেয়ে বেশি সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে থাকেন। (সুনানে তিরমিযি (২/১২১,১২২), (মুসনাদে আহমাদ ৬/২৩৮) ইবনে মাযাহ, রযীন, মিশকাত শরীফ,ফাওজুল ক্বাদীর, ২য় খন্ড, পৃ,৩১৭)।
আরেকটি হাদীসে এসেছে, আবু বাকর রা. বর্ণনা করেন আল্লাহ তা’আলা মধ্য শাবানের রাতে (দুনিয়ার আসমানে) আসেন এবং সকলকে মাফ করে দেন কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া যার হৃদয়ে ঘৃণা বিদ্বেষ রয়েছে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক করে (অর্থাৎ মুশরিক)। (আল-আলবানী বলেন, “হাদিসটি অন্য সূত্রে সহীহ।” তাখরীজ মিশকাত আল মাসাবীহ, (ক্রম, ১২৫১) (ইবন হাজর আল-আসক্বালানী তাঁর আল-আমাল আল-মুথলাক্বাহ গ্রন্থ (ক্রম, ১২২)।
শবে বরাতের আমল: এ রাতের আমল নিয়ে মনীষিরা মনে করেন, এ রাতের আমল সমূহ ব্যাক্তিগত, সম্মিলিত নয়। ফরজ নামায তো অবশ্যই মসজিদে আদায় করতে হবে। এরপর যা কিছু নফল পড়ার তা নিজ নিজ ঘরে একাকী পড়াই উত্তম। এসব নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার কোন প্রমাণ হাদীসে নেই আর সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এর কোন প্রচলন ছিল না। (ইকতিযাউস্ সিরাতিল মুস্তাকীমঃ ২/৬৩১-৬৪১; মারাকিল ফালাহ ২১৯)।

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আব্দুল হক
ঢাকা অফিস : ২৩৪/৪ উত্তর গোড়ান, খিলগাঁও, ঢাকা ।
সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ, ১৪৯ আরামবাগ, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-৫৯৩৬৫৩, ০১৭১২-০৩৩৭১৫
E-mail: provatbela@gmail.com,
কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম
আমাদের সর্ম্পকে গোপনীয়তা যোগাযোগ
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি