সিলেট | |
প্রকাশিত: 11:21 PM, September 11, 2017
কবীর আহমদ সোহেল , উখিয়া থেকে ফিরে: পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের জনপদ কক্সবাজার। এ জেলারই একটি উপজেলা উখিয়া। দারিদ্রতার কষাঘাতে নিস্পিষ্ট এখানকার জনগোষ্ঠি। খরা দুর্ভিক্ষ জলোচ্ছাসের সাথেই বসবাস সাগরপাড়ের এই জনপদের মানুষের। দেশের মানুষই যে এলাকাকে খুন একটা ভাল কওে চেনেনা। সেই এলাকার নাম এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। দেশ বিদেশের বিভিন্ন মিডিয়া কর্মীদের পদচারণা এখন উখিয়ার আনাচে কানাচে। না কোন খ্যাতির জৌলসে কিংবা অর্জন অবদানের জন্য এ প্রচারণা নয়। মানবতার বিভৎস চিত্র দেখা যায় এই উখিয়ায়। নির্মমতা কতটুকু নিষ্ঠুর হতে পারে তা শোনা যায় এখানে। মানবেতর জীবনের তলদেশ কত গভীর তা দেখা যায় এখানে। ক্ষুধার জ¦ালা কত কঠিন অনুভব করা যায় এখানে। সভ্যযুগে গাছের পাতা দিয়ে লজ্জা নিবারনের প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠারত নারীকে দেখা যায় উখিয়ায়। চোখের সামনে সন্তানহারা বাকরুদ্ধ মা’দের সমাহার এখানে। স্বামীহারা স্ত্রী’র চোখের নোনাজল কত শক্ত তা দেখা যায়। পুত্রহারা পিতার আহাজারি, গৃহহারা, সহায় সম্পদ হারা, বাস্তুহারা বনিআদমের অস্ফুট আর্তচিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠা বিষাদময় দৃশ্যের জনপদ এখন উখিয়া।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বর্বরতার হাত থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জণগোষ্ঠির আশ্রয়স্থল এখন উখিয়ার কুতপালং এলাকায়। রোহিঙ্গা শরণার্থিদের অবস্থা দেখতে আমরা সরেজমিন পরিদর্শন করি উখিয়া উপজেলার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা। যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থি। গত শুক্রবার দিনভর রোহিঙ্গা শরনার্থিদের আশ্রয়স্থল ঘুরে দেখি। জানবার চেষ্ঠা করি ভাগ্যাহত বনি আদমদের যাপিত জীবনের কথা।
দৈনিক প্রভাতবেলা সম্পাদকের ( কবীর আহমদ সোহেল) নেতৃত্বে চার সদস্যের ( নিজাম উদ্দিন আহমদ, শিমুল আহমদ ও অর্পন দাস) একটি দল রোহিঙ্গা শরনার্থিদের আশ্রয়স্থল পরিদর্শন করেন। আশ্রিত এসব জনগোষ্ঠির সাথে কথা জানা যায় মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর লোমহর্ষক বর্বরতা। স্বচক্ষে বনিআদমের মানবেতর জীবনের যে করুণ দশা অবলোকন হয় তা ভাষার কোন উপমায় উপস্থাপন করা দু:সাধ্য।
উখিয়া উপজেলা সদর থেকে টেকনাফমূখী সড়কে কিছুদুর এগুলেই সারি সারি মানুষ। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু। সড়কের দু’পাশে উচু নীচু ঢালু ভূমিতে অবস্থান নিয়েছে। ওরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা। ওরা মুসলিম। মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্যে কোন মুসলমানের অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায়না। যুগ যুগ ধরে চলে আসা মিয়ানমার সরকারের এই অনাচার এখন বর্বরতায় রুপ নিয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম তারা জালিয়ে দিচ্ছে। ভাইর সামনে বোনকে, স্বামীর সম্মুখে স্ত্রীকে , মা বাবার উপস্থিতিতে নিজ কন্যাকে ধর্ষণ করছে মিয়ানমারের সামরিক সদস্যরা। পঞ্চাশোর্ধ আছদ মাহমদ প্রভাতবেলাকে বলেন, এক বিকেলে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ক’জন সদস্য তাদের গ্রামে আসে। সন্ধ্যায় চলে যায়। তারা শঙ্কিত হয়ে উঠেন। মাঝরাতে আগুনের লেলিহান শিখা দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এখন আশ্রয় বাংলাদেশের কুতপালংয়ের এক থাবুতে। সাথে তার পুত্র, সন্তান সম্ভবা পুত্রবধূ। কুতপালংয়ে এসেছেন তিনদিন আাগে। এখনো কোন খাবার জুঠেনি।
নারিমা হাড্ডিসার এক মহিলা। মুখাবয়বের কুঠরে ঢুকে গেছে তার দু’চোখ। গালের হাড় বেরিয়ে আসার উপক্রম। বাহু বের করে দেখালেন। বেয়নেটের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত এই অবলা। পরিবারের সবাইকে (স্বামী ও এক সন্তান)মেরে ফেলেছে মিয়ানমারের বর্বর সেনারা। ৯ দিনে পৌছেছেন কুতপালংয়ে। নাড়ে পড়েনি কোন দানা পানি। বছর দুয়েকে এক শিশু কোলে। অনবরত কাঁদছে শিশুটি। এক প্লেটে ক’টি মোটা চালের ভাত কে দিয়ে গেছে বলতে পারেন না। ভাতের উপর মরিচ মাখানো ক’টুকার আলু। পশুখাদ্য তুল্য এই খাবার শিশুর প্লেটে।
উখিয়ার কুতপালং থেকে যতদুর চোখ যায় কেবল মানুষ আর মানুষ। ওরা সবাই রোহিঙ্গা শরণার্থি। এখনো আসছে। যারা এসেছে তারা যে যেখানে পারে আশ্রয় নেবার চেষ্ঠা করছে। কেই তাবু টানিয়ে। কেউ বাশ বেতের ঘর তুলে। কেউবা পরিবার পরিজন নিয়ে আস্টেপৃষ্টে এক জায়গায় গুজে আছে। যে যেখানে পাওে সেখানেই শুয়ে, বসে , দাঁড়িয়ে অবস্থানের চেষ্ঠা করছে। চোখের চাহনীতে খাবারের প্রতিক্ষা। বিচ্ছিন্নভাবে মাঝে মধ্যে ত্রানবাহি কো পরিবহন এলেই হুমড়ী খেয়ে পড়ছে। কার আগে কে নেবে? ত্রাণদাতা তখন সামাল দিতে না পেরে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।
ভাগ্যবিড়ম্বিত এই বনিআদম যে যেখানে অবস্থান করছে তার পাশেই প্রাকৃতিক কাজ সেরে নিচ্ছে। দুর্গন্ধময় এক ভূতুড়ে পরিবেশ। কোথাও কোন শৃংখলা নেই। সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি সন্তান সম্ভবা মা’দের। প্রসব বেদনা সাথে ক্ষুধার জ¦ালায় যেন মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর এইসব হতভাগিনি। (চলবে)

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আব্দুল হক
ঢাকা অফিস : ২৩৪/৪ উত্তর গোড়ান, খিলগাঁও, ঢাকা ।
সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ, ১৪৯ আরামবাগ, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-৫৯৩৬৫৩, ০১৭১২-০৩৩৭১৫
E-mail: provatbela@gmail.com,
কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম
আমাদের সর্ম্পকে গোপনীয়তা যোগাযোগ
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি