ভারতীয় চ্যানেলের দাপটে ঝুঁকির মুখে দেশীয় সংস্কৃতি

প্রকাশিত: 2:21 AM, January 31, 2017

আহমদ মারুফ ℜ
সম্প্রচারিত বিষয়বস্তুর বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ না করে সরাসরি রিট করা এবং এ বিষয়ে করা আগের রিট নিয়ে বিস্তারিত (নতুন যুক্তি) উল্লেখ না করায় ভারতীয় তিন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধে করা রিট খারিজ করা হয়েছে। স্টার জলসা, স্টার প্লাস ও জি বাংলা নামের চ্যানেল তিনটি চলবে। ২৯ জানুয়ারী এ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
তবে রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি ও আমাদের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়াতে পারে, পারস্পরিক বিদ্বেষ ছড়াতে পারে- এ ধরনের কোনো বিষয়বস্তু সম্প্রচার করা যাবে না’।
বাস্তবে কি এর প্রতিফলন ঘটবে? ভারতীয় চ্যানেলের দাপটে দেশীয় সংস্কৃতি ঝুুঁকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশী চ্যানেল দেখার পরিমাণ বা দর্শক কমছে আশঙ্কাজনক হারে। গত কয়েক বছরে এদেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের বিপ্লবে যে সম্ভাবনার তৈরি হয়, ভারতীয় চ্যানেলের আগ্রাসনে তা এখন আশঙ্কায় পরিণত হচ্ছে। হিন্দি সিরিয়াল, সিনেমাবাহিত সংস্কৃতি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের অন্দরে ঢুকছে ভয়াবহভাবে। সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের মধ্যে চলে হিন্দি ভাষায় আলাপচারিতা। শহরের রাস্তার বিজ্ঞাপন বিলেবোর্ডে বলিউড নায়ক, নায়িকাদের ছবি শোভা পাচ্ছে। ভারতীয় চ্যানেলে প্রচারিত সিরিয়াল, নাটক, নেতিবাচকভাবে আঘাত করছে পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধে। বিয়ের অনুষ্ঠানের নিজস্বতা বাদ দিয়ে হিন্দির আদলে ‘গায়ে হলুদ’কে ‘মেহেন্দি’ বলা মধ্যবিত্তদের ফ্যাশনে পরিণত হয়ে পড়েছে। এরকমভাবে অনেক শব্দের হিন্দি ব্যবহার চলছে। এসব শব্দের সুন্দর, অর্থবহ, সহজ বাংলা থাকলেও সেগুলো হিন্দির দাপটে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। বিয়েসহ সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে বাজে হিন্দি গান। এসব অনুষ্ঠানে দেশের গান থাকলেও সেগুলো উপেক্ষিত। হুবহু ভারতীয় অনুকরণ, হিন্দি সিরিয়ালে দেখা বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েদের আবেদনময়ীর রূপে সাজসজ্জাসহ নানাভাবে সামাজিক অনুষ্ঠানে চলছে ভারতীয় সংস্কৃতি। অভিজ্ঞরা বলছেন, হিন্দি চ্যানেলের মাধ্যমে এসব ছড়িয়ে পড়ছে। এসব চ্যানেলের সিনেমা, টিভি সিরিয়ালে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের প্রেম করার কলাকৌশল, ভাষা বিন্যাস, পোশাকের স্টাইল, চুল-চেহারার বিন্যাস, বাবা মায়ের অবাধ্য হওয়া, আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করছে। পরকীয়া প্রেম, সম্পত্তি দখল নিয়ে নানা উদ্ভট বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে। যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনাচরণকে গ্রাস করছে বহুলাংশে। হিন্দি সিরিয়ালগুলো মহিলা বিশেষ করে উচ্চবিত্ত গৃহিণীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তাদের সময় কাটে এসব দেখে। অনেকের ঘুম আসে না সিরিয়াল না দেখলে। সেগুলো দেখার জন্য অনেক ঘরে ঝগড়া পর্যন্ত হচ্ছে।
প্রবীন আলেম মাওলানা ফয়জুর রহমান বলেন, আমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে বিকৃতি অনেক আগেই শুরু হয়েছে। পারিবারিক সংস্কৃতি আজ ধ্বংসের পথে। মানুষ মানুষ হয়ে উঠছে না। দৈনন্দিন কর্মকান্ড ও ব্যক্তিজীবনে উচ্ছৃঙ্খলতা প্রাধান্য পাচ্ছে। প্রতিটি ধর্মই মানবিক শিক্ষার আধার। কিন্তু ধর্মের শিক্ষা এখন আর ছাত্রদের দেয়া হয় না। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ রয়েছে। উচ্চশিক্ষায় পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার শিক্ষা নেই। মিডিয়াগুলো কেবল বাণিজ্যকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, অর্থনীতি উপেক্ষিত। ভাপা পিঠার স্থান দখল করেছে এখন বার্গার। সমাজ সংস্কৃতিতে একই বিকৃতি। এখন যুবকরা মনে করছে পূর্ব পুরুষরা মূর্খ ছিল। কিন্তু তা ঠিক নয়।
এর সমাধান কী, জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, আমাদের অবশ্যই অত্যাধুনিক হওয়ার নেশা ছাড়তে হবে। ঐতিহ্যে ফিরে যেতে হবে। যার যার ধর্ম থেকে নৈতিকতার পাঠ নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে সেগুলো নিজে মানতে হবে, অন্যকেও শেখাতে হবে। তিনি বলেন, মা-বাবা যদি সন্তানের কঠোর শাসনে রাখেন, তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আর দন্ড দিতে হয় না। আজকালকার ছেলেমেয়েদের উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য তিনি মা-বাবার পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট চ্যাটিং, ডিস কালচার এবং মিডিয়ার দায়িত্বহীন আচরণকে দায়ী করে বলেন, ছেলেমেয়েদের মাথা ঠিক করতে হলে অবিলম্বে মোবাইল ফোনে রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত হ্রাসকৃত রেটে কথা বলার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে সাইবার ক্যাফেগুলো। তিনি পত্র-পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলো যৌনতা ও হিংস্রতার বেসাতি খুলে বসেছে বলে অভিযোগ করেন।
সিলেট মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা’র সাধারণ সম্পাদক শাহীন আহমদ খানকে তারুণ্যের অবক্ষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বড়দের কুকর্ম ও মোনাফেকি ছোটদের খারাপ পথে নিয়ে যাচ্ছে। যারা আড়ালে থেকে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে তারাই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বড় বড় কথা বলে। বড়রা ধর্মের পথ থেকে সরে গেছে বলেই তরুণ সমাজ আজ শান্তির চেয়ে ধর্মের পথ থেকে সুখকে প্রাধান্য দিতে শিখেছে। এই সুখ তারা পেতে চায় যে কোনো মূল্যে। সমাজ যখন নারীকে পণ্য হিসেবে তুলে ধরে, তখন কিশোর-তরুণীদের অপরাধ, মাদকের নেশায়, অবৈধ যৌনতায় জড়িয়ে পড়া নিয়ে হাহাকার করা মানায় না।
তিনি মিডিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ভারতের টিভি সিরিয়ালগুলো দেখলে মনে হয়, তারা যেন চিরায়ত মূল্যবোধ, ধর্মীয় নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন ইত্যাদির বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধে নেমে পড়েছে। দেশের এই সার্বিক অবক্ষয় থেকে মুক্তির জন্য তিনি ধর্মের আশ্রয় নেয়ার আহবান জানান সবার প্রতি।

সর্বশেষ সংবাদ