আমদানি ব্যয় দ্বিগুণ, তবু কেন জ্বালানি সংকট?

প্রকাশিত: 7:51 PM, August 31, 2026

আমদানি ব্যয় দ্বিগুণ, তবু কেন জ্বালানি সংকট?

প্রভাতবেলা ডেস্ক: জ্বালানি তেল আমদানিতে এক বছরে দ্বিগুণের বেশি ব্যয় বাড়লেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় জ্বালানি খাতের সংকট কাটছে না। উল্টো বাড়তি আমদানি ব্যয়ের চাপ শিল্প ও ব্যবসার উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৪ কোটি ডলার। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ৫১৪ কোটি ডলারের কম। ফলে এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫৫০ কোটি ডলার বা ১০৭ শতাংশ।

একই সময়ে দেশের মোট আমদানি ব্যয় বেড়েছে তুলনামূলক কম হারে। গত অর্থবছরে পণ্য আমদানিতে মোট ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৫২৪ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৬ হাজার ৮৩৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে মোট আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৬৮৯ কোটি ডলার বা ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। এর বড় অংশই এসেছে জ্বালানি তেল আমদানির অতিরিক্ত ব্যয় থেকে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছরে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৯৪৪ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে ব্যয় হয়েছিল ৪৫১ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বেড়েছে ১০৯ শতাংশের বেশি।

অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতেও ব্যয় বেড়েছে। গত অর্থবছর এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১২০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৬২ কোটি ডলার। ফলে এক বছরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৯২ শতাংশ। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে।

এর আগে করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে সর্বোচ্চ ৭৯৯ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। পরের অর্থবছরে ব্যয় কমে ৫৭৭ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবার বেড়ে ৬১৩ কোটি ডলারে ওঠে। কিন্তু সর্বশেষ অর্থবছরে সেই ব্যয় এক লাফে ১ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে চাপ তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ে। শুধু গত জুন মাসেই জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৬০ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। অথচ পুরো অর্থবছরে মাসিক গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৮৮ কোটি ৬২ লাখ ডলার।

এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, আমদানি ব্যয় এতো বাড়ানোর পর দেশে জ্বালানি সংকট কেন কাটছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি দায়ী নয়; দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় কারণ।

আরও পড়ুন  আরো ৯ দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি

কমছে দেশীয় গ্যাস, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমেই কমছে। কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও বিনিয়োগ করা হয়নি। নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার, মূল্যায়ন, উন্নয়ন কূপ খনন এবং সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলএনজি আমদানিতে একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছিল কাতার থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে বা নির্দিষ্ট কোনো উৎস থেকে সরবরাহে সমস্যা হলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় তার বড় প্রভাব পড়ছে।

আমদানিকৃত এলএনজি দেশে ব্যবহারের জন্য পুনঃগ্যাসীকরণ করতে মূলত ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউর ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো একটি টার্মিনাল বিকল হলে বা সেখানে জটিলতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। সম্প্রতি মহেশখালীর টার্মিনালে গ্যাসের মজুত শেষ হয়ে যাওয়া এবং যান্ত্রিক জটিলতার কারণে সরবরাহ ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ার ঘটনাও এ ব্যবস্থার ঝুঁকি সামনে এনেছে।

দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনাও দায়ী

জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও দুর্বল তদারকিও সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্নীতি দমন কমিশন তিতাস গ্যাসে অবৈধ সংযোগ, মিটার টেম্পারিং, ঘুষ এবং কৃত্রিম সিস্টেম লসসহ বিভিন্ন দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করেছে।

২০২৫ সালেও তিতাসের ২ হাজার ২১৪ কোটি টাকার স্মার্ট মিটার প্রকল্পে কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগে দরপত্র বাতিল করে পুনরায় আহ্বান করতে হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু বেশি অর্থ ব্যয় করে জ্বালানি আমদানি করলেই হবে না। একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করতে হবে এবং টার্মিনাল ও সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বাড়লেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।

এ বিষয়ে সিনিয়র ব্যুরোক্র্যাট, গবেষক ও বিশ্লেষক মো. শামসুল আলম  বলেন, ‘দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে গেলেও নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও বিনিয়োগ করা হয়নি। নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার, উন্নয়ন কূপ খনন এবং সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতার কারণে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানিতে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা ও ভাসমান টার্মিনালনির্ভরতা সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। এর সঙ্গে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও তদারকির ঘাটতিও সংকটকে আরও জটিল করেছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি উৎস বহুমুখীকরণ, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় এবং জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।’

আরও পড়ুন  অবশেষে আরামবাগে হচ্ছে জামায়াতের সমাবেশ

বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব শিল্পে

জ্বালানি তেলের পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে একদিকে শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়ছে।

সম্প্রতি এক সেমিনারে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিদ্যমান সংকট একদিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য সময় প্রয়োজন। জ্বালানি খাতে তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের জ্বালানি বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সব ধরনের জ্বালানি উৎসের মধ্যে সমন্বয় করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে সৌরশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এখন কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বিনিময় হার ১২২ থেকে ১২৪ টাকার মধ্যে রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অনুকূলে থাকলে আমদানি ব্যয়ের চাপ আরও কম থাকত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেশি বাড়তে পারত।

গত সপ্তাহে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ নেমে এসেছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে দেশের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল।

প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগেও

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ নানা কারণে দেশে এখনো আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধিতেও। জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন।

তাদের মতে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হলে আমদানি করা বাড়তি জ্বালানির সুফলও পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। কারণ জ্বালানি ব্যয় যত বাড়বে, শিল্পের উৎপাদন খরচ তত বাড়বে। এতে ব্যবসা সম্প্রসারণের আগ্রহ কমবে, নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও শ্লথ হতে পারে।

ফলে জ্বালানি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও যদি নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে সেই ব্যয় অর্থনীতির জন্য বাড়তি চাপই তৈরি করবে। দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটাতে আমদানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, সরবরাহ অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

সর্বশেষ সংবাদ