এটিএম তুরাব ♦ শাহাদাতের ২ বছর♦বেদনা-ব্যর্থতার উপাখ্যান

প্রকাশিত: 10:05 AM, July 19, 2026

এটিএম তুরাব ♦ শাহাদাতের ২ বছর♦বেদনা-ব্যর্থতার উপাখ্যান

এটিএম তুরাব ♦ শাহাদাতের ২ বছর♦বেদনা-ব্যর্থতার উপাখ্যান

কবীর আহমদ সোহেল♦
জুলাই| চব্বিশের জুলাই| আমাদের জাতীয় জীবনের এক বেদনাবিদূর সময়| প্রায় ১৪০০ বনি আদমের আত্মত্যাগের মর্মন্তুদ ঘটনাবলী আমাদের স্মৃতিকাতর করে তোলে| জীবনের তরে চোখ হারানো, পা হারানো, হাত হারানো প্রায় ত্রিশ হাজার আহত মানুষ ২৪ এর জুলাইয়ের জলন্ত স্মৃতি হয়ে আছেন আমাদের সামনে| বছর পরিক্রমায় জুলাই ফিরে আসলে আমরা স্মৃতি যন্ত্রণায় তাড়িত হই| জুলাই মানে রক্ত ঝরানোর মাস, আত্মত্যাগের মাস| ¯^জনহারানোর বেদনাবিদগ্ধ মাস| জুলাই আমাদের অর্জনের মাসও| বহু রক্ত আর জীবনের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশ| জুলাই আমাদের প্রেরণার মাস| ২৪ এর জুলাইয়ে তরুণ কিশোরদের প্রতিবাদমূখরতা আমাদের প্রেরণা যোগায়, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি| আমরা আশাšি^ত হই যেকোন অন্যায় অবিচার দুঃশাসন রুখে দিতে আমাদের তরুণ প্রজন্ম সক্ষম|

ঘটনাবহুল এই জুলাইয়ের ১৯ আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশী বেদনার, কষ্টের..| আমাদের তরুণ সহকর্মী হারানোর দিন| এটিএম তোরাব ˆদনিক জালালাবাদ-এর স্টাফ রিপোর্টার এবং ˆদনিক নয়াদিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান| ২৪ এর ১৯ জুলাই জুমাবার দিন| জুমা’আ আদায় করেছিল কোর্ট পয়েন্ট সংলগ্ন কালেক্টরেট মসজিদে| এটাই ছিল তার জীবনের শেষ জুমা’আ|

বাদ জুমআ সিলেট মহানগর বিএনপি’র বিক্ষোভ কর্মসূচী| তুরাব আগেভাগেই নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়ে| পেশাগত দায়িত্বপালনে সুবিধাজনক স্থানের খোঁজে কিছুক্ষণ মসজিদের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকে| খানিকপরেই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী জড়ো হতে থাকেন| তুরাব আঁচ করতে পারে কিছুক্ষণের মধ্যেই মিছিল শুরু হবে| তাই কোর্ট পয়েন্টের উত্তর দিকেই এগুতে থাকে| এরই মধ্যে মিছিল শুরু হয়ে যায়| তুরাব দৌড় দিয়ে রাস্তার ডিভাইডারে উঠে যায়| ছবি উঠানো ও ভিডিও করার সুবিধাজনক অবস্থান নেয় তুরাব|

