বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা আশঙ্কাজনক

প্রকাশিত: 5:08 PM, May 12, 2018

প্রভাতবেলা ডেস্ক: পুরো বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করছেন আন্তর্জাতিক আবহাওয়াবীদরা। তাদের মতে,বজ্রপাতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে বাংলাদেশে। বিশ্বে প্রতিবছর বজ্রপাতে যত মানুষের প্রাণহানি হয়, তার এক-চতুর্থাংশ বাংলাদেশি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে গত সাত বছরে ১৭০০ জন নিহত হয়েছে।

দিন দিন এ সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষ করে বায়ুদূষণ, ধাতব যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, বৃক্ষনিধন, বন উজাড়, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনসহ মানবসৃষ্ট প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজের জন্যই বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছর বজ্রপাতে নিহত হয়েছিলেন ১৮৬ জন। অবস্থার এখনো উন্নতি হয়নি। চলতি মাসেও প্রাকৃতিক এ দুর্যোগে নিহত হয়েছেন ৫০ জন।

বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৮০ থেকে ১২০ দিন বজ্রপাত হয়৷ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডাব্লিউ স্মিডলিনের ‘রিস্কফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ শীর্ষক গবেষণা বলছে, ‘প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়। বছরে দেড়শ’র মতো লোকের মৃত্যুর খবর সংবাদ মাধ্যম প্রকাশ করলেও প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা পাঁচশ’ থেকে এক হাজার।’

আরও পড়ুন  জয়ে শুরু লাল সবুজের

দুর্যোগ ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ২০৫, ২০১৬ সালে ২৪৫, ২০১৫ সালে ১৮৬, ২০১৪ সালে ২১০, ২০১৩ সালে ২৮৫, ২০১২ সালে ৩০১ এবং ২০১১ সালে ১৭৯ জন বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্ট্যাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন বলেন, ‘বজ্রপাত একটি স্বাভাবিক ঘটনা। আগেও হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটা বেড়ে গেছে৷ গত দুই-তিন বছরে গড়ে ৩০০-৪০০ লোক মারা গেছে৷ অতীতে এমন হয়নি।’

এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রধানত দু’টি কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে৷ বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে আবহাওয়া ও জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এর ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময় পরিবর্তন হয়েছে। কালবৈশাখি বেশি হচ্ছে। আর বজ্রপাতের সংখ্যা বা পরিমাণ বেড়ে গেছে।

অন্যদিকে আগে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর উঁচু গাছ ছিল৷ তাল গাছ, বটগাছ প্রভৃতি। সাভাবিক নিয়মে বজ্রপাত হলে এসব উঁচু গাছ তা অ্যাসজর্ব করে নিতো। কিন্তু এখন তা না থাকায় যখন খোলা মাঠে বজ্রপাত হয় তা মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শহরে গাছ না থাকলেও উঁচু উঁচু ভবন আছে৷ ফলে শহরের মানুষ এই মত্যু থেকে রেহাই পাচ্ছে।’

আরও পড়ুন  রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি: প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র প্রধান ড. আব্দুল মতিন বলেন, ‘বায়ুদূষণও একটি কারণ। এ কারণেও বজ্রপাত বাড়ছে।’

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রনালয় মঙ্গলবার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২৯ ও ৩০ এপ্রিল এই দুই দিনে বজ্রপাতে ৩২ জন নিহত হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। এ অবস্থায় করনীয়, সরকারের সিদ্ধান্ত এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে জানাতেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

বজ্রপাতের প্রতিকার হিসেবে গতবছর সরকার সারাদেশে ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল৷ তবে তালগাছ নয়, ২৮ লাখ তালের আঁটি রোপন করা হয়েছে।

ড. খন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন বলেন, ‘আমাদের গাছ তো লাগাতেই হবে৷ প্রতিরোধক ব্যবস্থাও নিতে হবে। তবে সবার আগে প্রয়োজন মানুষকে সচেতন করা। বৃষ্টি, ঝড় শুরু হলেই, বিশেষ করে যারা গ্রামে খোলা মাঠে থাকেন, তারা যেন ঘরে আশ্রয় নেন।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র প্রধান ড. আব্দুল মতিন বলেন, ‘গাছ কাটার জন্য আমরা সবাই দায়ী। আমাদের সচেতন হতে হবে। এখনো যে গাছ আছে, তা যদি আমরা সংরক্ষণ করতে পারি, তাহলে পাঁচ বছরের মধ্যে পরিস্থিতি পালটে যাবে।’ বিবিসি ও ডয়েচে ভেলে অবলম্বনে

 

সর্বশেষ সংবাদ