২০০ বছর পর এথেন্সে প্রথম মসজিদ উদ্বোধন

প্রকাশিত: 7:32 PM, November 13, 2020

২০০ বছর পর এথেন্সে প্রথম মসজিদ উদ্বোধন

বিশ্বভূবন ডেস্ক:

দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রায় ২০০ বছর পর গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম মসজিদের উদ্বোধন করা হচ্ছে।

আজ শুক্রবার জুমার নামাজের মধ্য দিয়ে এ মসজিদের কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড।

তবে করোনার দ্বিতীয় দফা সংক্রমণের ফলে ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো গ্রিসেও নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব ও কঠোর স্বাস্থ্যবিধির মধ্য দিয়ে আপাতত স্বল্পসংখ্যক মুসল্লির উপস্থিতিতে এ মসজিদের কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে টিআরটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এথেন্স বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো শহরগুলোর একটি। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের পর থেকে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে ওঠে গ্রিস।

আজকের দিনে এথেন্সের বিভিন্ন শহরতলীতে পা রাখলে চোখে পড়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সোমালিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান, লেবানন, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ। তাদের একটি বড় অংশ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী।

গ্রিসে স্থানীয় মুসলমানদের বেশিরভাগ আলবেনীয় ও তুর্কি বংশোদ্ভূত। তাদের অনেকে গ্রিসের মূলধারার সঙ্গে নানাভাবে মিশে গিয়েছেন। অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের মতো তাদেরকে বিশেষভাবে আলাদা করার উপায় নেই।

এছাড়াও, বেশ কিছুসংখ্যক গ্রিকভাষী রয়েছেন যারা জন্মগতভাবে মুসলমান।

এথেন্সে সাধারণত ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বা কোনো বাড়ির একটি অংশ, বিশেষ করে গ্যারেজকে মুসলমনারা নামাজের জন্যে ব্যবহার করতেন।

দেশটিতে প্রায় ১০ বছর ধরে বসবাস করা প্রবাসী বাংলাদেশি ড. মুহাম্মদ আল আমিন বলেন, ‘সরকারিভাবে এখানে এতোদিন কোনো মসজিদ ছিল না। এথেন্সে উদ্বোধন হতে যাওয়া এ মসজিদটি এখানকার মুসলমানদের মধ্যে বাড়তি আনন্দের সৃষ্টি করেছে।’

আরও পড়ুন  করোনা জয়ী ১১৩ বছরের স্প্যানিশ বৃদ্ধা

অর্থোডক্স খ্রিস্টানিটির পর দেশটির সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। তারা দেশটির মোট জনসংখ্যার দেড় শতাংশের মতো।

 

গ্রিসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তুরস্কের সীমান্তবর্তী থ্রেস দেশটির একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল। ইউরোপের মধ্যে থ্রেসই একমাত্র অঞ্চল যেখানে শরীয়া আইন রয়েছে।

 

১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত লুজান চুক্তির পর গ্রিসে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশকেই তুরস্কে চলে যেতে হয়। একইভাবে, সেসময় তুরস্কে বসবাসরত খ্রিস্টানদের গ্রিসে স্থানান্তর করা হয়।

মূলত তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের হাত ধরে গ্রিসে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটে। ১৮২১ সালে এথেন্সসহ বর্তমান গ্রিসের বেশ কয়েকটি অঞ্চল অটোমান শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করার জন্য স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাক দেয়।

১৮২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম হেলেনিক প্রজাতন্ত্র গ্রিস যার রাজধানী হিসেবে বেছে নেওয়া হয় এথেন্সকে। ১৮৩৩ সাল থেকে তৎকালীন হেলেনিক প্রজাতন্ত্রের সরকারের অর্থায়নে এথেন্সে একটি মসজিদ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন সেখানকার মুসলমানরা।

১৮৯০ সালে সরকারিভাবে এথেন্সে মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন সময়ে দেশটির অতি ডানপন্থি ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র বিরোধিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অর্থোডক্স গির্জাগুলোর বাধা ও আর্থিক সঙ্কটের কারণে সেখানে মসজিদ নির্মাণের বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি।

গ্রিসের সঙ্গে তুরস্কের রাজনৈতিক বৈরিতা দীর্ঘদিনের। এ কারণে গ্রিসের অনেক সাধারণ মানুষও এতোদিন পর্যন্ত এথেন্সে মসজিদ নির্মাণের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। তাদের অনেকের মতে, গ্রিসে নতুন করে কোনো মসজিদ নির্মাণ করার মানে দাঁড়াবে পুনরায় দেশটিতে অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসের পুর্নজাগরণ ঘটানো।

আরও পড়ুন  লো স্কোরিং ম্যাচে জালালাবাদকে হারিয়ে দিয়েছে ইলেভেন ব্রাদার্স!

তুরস্কের এরদোয়ান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তথা প্রায় ২০ বছর থেকে এথেন্সে মসজিদ নির্মাণের জন্যে গ্রিসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। এথেন্সে মসজিদ তৈরির অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে ইস্তান্বুলে একটি ঐতিহাসিক গ্রিক অর্থোডক্স গির্জা খুলে দেওয়ার বিষয়টিও বিভিন্ন সময় তুরস্কের সরকার কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন।

 

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে এথেন্সই একমাত্র রাজধানী শহর যেখানে এতোদিন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো মসজিদ ছিল না।

 

গ্রিক সরকারের অর্থায়নে নির্মিত এ মসজিদটি তৈরি করতে আনুমানিক ৮ লাখ ৮৭ হাজার ইউরোর খরচ হয়েছে। ২০১৬ সালে চূড়ান্তভাবে এ মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০১৭ সালে তা শেষ হয়।

গ্রিসের শিক্ষা ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কোস্তাস গাভ্রোগলু গত সপ্তাহে এক রেডিও সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এ মসজিদে এক সঙ্গে ৩৫০ জন নামাজ আদায় করতে পারবেন।

প্রাথমিকভাবে এ মসজিদের নাম রাখা হয়েছে ভোতানিকোস মসজিদ। এথেন্সের হার্ট হিসেবে খ্যাত সিনতাগমা স্কয়ার থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে নৌবাহিনীর একটি পরিত্যক্ত ঘাঁটিতে এ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে অবকাঠামোগতভাবে অন্যান্য মসজিদগুলো থেকে কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় বিশেষত কোনো মিনার বা গম্বুজ না থাকায় অসন্তোষ জানিয়েছেন দেশটিতে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনেকে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