সিলেট | |
প্রকাশিত: 9:56 PM, August 20, 2016
নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই ৪১ বিশ্ববিদ্যালয়ের
আহমদ মারুফ
গুলশান হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী জড়িত থাকার পর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ইউজিসির কড়া মনিটরিং, সরকারি পর্যবেক্ষক নিয়োগ, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শিক্ষার মান ও পরিবেশের অনুপস্থিতি, আউটার ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়া, শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থার অভাব, স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে জঙ্গি কানেকশন। এসব কারণে চলতি বছর শিক্ষার্থী ভর্তির ধারাবাহিক বৃদ্ধিতে ছেদ পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদরা।
জঙ্গি হামলার পর সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে চাকরি দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কড়া শর্তারোপ। ইন্টার্নশিপ করা শিক্ষার্থীদের বিদায় দিচ্ছে দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। নর্থ সাউথের একটি সূত্র জানিয়েছে, ১ জুলাই গুলশান হামলার পর রাজধানীর বনানীতে একটি জাপানি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করছিল নর্থ সাউথের বিভিন্ন বিভাগের ১৩ জন শিক্ষার্থী। হামলার পর দিন বিনা নোটিশে তাদের পাওনা পরিশোধ করে বিদায় দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে শিক্ষার্থীরা। এতে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাড়বে। দেশের টাকা চলে যাবে দেশের বাইরে। যা হতো ৯০ দশকের আগে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার সাত বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে হবে, যা আগে ছিল পাঁচ বছর। তিন দফায় সময় বাড়ানোর পর মাত্র ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গভাবে নিজস্ব ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। বাকি ৪১টি বিশ্ববিদ্যালয় এই সময়ের মধ্যে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে পারছে না। ‘জমি কিনেছি’, ‘নির্মাণকাজ করছি’ ‘যাচ্ছি’Ñএ জাতীয় তথ্য দিয়ে সময় বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় আইন অমান্যকারী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও কার্যত আপস করছে। বারবার আইন ভঙ্গ করলেও ব্যবস্থা নিতে পারছে না। গত ছয় বছরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারেনি মন্ত্রণালয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়া ১১টির বাইরে অন্য ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাস তৈরি করলেও শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি স্থানান্তর করেনি।
ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালে নতুন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যাওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া হয়। প্রথমে ২০১২ সালের মধ্যে, দ্বিতীয়বার ২০১৩ সালের মধ্যে এবং সর্বশেষ এক লাফে দুই বছর বাড়িয়ে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠার পর বয়স দুই দশক। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা করছে না তারা।
ব্যস্ততম সড়ক ও আবাসিক এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করা যাবে না, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস থাকা যাবে নাÑএগুলো আইনের কথা ও সরকারের সিদ্ধান্ত। কিন্তু আইন ভঙ্গ করে সিলেটে যত্রতত্র ক্যাম্পাস খুলে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন কর্তৃপক্ষ। সিলেট নগরীর বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, তালতলা এলাকার ব্যস্ততম সড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে লিডিং ইউনিভার্সিটি, মেট্টোপলিটন ইউনিভার্সিটি ও নর্থইস্ট ইউনিভার্সিটি। বাণিজ্যিক ভবনের একটি বা দুটি ফ্লোর ভাড়া দিয়ে কার্যক্রম চলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নামেমাত্র ক্লাব থাকলেও তাতে যুক্ত নেই ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী। গবেষণার জন্য নেই কোনও ব্যবস্থা। নেই কোন ল্যাব। শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন গ্রন্থাগার সেটিও খুবই স্বল্প পরিসরে রয়েছে। ক্লাস রুমের বাহিরে খেলাধুলা করার মতো কোন মাঠ নেই এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।
নিজস্ব ছাত্রাবাস না থাকায় শিক্ষার্থীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকছে বিভিন্ন স্থানে। সার্বিক বিচারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বৈশিষ্ট্যই খুঁজে পাওয়া যায় না এসব প্রতিষ্ঠানে। নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ থাকায় পড়ালেখার চাপও তেমন নেই শিক্ষার্থীদের। ফলে দিনের বেশির ভাগ সময়ই ইন্টারনেটে ব্যস্ত থাকছে তারা। মাদক সেবনেও জড়াচ্ছে অনেকে। এদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ ঝুঁকে পড়ছে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে।
অনুসন্ধানের জানা গেছে, আইনানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে জমি থাকার কথা থাকলেও পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত পরিমাণ জমিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা না করে ফাউন্ডেশনের নামে কেনা আরও কম পরিমাণ জমিতে অবকাঠামো নির্মাণ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এগুলো হলো: মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল, দি মিলেনিয়াম, পিপলস ও সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি।
নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম জমিতে নির্মিত ক্যাম্পাসে আংশিক শিক্ষা দিচ্ছে স্টেট ইউনিভার্সিটি। আর নির্ধারিত পরিমাণ জমিতে নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণ করছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক ও রয়েল ইউনিভার্সিটি।
নির্ধারিত পরিমাণ জমিতে চারটি বিশ্ববিদ্যালয় নকশা অনুমোদন করেছে। কিন্তু নির্মাণকাজ শুরু করতে পারেনি। এগুলো হলো গ্রিন ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, সিলেটের মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি ও চট্টগ্রামের সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি। এর মধ্যে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির নামে অননুমোদিত ক্যাম্পাস রয়েছে বলে ইউজিসি জানিয়েছে।
নির্ধারিত পরিমাণ জমি কিনলেও ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে নকশা অনুমোদন পায়নি এবং জমি ব্যবহারের অনুমতি অর্জন করেনি, এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আছে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, ইস্টার্ন, ইউনাইটেড, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অব সায়েন্সেস, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস ও অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এ ছাড়া ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, আশা ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, নর্দান ইউনিভার্সিটি ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি জমি কিনলেও নির্মাণকাজ শুরু করেনি।
সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি নিয়ে মামলা চলছে। এর মধ্যে আবার অনুমোদনহীন ক্যাম্পাস পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে প্রাইম ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সাউদার্ন, নর্দান, দি পিপলস, বিজিসি ট্রাস্ট, ইবাইস, আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে।
শিক্ষামন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকিরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান নিশ্চিত করেছিল তাদের ভিতরে নতুন করে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতা দেখা দিয়েছে। এতে এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা মুখ ফিরেয়ে নিবে। এতে শিক্ষার মানের ধস নামবে। জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার কারণে যদি এখানে মানের কোনো ধস বা ছাত্র ভর্তিতে কোনো প্রভাব পড়ে তাহলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মানের ধস নামবে।’

সম্পাদক : কবীর আহমদ সোহেল
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আব্দুল হক
ঢাকা অফিস : ২৩৪/৪ উত্তর গোড়ান, খিলগাঁও, ঢাকা ।
সম্পাদক কর্তৃক প্রগতি প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিঃ, ১৪৯ আরামবাগ, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সিলেট অফিস: ২৩০ সুরমা টাওয়ার (৩য় তলা)
ভিআইপি রোড, তালতলা, সিলেট।
মোবাইল-০১৭১২-৫৯৩৬৫৩, ০১৭১২-০৩৩৭১৫
E-mail: provatbela@gmail.com,
কপিরাইট : দৈনিক প্রভাতবেলা.কম
আমাদের সর্ম্পকে গোপনীয়তা যোগাযোগ
Design and developed by ওয়েব হোম বিডি