সিলেট | |
প্রকাশিত: 3:15 PM, October 14, 2020
কবীর আহমদ সোহেল ♦
’৯০ দশকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে সিলেটে আবাসন ব্যবসার যাত্রা শুরু। ২০০৪- ২০০৫ সালে সিলেটের আবাসন ব্যবসায় ব্যাপক সাড়া পড়ে। প্লট, ফ্লাট, হাউজিং, এপার্টমেন্ট, রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ধূম পড়ে যায় সিলেটে। আধুনিক চিন্তাধারায় উন্নত নাগরিক বসবাসের সুযোগ সৃস্টিতে গড়ে উঠে আবাসন প্রকল্প, হাউজিং,এপার্টমেন্ট ব্যবসার শতাধিক কোম্পানী- প্রতিষ্ঠান।
বিশ্বমন্দার কাছে মোহনীয় শ্লোগান পরাজিত:
এ অবস্থায় ইউরোপ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারি সিলেটিরা সেখানেই জীবন যাপন করতে হাপিয়ে উঠছেন। জন্মভূমিতে একটি বাড়ীর স্বপ্নকে আপাতত বুকচাপা দিয়েই রাখছেন। আর যাঁদের আর্থিক সক্ষমতা আছে তাঁরা দু’টানায় তাদের তৃতীয় প্রজন্মকে নিয়ে। বাবার হাত ধরে বিলেতে গিয়েছিলেন, বাবা চাইতেন দেশে কিছু করতে, করেছেনও। বাবার নীতিতে তিনিও দেশমূখী। কিন্তু তাঁর সন্তান বাংলাদেশে আসতে চায়না। বাংলাদেশকে ভালো পায়না। বিলেতে লেখাপড়া করে সে এখন পুরোদোস্তর বিলেতি। কি করবেন সিলেটে বাড়ী বানিয়ে? চিন্তায় কপালে ভাঁজ আসলেও সমাধান আসেনা। শুধু বিলেত নয় এ দৃশ্য ইউরোপের সবকটি দেশ ও আমেরিকায় সেটেলড্ অধিকাংশ সিলেটির। বলার অপেক্ষা রাখেনা এর নেতিবাচক প্রভাব সিলেটের আবাসন ব্যবসায়। বলতেই হয় চিত্তাকর্ষক শ্লোগান এখানে পরাজিত। এটা শুধু ক্রেতার ক্ষেত্রেই নয়, প্রবাসী বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রেও।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার অভাব:
‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকার সিলেটের আবাসন ব্যবসাকে শৃংখলিত করার নামে মূলত নিয়ন্ত্রিত করে ফেলে। বহুদিনের প্রচলিত অনিয়ম দূরীকরন করতে গিয়ে আবাসন ব্যবসাকে জটিল করে ফেলে সেনা সমর্থিত সেই সরকার। যার ধকল শামলে উঠতে পারেনি আবাসন ব্যবসায় নবীন সিলেটের ব্যবসায়ীরা। পরবর্তীতে রাজনৈতিক সরকারও একই পথে হাঁটে। জলাভূমি ভরাট করা যাবেনা, কৃষি জমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা যাবেনা, ব্যক্তি থেকে কোম্পানী বা কোম্পানী থেকে ব্যক্তির নামে ক্রয় বিক্রয়ে বিধি নিষেধ, জায়গা জমি নামজারী -রেজিস্ট্রেশনে কঠোরতা আবাসন ব্যবসাকে এগুতে দিচ্ছেনা তার নিজস্ব গতিতে। সর্বোপরি আবাসন ব্যবসায় ব্যাংক ঋণ প্রদানে কঠোরতা আরোপ করে সরকার এই ব্যবসার পশ্চাপদে পেরেক ঢুকিয়ে দিয়েছে।
উদ্যোক্তাদের অদক্ষতা, অদূরদর্শীতা ও অস্বচ্ছতা:
আবাসন ব্যবসার ধসের পেছনে এ কারণটি মোটা দাগে চিহ্নিত হয়েছে। ব্যবসা সংশ্লিষ্টজন, ফ্লাট প্লট জমি ক্রেতা এবং সাধারণ জনগণের একটা অংশ মনে করেন হাউজিং ব্যবসায়ীরা ‘দুই নাম্বারী’ করেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে অধিকাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠান তাদের ‘কমিটমেন্ট’ রক্ষা করতে পারেনা বা করেনা। বলে এক করে আরেক। অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্তভোগী দালালরা অতিরঞ্জিত কথা বলে ক্রেতা আকৃষ্ট করে। পরবর্তীতে এসব কথার সাথে কাজের মিল থাকেনা। মধ্যস্বত্বভোগীরা কমিশন নিয়ে সটকে পড়ে। ফ্যাসাদ লাগে কোম্পানী আর ক্রেতার মধ্যে। কোন কোন আবাসন কোম্পানীর ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযাগ রয়েছে। যার বদনাম আসে গোটা কোম্পনীর ওপর।
‘সিলেট এক্সেলসিয়র’ মেগা প্রকল্পের উদ্যোক্তা লন্ডন প্রবাসী সংগঠক ও সাংবাদিক সাঈদ চৌধুরী এ প্রসংগে প্রভাতবেলাকে বলেন, সিলেটের আবাসন ব্যবসা মরে গেছে, প্রবাসীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এমনটা আমি মনে করিনা। বৃটেনে প্রায় ১ লক্ষ সিলেটি পরিবার বসবাস করেন। তার মধ্যে অন্তত ৮০ হাজার পরিবার দেশে একটি বাড়ী করার স্বপ্ন লালন করেন। বিশ^ অর্থনৈতিক মন্দাভাবে উত্তরণ ঘটলেই তাঁরা দেশের দিকেই ঝুঁকবেন বলেন সাঈদ চৌধুরী।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা:
