যেকারণে নিজ সন্তানকে হত্যা করলেন নাজমিন

প্রকাশিত: 1:16 AM, February 15, 2022

যেকারণে নিজ সন্তানকে হত্যা করলেন নাজমিন

আদালত প্রতিবেদক,সিলেট♦ নিজ হাতে নিজের নিস্পাপ শিশু সন্তানকে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন পাষন্ড মা। স্বামীর ওপর ক্ষোভ ঝাড়তেই নিজ সন্তানকে হত্যা করেছেন এমনটাই জানান পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে। ৩ মিনিট বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করেন নিজের ১৭ মাস বয়সী সন্তানকে ।

 

৩ দিনের রিমান্ডের প্রথম দিনেই এমন স্বীকারোক্তি দেন  নাজমিন জাহান (২৮) ।   শুক্রবার তাকে ৩ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। প্রথম দিনেই সবকিছু স্বীকার করে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেয়ায় বাকি ২ দিন  তাকে রিমান্ডে নিতে হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। শনিবার তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

এসএমপির শাহপরান থানার ওসি সৈয়দ আনিসুর রহমান জানান, নিজের ১৭ মাস বয়সী সন্তান নুসরাত জাহান সাবিহাকে নিজ হাতে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করেন পাষণ্ড মা নাজমিন জাহান (২৮)। পুরো তিন মিনিট সাবিহার মুখে বালিশচাপা দিয়ে রেখে মৃত্যু নিশ্চিত করেন তিনি। পুলিশের দ্বিতীয় দফা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ তথ্য দেন নাজমিন।

তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারী) নাজমিনকে আদালতে প্রেরণ করে ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডের প্রথম দিন শুক্রবারই সব কিছু স্বীকার করে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেন তিনি। যে কারণে আর বাকি দুইদিন রিমান্ডে নিতে হয়নি। তাই শনিবার নাজমিনকে আদালতে প্রেরণ করলে সিলেটের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সুমন ভূঁইয়া তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

 

জানা যায়, স্বামীর প্রতি ক্ষোভ ও নানা অভিযোগ ছিলো সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ বাদেপাশা ইউনিয়নের কালিকৃষ্ণপুর গ্রামের মো. জিয়া উদ্দিনের মেয়ে নাজমিনের। স্বামীর কাছ থেকে ‘অযত্ন, অবহেলা আর অপবাদ’ পাওয়ার অভিযোগ তার। সে ক্ষোভ উগড়ে দেন নিজের ১৭ মাস বয়েসি শিশুসন্তান নুসরাত জাহান সাবিহার উপর। গত বুধবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বেলা ২টার দিকে সাবিহাকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তিনি। ।

 

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত শিশু নুসরাত জাহান সাবিহার বাবা সাব্বির আহমদ সিলেট দক্ষিণ সুরমার বলদি এলাকার বাসিন্দা ও কাতার প্রবাসী। সম্প্রতি সাব্বির দেশে ছুটিতে আসেন। কিন্তু সাব্বিরের সঙ্গে নাজমিনের বনিবনা না থাকায় তিনি (নাজমিন) শাহপরাণ এলাকার নিপোবন-৪৯ এ আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন এবং একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। সঙ্গে তার ছোট বোন ও আগের স্বামীর ঘরের ১১ বছরের এক সন্তান থাকতেন। স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক কলহের এক পর্যায়ে গেল বুধবার বেলা ২টার দিকে ১৭ মাস বয়েসি শিশু সাবিহার মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন নাজমিন।

আরও পড়ুন  দশ বছরেই কোটিপতি চেয়ারম্যান বিল্লাল : তদন্তে দুদক

 

এসময় বিষয়টি দেখতে পেয়ে নাজমিনের কবল থেকে তার বোন ও প্রতিবেশী এক মহিলা শিশুটিকে উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাবিহাকে মৃত ঘোষণা করেন। এসময় হাসপাতাল থেকে নাজমিন পালাতে চেষ্টা করলে উপস্থিত লোকজন তাকে আটক করে পুলিশে খবর দেন। পরে কোতোয়ালী থানার একদল পুলিশ গিয়ে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে।

 

থানায় আসার পর পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাংবাদিকদের সামনে নিজের শিশুমেয়েকে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন নাজমিন। এসময় তিনি বলেন, ২০১৫ সালের মে মাসে সাব্বির হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বিয়ের ৬ মাস পর সাব্বির বিদেশে চলে যান। পরে তিনি শাহপরান এলাকার নিপোবন-৪৯ নং বাসায় থেকে সিলেটের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতে থাকেন।

 

নাজমিনের অভিযোগ, বিদেশের যাওয়ার পর থেকে স্বামী সাব্বির আর তার খোঁজ নেননি। ভরণ-পোষণও করেননি। বিদেশে থাকা অবস্থায় সাব্বির পরিচিতজনদের মাধ্যমে নাজমিনকে ডিভোর্স দেওয়ার কথা বলতেন। এমন অবস্থায় চার বছর পর ২০২০ সালে দেশে আসেন সাব্বির। দেশে এসে নাজমিনকে বুঝিয়ে আবার সংসার শুরু করেন তিনি। তখন নাজমিন গর্ভবতী হন। তাকে গর্ভবতী রেখে সাব্বির আবারও কাতার চলে যান। তবে প্রবাসে যাওয়ার পরপরই গর্ভের সন্তান নিজের নয় বলে দাবি করেন সাব্বির।

নাজমিন বলেন, আমি তখন ডিএনএ টেস্ট করার কথা বলি। কিন্তু এরপরও সাব্বির আমার বিরুদ্ধে পরিচিত সকলের কাছে কুৎসা রটাতে থাকে এবং আমাকে অপবাদ দিতে থাকে। তবে জন্মের পর মেয়ের চেহেরা অবিকল তার বাবার মতো হওয়ায় মানুষের প্রশ্ন থেকে আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন  শ্রীমঙ্গলে বাস চাপায় শিশু নিহত

 

নাজমিন আরও বলেন, সাব্বির ১৫ দিন আগে দেশে এসেছেন। কিন্তু আমার কাছে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। চার-পাঁচ দিন পর পর শুধু কয়েক মিনিটের জন্য মেয়েকে দেখতে যান। কিন্তু আমি স্ত্রী হিসেবে তাকে কাছে পাইনি। স্বামীর বিরুদ্ধে চরিত্রহীনতার অভিযোগ এনে নাজমিন বলেন, ও পরকীয়া করে না। বহু নারীর কাছে যায়। একজনের সঙ্গে পরকীয়া করলে হয়তো তাকে ফেরাতে পারতাম।

কিন্তু সবকিছুর পরে নিজের সন্তানকে হত্যা করলেন কেন? সে তো নির্দোষ ছিলো? পুলিশের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার তো সব শেষ। আমার জীবনকে একেবারে নষ্ট করে দিয়েছে সাব্বির। নিজের সন্তানকে- আমাকে সময় দেয় না। আমাকে জিন্দা লাশ করে ফেলছে সে। তাই আমার মাথা কাজ করেনি। তার প্রতি ক্ষোভে-কষ্টে মেয়েকে বালিশচাপা দেই।

আমি ইমোশন থেকে আমার বাচ্চাটাকে মারছি। কিন্তু বালিশাচাপা দেওয়ার পর আমার আবেগ জেগে ওঠে। আমি আমার মেয়েকে মারার পর তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরি এবং অনেক্ষণ কান্না করি। এসময় আমার বাচ্চার হৃদস্পন্দন আমি বুঝতে পারি। ওইসময় বাড়িওয়ালি এসে আমার কাছ থেকে আমার মেয়েকে নিয়ে নেন। এর পরপরই আমার মেয়ে হড়হড়িয়ে বমি করে। পরে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় নাজমিনের স্বামী সাব্বির আহমদ বুধবার রাতে বাদি হয়ে নাজমিনকে আসামি করে শাহপরাণ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং-১১।

শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আনিসুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার আদালতে প্রেরণ করলে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেননি নাজমিন। যে কারণে তাঁকে ৫ দিনের রিমান্ডে আবেদন করা হয়। পরে বিজ্ঞ আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে প্রথম দিনই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। ফলে শনিবারই তাকে আবার আদালতে প্রেরণ করি এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

সর্বশেষ সংবাদ