কুদরতউল্লাহ মার্কেটের সম্মুখ থেকে হাসান মার্কেট পর্যন্ত এলাকাজুড়ে পুলিশের সশস্ত্র অবস্থান| মিছিল কয়েক কদম এগুতেই পুলিশ ধাওয়া করে| মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা দিকিবিদিক ছুটতে থাকে| তুরাবও কিছুটা দৌড়ে ডিভাইডার থেকে নেমে রাস্তার পূবদিকে যেতে থাকে| ঠিক এই মূহুর্তে পুলিশ তুরাবকে টার্গেট করে গুলি করতে থাকে| তুরাব ডানে বায়ে হেলে এগুলে পুলিশের বন্দুকের নলও হেলতে থাকে| এক পর্যায়ে পুরান লেন ডাইবেটিস গলির মুখে লুটিয়ে পড়ে তুরাব| বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এসময় তুরাবের সহকর্মী ফটো সাংবাদিকরা চিৎকার করে বলছেন, ‘দস্তগীর ভাই,আমরা সাংবাদিক, সাংবাদিক তুরাব’| মো: সাদেক দস্তগীর কাউসার, তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম উত্তর), সিলেট| তুরাব হত্যা মামলার ২ নং আসামী| বর্তমানে কারান্তরীণ| প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং ভিডিওচিত্রে পরিস্কার বুঝা যায় পুলিশ তুরাবকে টার্গেট করে গুলি করছে| তুরাব যেদিকে দৌড়াচ্ছে বন্দুকের নল সেদিকে ঘুরছে| মিছিলকারীদের উদ্যেশে ছোঁড়া গুলিতে তুরাব গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে এমন বক্তব্যের কোন সত্যতা নেই|
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু সিলেট নয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও পাকবাহিনী কোন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেনি| স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ যেটা ঘটিয়েছে ১৯ জুলাই সিলেটের কোর্ট পয়েন্টে|

রক্তাক্ত তুরাবকে নেয়া হলো ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে| জরুরী বিভাগে তুরাবের প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা ছাড়া কোন সেবা মেলেনি ওসমানীতে| কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্স থাকলেও গুরুতর গুলিবিদ্ধ একজন রোগীর চিকিৎসার ব্যাপরে তারা ছিলেন উদাসীন| এক পর্যায়ে আমরা জানতে পারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা হাসপাতাল কম্পউন্ডে অবস্থান করছেন| কিন্তু আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা তারা দিবেননা| হাসপাতাল সুত্র থেকে এমন তথ্য পেয়ে দ্রুত তুরাবকে সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়| আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তুরাবকে তাৎক্ষণিক আইসিইউতে নেয়া হয়|

চিকিৎসকদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, স্বজন পরিজন সহকর্মীর আহাজারী আর্তনাদ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়| মাগরীবের আজানের কয়েক মিনিট পূর্বে সন্ধ্যা ৬টা ৪০মিনিটে শাহাদাতের অমিয় সূধা পান করেন তরুণ সম্ভাবনাময় সংবাদকর্মী আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব| বিয়ানীবাজারের সুনামধন্য শিক্ষক সাংবাদিক আব্দুর রহিম মাস্টার ও মমতাজ বেগমের নাড়িছেঁড়া ধন তুরাবের দুনিয়ার সফরের অবসান ঘটে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে|

লাশ ছিনিয়ে গুম করার অপচেষ্টা: তুরাবের মৃত্যুতে শোকে বিহবল যখন তার স্বজন সহকর্মী | ঠিক তখনি আরেক বর্বরতার অপকৌশল চালায় শাসকগোস্টীর পেঠোয়াবাহিনী| ইবনে সিনা হাসপাতাল থেকে পোস্ট মর্টেম এর জন্য মরদেহ ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হবে|  তুরাবের পরিবারের সদস্যরা শোকাতুর অবস্থায় হিতাহিত জ্ঞানহারা| উপস্থিত সাংবাদিকরা মরদেহ নিয়ে ওসমানী হাসপাতালে যাবেন এমন প্রস্তুতি চলছে| এক সাংবাদিক নেতা মোবাইল কল করে পুলিশ আনলেন| বিপুল সংখ্যক পুলিশ এসে মরদেহ তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইলো, উপস্থিত সাংবাদিকদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পুলিশ পিছু হঠলো| প্রশ্ন হলো, ঐ সাংবাদিক নেতা কি উদ্যেশে ঐ সময় পুলিশ ডেকে আনলেন? আজো তার উত্তর মেলেনি|
এখানেই শেষ নয়| ওসমানী হাসপাতালে রাতে পোস্ট মর্টেম করার রীতি নীতি এবং সুযোগ থাকলেও কর্তৃপক্ষ নানান অজুহাত দেখিয়ে পরদিন সকাল ১০টায় পোস্ট মর্টেম করার কথা জানায়| এই অবস্থায় অধিকাংশ সহকর্মী রাত ১২ টা ১টায় ঘরে ফিরেন| রাত ২ টার পরে বিভিন্ন সুত্র থেকে খবর আসে মর্গ থেকে রাতেই তুরাবের মরদেহ সরিয়ে নেবে পুলিশ বা অন্যকোন বাহিনী| তৎক্ষণাৎ আমরা কয়েকজন সহকর্মী যোগাযোগ করে ওসমানী হাসপাতালের মর্গে এবং বাইরে নজরদারি করতে সাংবাদিকের বাইরে কিছু লোক নিয়োজিত করি| আমাদের তাৎক্ষণিক এ&ই অবস্থানে পুলিশের এই কৌশল ব্যর্থ হয়|

আরও পড়ুন  খাদ্য আমদানিতে বিশ্বে বাংলাদেশ তৃতীয়

পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে ছলচাতুরী: নানা গড়িমসি শেষে ২০ জুলাই দুপুরে ময়না তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট দেয়া হলো| তাতে ছলচাতুরীর আশ্রয় নেযা হলো| রিপোর্টে গুলিবিদ্ধের ঘটনা ও স্প্রিন্টার উল্লেখ না করে ‘কালো দাগ’ এবং ‘ক্ষতচিহ্ন’ লিখে রিপোর্ট দেয়া হলো| উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রতিবাদ আপত্তির মুখে পরে সংশোধন করে দেয়া হল|
জানাযা অনুষ্ঠানে বাধা: সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য এটিএম তুরাব| তার নামাজে জানাযা প্রেসক্লাব প্রাঙ্গনেই হবে| এটাই স্বাভাবিক| প্রশাসন থেকে আপত্তি| কেবল প্রেসক্লাব প্রাঙ্গন নয় সিলেট নগরীতে কোন জানাযা হতে দেবেনা প্রশাসন | অবশ্য প্রশাসনের এমন ভূমিকার পেছনে তখনকার সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের পুলিশ তোষননীতি ও নতজানু নেতৃত্ব অনেকাংশেই দায়ী| এই পরিস্থিতিতে আমরা তুরাবের ঘনিষ্টজনরা বিএনপি- জামায়াতের নেতৃবৃন্দ ও নগরীর বিশিষ্টজনের সহযোগীতা নিলাম| কৌশলে হযরত মানিকপীর গোরস্তানের পাশেই জানাযার আয়োজন করলাম| আমাদের কাছে খবর এলো, জানাযায় উপস্থিতি কম হলে পুলিশ পন্ড করে দেবে| তাই বিভিন্ন সংগঠন ও শ্রেণী পেশার মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জানাযার সময় দফায় দফায় বিল¤^ করলাম| মহান রবের অশেষ মেহেরবানীতে প্রিয় সহকর্মীর প্রথম জানাযা সফল হলো| খবর এলো বিয়ানীবাজারে জানাযার নামাজের প্রচারে পুলিশ বাধা দিচ্ছে| ‘পুলিশের গুলিতে’ নিহত একথা বলতে আপত্তি পুলিশের| নানা বাধা বিপত্তি মোকাবেলা বাদ আসর বিয়ানীবাজার পিএইচজি হাইস্কুল মাঠে অযুত জনতার উপস্থিতিতে নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয় শহীদ তুরাবকে|
সেই কঠিন সময় : তুরাব শাহাদত বরন করেন ১৯ জুলাই| সেই থেকে ৩৬ জুলাই (৫আগস্ট) পর্যন্ত ছিল একটা কঠিন সময়| তুরাব হত্যার প্রতিবাদ, বিচার চাওয়ার মত সাংবাদিক খুঁজে পাওয়া ছিল খুবই কঠিন| দেশে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলন| ফ্যাসিস্ট শক্তির মরণ কামড়| সিলেটের রাজনৈতিক দলের অধিকাংশ নেতা কারাগারে| ˆদনিক জালালাবাদ সম্পাদক দেশের বাইরে| আমরা গুটিকতেক সাংবাদিক তুরাব হত্যার ঘটনায় কি করা যায় তাই নিয়ে তৎপর| আমরা ডকুমেন্টস সংগ্রহে মনযোগ দেই| আমাদের আশঙ্কা ছিল ডকুমেন্টস ধ্বংস করে ফেলা হবে| কিছুটা করা হয়েছিলও| তুরাবের অনেক সহকর্মীর কাছে পুলিশের গুলি চালানোর ফুটেজ ছিল| ২/১ জন ছাড়া কেউ এইসব ফুটেজ দিতে চাননি| বেশিরভাগই নেটওয়ার্কের সমস্যা পরে দিচ্ছি বলে এড়িয়ে যেতেন| আমার সাথে জালালাবাদের কর্মরত সাংবাদিকবৃন্দ বিশেষ করে হুমায়ুন কবির লিটন ছাড়া আর তেমন কাউকে পাইনি| আমরা তুরাবের ভাই আবু আহসান আজরফ জাবুরকে দিয়ে একটি মামলা দায়েরের উদ্যোগ নেই| এই মামলার ড্রাফট করতে উকিলের বাসায় যেতে লিটনকে সাথে পেতাম| আশকার আমীন রাব্বি অনেক সাহস করে উকিলের বাসায় এসে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিল| আমরা একেবারে সাদামাটা একটা ড্রাফট করে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিলাম| সিলেটের ৭/৮ টি সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় কোতোয়ালী থানায় গেলাম| তুরাব হত্যার আসামী পুলিশ সদস্যদের সামনে আমাদের মান্যবর সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের একজনও তুরাব হত্যার ব্যাপারে একটা কথাও বল্লেন না| বা বলতে পারলেন না| আমিও ভীত সন্ত্রস্ত | কয়েক দফা বিভিন্ন বাহিনী থেকে বলা হয়েছে, সন্তানদের এতিম বানিয়ে ফেলবে| কাচুমুচু করে আমাদের মামলাটা নেয়ার আরজি জানালাম| আইনের ধারা উপধারা উল্লেখ করে এটা মামলা নেয়া যাবেনা মর্মে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়| এক পর্যায়ে জিডি হিসেবে গ্রহণ করে কোতোয়ালী থানা| কোকা কোলা কোমল পানিয় আর লেক্সাস বিস্কুটের পুলিশী আপ্যায়নে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ তৃপ্তির ঢেকুর তুলে তোপখানাস্থ কোতয়ারী থানা চত্বর ত্যাগ করেন|
এই সময়কালে সিলেট কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে ৭ সাংবাদিক সংগঠন মিলে ৯ মিনিটের একটা মানববন্ধন করে| ঐ মানববন্ধন শেষে এক সাংবাদিক নেতাকে ধমক দিয়ে বলেছিলাম সাহস না থাকলে চলে যান আমরা একাই দাঁড়িয়ে থাকবো| ঐ রাতেই বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা আমার সন্ধানে বাসায় সফর করে| ভাগ্যিস আমি ছিলাম বাসার বাইরে|
বদলে যাওয়া সময় পালাবদলের হাওয়া: ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে গেল| একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটলো| সময়ের বদলে-শাসনের বদলে, বদলে যাবার হাওয়ায় ভাসতে থাকলো ফ্যাসিবাদের দোসরশ্রেণী| এই বদলে যাওয়ার হাওয়া থেকে বাদ পড়লোনা পূণ্যভূমি সিলেট| কিছুদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকা ফ্যাসিস্টদের দোসররা এখন কারো আশ্রয়ে, কারো প্রশ্রয়ে অলি-গলিতে উঁকি দিচ্ছে| কেউবা কোন উৎসবে বা সভায় নেতার পাশে বসে ছবি তুলে একটি জালদলিল তৈরীর কসরত চালাচ্ছে| সে যাই হোক, ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে শহীদ তুরাবের হত্যা মামলা হবে, াবচার হবে| আশায় বুক বাঁধলাম তুরাবের আদর্শের পরিপূরক শক্তি সাংবাদিক সমাজ| আশান্বিত হলেন শহীদ তুরাবের অশীতিপর বৃদ্ধা মা মমতাজ বেগম|
মামলা দায়ের হলো| তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলো পিবিআই ( পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) কে| তদন্তের নানান প্রক্রিয়া আর টালবাহানায় পুরো ২৪ পার করে দেয় পিবিআই|
২৬ জানুয়ারী ২০২৫ সালে তুরাব হত্যা মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তরের আবেদন করেন শহীদ তুরাবের ভাই আবু আহসান মো. আজরফ| এক অভিযোগপত্রে কমপ্লেইন্ট রেজিস্টারভুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ এর ৮ ধারা অনুযায়ী আসামীদের বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান শহীদ তুরাবের ভাই|
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল,এসএমপি’র অতিরিক্ত উপ পুরিশ কমিশনার মো:সাদেক দস্তগীর কাউসার, এসএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আজবাহার আলী শেখ, কোতয়ালী মডেল থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান, বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কল্লোল  কোতয়ালীর সাবেক ওসি মঈন উদ্দিন, কোতয়ালী থানার ওসি(তদন্ত) ফজলুর রহমান, এসআই কাজী রিপন সরকার, মহানগর স্বেচ্ছা সেবকলীগের সভাপতি সাবেক কাউন্সিলর আফতাব উদ্দিন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহানগর শাখার সহ সভাপতি পীযুষ কান্তি দে, সিসিক মেয়রের পিএস যুবলীগ নেতা সাজলু লস্কর, সরকারী কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ৩২ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রুহেল আহমদ, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সজল দাস, শিবলু আহমদ, কোতয়ালী থানার কনস্টেবল সেলিম মিয়া, আজহার, ফিরোজ, উজ্জল এই ১৮ জনের নাম উল্লেখ পূর্বক অজ্ঞাত আরো ২০/৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয় ট্রাইব্যুনালে|
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎপরতা কিছুটা পরিলক্ষিত হয়| ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এডভোকেট তারেক আবদুল্লাহর নেতৃত্বে তদন্ত দল একাধিকবার সিলেট সফর করেন| সাক্ষীদের জবানবন্দী রেকর্ড করেন| ঘটনাস্থল পরিদর্শন পর্যবেক্ষণ করেন| এরপর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়| যতবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয় ততবার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা সিলেট আসেন| ২/১ জন সাক্ষীকে খুঁজেন, বাদীকে খুঁজেন| সাক্ষাত হলে কিছু কথা বলেন, না হলে নাই| ঢাকায় ফেরেন| মামলার তদন্তের অগ্রগতি বলতে কিছু হয়না| সর্বশেষ গত ১৫ জুলাই নতুন একজন কর্মকর্তা সিলেট এসে সার্কিট হাউসে উঠেন| রাতে কল দেন মামলার বাদী শহীদ তুরাবের ভাই আবুল আহসান মো: আজরফকে| পরদিন সকালে সাক্ষাত করতে বলেন| আবুল আহসান বিয়ানীবাজার এই সময়ের মধ্যে আসতে পারেননি| ঐ কর্মকর্তা কি দায়িত্ব পালন করে গেছেন তা আর জানা যায়নি| তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ হয়নি| আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্তের নামে যে সময় ক্ষেপন করছে তা অনেকটা পরিস্কার| আসামীদের মধ্যে মো:সাদেক দস্তগীর কাউসার ও কন্সটেবল উজ্জলকে গ্রেফতার করা হয়েছে| বাকী পুলিশ আসামী বহাল তবিয়তে| সাবেক ¯^রাষ্ট্রমন্ত্রী মন্ত্রী সহ যুবলীগ, ছাত্রলীগ, ¯ে^চ্ছাসেবকলীগের আসামীরা আত্মগোপনে রয়েছে| তাদের গ্রেফতারে পুলিশের কোন তৎপরতা গত ২ বছরে চোখে পড়েনি| এ প্রসঙ্গে শহীদ তুরাবের ভাই আবুল আহসান মো: আজরফের সাথে কথা বল্লে তিনি জানান, সাগর-রুনী হত্যা মামলার মত আমার ভাইয়ের বিচার তদন্তের যাঁতাকলে আটকে আছে| জানিনা বিচার কবে হবে, আদৌ হবে কি না?
শহীদ তুরাব অনুষ্ঠানের টপ এজেন্ডা: মিলাদ মাহফিল থেকে মানববন্ধন, রাজপথে সভা কিংবা ঘরোয়া ˆবঠকে অনুষ্ঠানের টপ এজেন্ডা শহীদ তুরাব| রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিককিংবা সাংবাদিক সংগঠন তাদের কর্মসূচীতে শহীদ তুরাবের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন| শহীদ তুরাব হত্যার বিচার দাবী করেন| একটা ছবির কসরত হয় ভিন্ন আঙ্গিকে| এইটুকুই কাজের কাজ কিছু হয়না| হয়না সোচ্চার কোন আওয়াজ বলিস্ট কোন দাবী| নির্বাচিত সরকার আসার পর জনমনে আশা জেগেছিল এবার হয়তো বিচারের কাজ তরাণি¦ত হবে|হচ্ছে আরো উল্টো স্থানীয় এমপি কিংবা সিলেটের প্রভাবশালী দু’জন মন্ত্রী তুরাব হত্যার বিচার নিয়ে অনেকটা উদাসীন|
তুরাব চত্বর বাস্তবায়ন কতদুর: তুরাব গুলিবিদ্ধের স্থান কোর্ট পয়েন্টকে শহীদ সাংবাদিক তুরাব চত্বর ঘোষণার দাবী সিলেটের সাংবাদিক সমাজের| প্রশাসনিক জটিলতা আর উদাসীনতায় আজো বাস্তবায়ন হয়নি| আর কত কাল পার হলে পরে হবে তা কেউ জানেনা|
তুরাব নেই পৃথিবীতে| আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়| তুরাবের মায়ের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে| কান্নায় আর অশ্রুজল আসেনা| সদ্য বিবাহিত স্ত্রী ‘বিধবা’ খ্যাতি নিয়ে ভাগ্যকে বরণ করে নিয়েছেন|দেশে ও বিদেশে থাকা দুই ভাই অনেকটা ক্লান্ত| ভাই হারানোর কস্ট,মামলা,তদন্ত, বিচার এসব ঘানি টানতে টানতে পার করেছেন দুটি বছর| আমরা যাঁরা সহকর্মী সাংবাদিক অনেকেই সাধ্যের সর্বোচ্ছটুকু দিয়ে তুরাব হত্যার বিচার হোক এ দাবী জানিয়ে আসছি| রাজনৈতিক , সামাজিক, সাংস্কৃতিক ,পেশাজীবি সংগঠন সংস্থাও যার যার অবস্থান থেকে এই বর্বর হত্যাকান্ডে বিচার প্রত্যাশা করছে| তদন্তে দীর্ঘসুত্রতা জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার করছে| মুল আসামীদের গ্রেফতার না করা বিচার নেয়ে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ|
এই অবস্থায় সব সাংবাদিক সংগঠন ক্ষুদ্র গোস্টী স্বার্থ ত্যাগ করে বলিস্ট ভূমিকা না রাখলে তুরাব হত্যার বিচার তদন্তেই আটকে থাকবে|

আরও পড়ুন  মীর কাসেমের পাচারের টাকা ফেরাতে তৎপর দুদক

মহান রব সুরা বাকারার ১৫৪ নং আয়াতে ঘোষণা করেছেন,“ আল্লাহর পথে যাঁরা নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলোনা, বরং তাঁরা জীবিত,কিন্তু তোমরা উপলব্ধি করতে পারোনা|”-
মহান মাবুদ তুরাবকে যেন আল্লাহর পথে নিহতদের তালিকাভূক্ত করেন| শাহাদাতের উচ্চ মাকাম দান করেন| আজকের এই সময়ে এটাই আমাদের কায়মনোচিত্তে প্রার্থনা|

কবীর আহমদ সোহেল # সম্পাদক: দৈনিক প্রভাতবেলা # আহবায়ক: সিলেট ইউনাইটেড জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন # সাবেক কোষাধ্যক্ষ: সিলেট প্রেসক্লাব|

সর্বশেষ সংবাদ