এ প্রসংগে সিলেট এপার্টমেন্ট এন্ড রিয়েল এস্টেট গ্রুপ (সারেগ) এর সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মুনতাসির আলী বলেন, প্রধানত দুটি কারণে সিলেটের আবাসন ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রথমত; দেশে যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন,রাহাজানি, লুটপাট চলছে তার মধ্যে প্রবাসীরা বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত: সরকারের অসহযোগিতা। বাসস্থান নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিতকল্পে রাষ্ট্র সহযোগিতা করবে এটাই স্বাভাবিক। অথচ আমাদের দেশে সরকারী কর্মচারীদের যে সুযোগ সুবিধা দেয়া হয় সাধারণ নাগরিককে তা দেয়া হয়না। রাষ্ট্রীয় এই বৈষম্য অরাজক পরিস্থিতির সৃস্টি করেছে। যার প্রভাব পড়েছে আবাসন খাতে।
সামাজিক ও প্রশাসনিক জটিলতা:
অনুসন্ধানে দেখা গেছে প্রবাসীদের স্বজন পরিজন বা শুভাকাংখীরুপী কিছু দালাল প্রবাসীদের বেকায়দায় ফেলে। ‘সামান্য সমস্যা আছে’ ‘কমদামে পাবেন’ ‘এগুলো কোন সমস্যা না’ ‘সামান্য খরচ করলে’ ঠিক করা যাবে। এ টাইপের কথা বলে প্রবাসীকে প্রভাবিত করে কোন কোন ক্ষেত্রে প্রবাসীদের অতিলোভী মানসিকতায় জায়গা জমি কেনা হয়। পরবর্তীতে এই ‘সামান্য সমস্যার’ সমধান হয়না বছরের পর বছর। ‘কমদামে কেনা’ জমি দ্বিগুন খরচ করেও দখলে আনা যায়না। প্রবাসী ক্রেতা নিজের আক্কেল সেলামী নিজেই দেন। এটা বলে বেড়ান নানা রং মাখিয়ে। মারাত্মক প্রভাব পড়ে ঐ কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের ওপর। অথচ মূল কারিগর তারই কোন আত্মীয় বা শুভার্থীরুপী কোন দালাল। তারে আর পাওয়া যায়না, বদনামও তারে পায়না।
দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কোন প্রবাসীর মুলধন বা মুনাফা আটকে থাকেনি। সর্বোপরি ক্রেতা- বিক্রেতা এবং কোম্পানীর আভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি, আমানত রক্ষা করে চলতে পারলে ক্ষতির কোন আশংকা নেই, বলেন নজরুল শোয়েব।
প্রত্যন্ত জনপদের উন্নয়ন, আবাসন ব্যবসায় ভাটা :
মোটাদাগের এই কারণগুলো ছাড়াও সিলেটের আবাসন ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে আর্থ- সামাজিক নানা কারণ। সিলেটের আবাসন ব্যবসায় চরম মন্দাভাব বিরাজ করছে। এক সময় যেসব ফ্লাটের বর্গফুট ৫ হাজার ২শ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে-সে সব ফ্ল্যাট এখন ৩ হাজার টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে না। আবাসন প্রকল্পের প্লটের দামও ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ কমে গেছে। ক্রয়-বিক্রয়ও নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
আশা- নিরাশার দোলাচলে চলতে থাকা সিলেটের আবাসন ব্যবসা নিয়ে আশাবাদী সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেট এর সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। বনেদি ব্যবসায়ী এই সজ্জন প্রভাতবেলাকে বলছেন, করোনা মহামারী কেটে গেলে শুধু আবাসন নয় সব ব্যবসায় গতি আসবে। মানুষ এখন জীবনের শংকায়। তাই কোন বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। তবে প্রবাসীরা চলমান সময়ে দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ তারা কাজে লাগাতে পারলে লাভবান হবেন, বলেন ফারুক মাহমুদ চৌধুরী।

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আব্দুল হক
ঢাকা অফিস : ২৩৪/৪ উত্তর গোড়ান, খিলগাঁও, ঢাকা ।
সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ, ১৪৯ আরামবাগ, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-৫৯৩৬৫৩, ০১৭১২-০৩৩৭১৫
E-mail: provatbela@gmail.com,
কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম
আমাদের সর্ম্পকে গোপনীয়তা যোগাযোগ
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি