“উস্তাদকে সম্মান করতে হবে, কদর করতে হবে”- শাহবাগী হুজুর

প্রকাশিত: 5:09 PM, January 14, 2017

“উস্তাদকে সম্মান করতে হবে, কদর করতে হবে”- শাহবাগী হুজুর

  (শাহবাগী হুজুরকে নিয়ে না বলা কথা-১০)

মাওলানা মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, কাতার : শিক্ষক শিক্ষকই। তিনি ছোট ক্লাশের না বড় ক্লাশের, এটা কোন প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কি না। যদি এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হোন, তাহলে তাকে কদর করতে হবে, সম্মাণ করতে হবে, মর্যাদা দিতে হবে। স্কুলে বিষয়টি আছে কি না-তা আমার জানা নেই। তবে মাদ্রাসায় এটা আমাদের সময় ছিল। যেমনঃ একজন কেরানীর চাকুরী করেন। কিন্তু তিনি আবার ক্লাশও নেন। বিধায় তার পরিচয় কিরানী স্যার হয়ে যায়। সুজাউল মাদ্রাসায় এই ব্যবস্থাটা প্রচলিত ছিল। কিন্তু সেই কিরানী স্যারের সাথেও ছাত্রদের মুয়ামালাত হতে হবে একদম পারফেক্ট।

স্যার, সে তোমার স্যার হোক আর না হোক, সে এই মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত কোন না কোন ছাত্রের স্যার। তাই যে উপযুক্ত সম্মান পেতে হেব। সুজাউল মাদ্রাসার কিরানী ছিলেন মিজান সাহেব। মিজান সাহেব আর আমি বড়লেখা কলেজে এক সময় এক সাথে ক্লাশ করেছি। ক্লাশ করেছি এজন্য বললাম যে, আমি বড়লেখা কলেজে পড়ার জন্য ভর্তি হইনি। বড়লেখা কলেজের সুচনায়, তথা দ্বিতীয় ব্যাচে আমি সহ আমার কয়েকজন সাথী বড়লেখা কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম সত্য ও সুন্দরের পক্ষে শ্লোগান দেয়ার জন্য। অসত্য ও অকল্যাণ আর অন্ধকারের মিছিল থেকে আগামীর কর্ণধারদের আলোর মিছিলে শামীল করার জন্য। সে তো ১৯৮৭ সালের ঘটনা। এরপর চলে গেছে অনেক দিন। ১৯৯১-৯২ সালে যখন আমি কামিল পড়ার জন্য সুজাউল মাদ্রাসায় ফিরলাম, তখন সেই মিজান সাহেব কিরানীর চাকুরী করতেন। ছাত্রজীবনে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্র দলের মিছিলে থাকতেন। আমি তখন সুজাউল মাদ্রাসায় কামিল শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছি। এখনো ছাত্র সংসদের জিএস হইনি। মাদ্রাসার ১০ম শ্রেণীর নির্বাচনী পরীক্ষা চলাকালীন সেই মিজান সাহেব পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। নাসির নামে একটা ছেলে ছিল, বাড়ী ছিল বুবারথলে। সে ইসলামী ছাত্র মজলিস করতো। ব্যক্তিগত জীবনে সে ছিল খুবই ডানপিটে। শিক্ষকদের সাথে যেমন আদব রক্ষা করে চলতো না, তেমনই সিনিয়র ছাত্রদেরও। আমি তাকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতাম না। কিন্তু সকল ছাত্রের আমার প্রতি আকর্ষণ, ভালবাসার কাছে তার এড়িয়ে চলা নীতি আমার কাছে ধরা পড়ে। উল্লেখ্য যে, আমি তখন ইসলামী ছাত্রশিবিরের বড়লেখা উত্তর সাংগঠনিক থানা সভাপতি হওয়ার সুবাদে সকলের প্রতি আমার একটা সম্পর্ক ছিল। সেই নাসির পরীক্ষার হলে মিজান সাহেবকে একটা কিছু বলে ফেলে এবং যা প্রিন্সিপাল শাহবাগী হুজুর পর্যন্ত গড়ায়। প্রিন্সিপাল স্টাফ মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেন তাকে মাদ্রাসা থেকে বহিস্কার করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে নাসিরের হুশ আসে। সে তার দায়িত্বশীল তদানিন্তন সময়ে ইসলামী ছাত্র মজলিসের মৌলভী বাজার জেলা সভাপতি এবং সুজাউল মাদ্রাসায় আমার ক্লাশমেট জনাব আব্দুল খালিক ভাইয়ের স্মরণাপন্ন হয়। আব্দুল খালিক ভাই এখন বড়লেখা জামেয়া ইসলামীয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক। আব্দুল খালিক ভাই তাকে নিয়ে শাহবাগী হুজুরের কাছে গেলে তিনি নাসির ও আব্দুল খালিক ভাইকে বকাঝকা দিয়ে তাড়িয়ে দেন। কোন পাত্তা দেননি। এদিকে নাসিরের ফরম পুরণের সময় হয়ে গেছে। বিধায় নাসির চোঁখে শর্শে ফুল দেখছে। এমতাবস্তায় আব্দুল খালিক ভাই ছাত্র সংসদের সহযোগিতা নেয়ার পরামর্শ দিলেন। বিষয়টা এক সময় আমার কান পর্যন্ত আসলো। কিন্ত আমি নামের সাথে মানুষ মিলাতে গিয়ে আবিস্কার করলাম সেই ছেলেকে, যে অসাধারণ এবং যে আমাকে পাত্তা দেয়না। আমি তাকে নিয়ে একটা নীল নকশা আঁকলাম। আব্দুল খালিক ভাইয়ের পরামর্শে নাসির ছাত্র সংসদের স্মরণাপন্ন হলে, ছাত্র সংসদের মিটিং ডাকা হলো। যেখানে কামিল শ্রেণীর সকল ছাত্রকে দাওয়াত করা হলো। যেখানে আলোচনায় আসলো যে, আব্দুল খালিক ভাই বিষয়টা নিয়ে ডিল করে ফেইল করেছেন। ছাত্র সংসদকে পাশ কাটিয়ে শাহবাগী হুজুরের কাছে যাওয়ায় ছাত্র সংসদ আব্দুল খালিক ভাইকে ভর্ৎসনা করে এবং একই কারণে নাসিরের বিষয়টি ছাত্র সংসদ ডিল না করার সিদ্ধান্ত নেয় এই অপরাধে যে, ১. নাসির সরাসরি ছাত্র সংসদের কাছে না এসে ছাত্র সংসদের সদস্য নন এমন ব্যক্তি আব্দুল খালিক ভাইয়ের কাছে গিয়ে ছাত্র সংসদকে অবমূল্যায়ন করেছেন। ২. কেরানী  মিজানুর রাহমানের সাথে বেয়াদবী করার কারণে শাস্তি হয়া উচিত। মিজান সাহেবকে খুশী করে তার শাস্তি মওকুফ করাতে হবে। কারণ মিজান সাহেব এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। শিক্ষকের কদর করতে হবে। যথাযথ সম্মান পাওয়া মিজান সাহেবের হক। নাসিরকে হতাশার সাগরে ভাসিয়ে মিটিং শেষ হলে ছাত্র সংসদের তদানিন্তন সেক্রেটারী হাফেজ লুৎফুর রহমান আমার নীল নকশার অংশ হিসাবে নাসিরকে বললেন, তোমার এই বিষয় ছাত্র সংসদকে দিয়ে হবেনা। তুমি নজরুল ভাইয়ের পিছনে যাও। কাজ হয়ে যাবে। নাসির এই টেবলেটটা এমন ভাবে হজম করলো যে, এখন আর আমার পিছু ছাড়েনা। আর যে লোকটা আমাকে এতো দিন পাত্তা দিতো না, সেই লোকটাকে এখন আমি এড়িয়ে যাওয়া শুরু করলাম। যেন চোর পুলিশ খেলা। এদিকে বিষয়টা নিয়ে আমি শাহবাগী হুজুরের সাথে আলাপ করলাম এবং ফরম পুরণের শেষ সময় সম্পর্কেও আইডিয়া নিলাম। শাহবাগী হুজুরের একই কথাঃ মাদ্রাসার ছাত্র, তারা উস্তাদকে সম্মান করবে। তারা উস্তাদকে সম্মান না করলে কে করবে। অতএব টিচারদের ম্যানেজ করে তুমি কিছু করতে পারলে করো, আমার আপত্তি নাই। শাহবাগী হুজুর থেকে গ্রিন সিগনাল নিয়ে আমি এক সময় চোর পুলিশ খেলার ইতি ঘটিয়ে নাসিরের সাথে বসলাম। সে এক কথায় আমার সহযোগিতা চাইলো। আমি সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত জানালাম। তার সাথে আমার যোগাযোগ বেড়ে গেলো। এক সময় সে আমার একজন ভাল মুরিদ হয়ে গেলো। এ ভাবে প্রায় দুই সপ্তাহ গড়িয়ে গেলো। আমি তাকে বুঝাতে সক্ষম হলাম যে, উদ্ধত্তপূর্ণ আচরণ কোথাও সুখকর নয়। তা মাদ্রাসায় হোক, সংগঠনে হোক, সামাজিকতায় হোক আর পরিবারে হোক। সে এক সময় তার ভূল স্বীকার করলো। ইতিমধ্যে আমি মাদ্রাসার এমন কিছু উস্তাদের সাথে কথা বলেছি, যারা আন্তরিক ভাবে আমাকে পছন্দ করেন। তার মাঝে একজন ময়না স্যার।

আরও পড়ুন  কাজী পাপুল কুয়েতের নাগরিক নন

যার কাছে ১৯৮২ সালে আমি ৮ম শ্রেনীতে পড়েছি। যিনি আমার দ্বিতীয় জনম দিয়েছেন বলে আমার ব্যক্তিগত পরিমন্ডলে পরিচিতি রয়েছে। কারণ ১৯৮৪ সালে যখন দাখিল পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করি, তখন তিনি তার পক্ষ থেকে একটি জন্ম তারিখ লিখে দেন, যা আমার প্রকৃত জন্ম তারিখের সাথে মিলে না। সেই ময়না স্যারের পুরো নাম তৈয়বুর রাহমান।

আমার অনুরোধ ছাত্র সংসদের বৈঠক আবার আহবান করা হলো। সিদ্ধান্ত হলো নাসিরের বিষয়টি মানবিক দিক দিয়ে বিবেচনা করে ছাত্র সংসদ তার পক্ষ হয়ে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করবে। সে অনুযায়ী একটি দরখাস্ত লিখার জন্য আমাকে দায়িত্ব প্রদান করা হলো। আমি রসের বেসাতি মিশিয়ে একটি দরখাস্ত লিখলাম। যা ১০ বার ময়না স্যার শিক্ষক মিলনায়তনে পড়ে শুনিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষকদের। দরখাস্তটা নাকি এতো সুখপাঠ্য ছিল যে, সবাই মিজান সাহেব প্রসংগ ভূলে গিয়ে দরখাস্ত বিবেচনায় সম্মতি প্রদান করেন। এক সময় বিষয়টা সমাধান হলো। সমাধানের সময়ও শাহবাগী হুজুর আবার স্মরণ করে দিলেন শিক্ষকদের সাথে সারা জীবন কি আচরণ করতে হবে। নাসির ফরম পুরণ হলো। বিষয়টা নিষ্পত্তি হলো। সব কিছু যখন শেষ, তখন হঠাৎ একদিন আবিস্কার করলাম নাসিরকে নতুন ভাবে। সে এখন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথীপ্রার্থী। সে এসেছে আমার কাছে-আমাকে তার বাড়ীতে নিয়ে যেতে চায়। আমি পায়ে হেটে বড় বড় পাহাড় মাড়িয়ে একদিন হাজির হলাম বুবারথলে নাসিরের বাড়ীতে। যখনই বুবারথল এলাকার স্মরণ হয়, তখনই স্মরণ হয় নাসিরের কথা। আর সাথে সাথে মনে পড়ে শাহবাগী হুজুরের সবক “উস্তাদকে সম্মান করতে হবে, কদর করতে হবে।”

আরও পড়ুন  অনাদর অবহেলায় বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানীর মৃত্যুবার্ষিকী

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও আলেমে দ্বীন।

সর্বশেষ সংবাদ