এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ♦ ১ জনের মৃত্যূদন্ড,৩জনের যাবজ্জীবন

প্রকাশিত: 6:29 PM, July 14, 2026

এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ♦ ১ জনের মৃত্যূদন্ড,৩জনের যাবজ্জীবন

এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ♦ ১জনের মৃত্যূদন্ড,৩জনের যাবজ্জীবন ♦️

প্রভাতবেলা প্রতিবেদক ♦
সিলেটের বহুল আলোচিত মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ে আরও ৩ আসামি শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম রনি ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। এছাড়া বাকি ৪ জন আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ও মাহফুজুর রহমানকে খালাস দেন আদালত।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্র্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় ঘোষণা করেন।
তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন।
তবে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জানান আসামি পক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী। তিনি বলেন, এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষ্য দেয়নি। ভিকটিমও আসামিদের শনাক্ত করেনি। অপরাধ প্রমাণ না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
এরআগে সকালে কড়া নিরাপত্তায় ৮ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এসময় আসামিরা সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আমরা ধর্ষণকারী না ভাই, আমরা ধর্ষণ করিনি। রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে আমাদের মামলার আসামি করা হয়েছে। ভিকটিমও আমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনেনি।
এদিকে, আলোচিত এ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় করেন গণমাধ্যম কর্মীরা।
সে রাতে যা ঘটেছিল
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় স্বামীর সাথে প্রাইভেটকারে করে শাহপরান মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন ওই গৃহবধূ (২০)। ফেরার পথে টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামিয়ে পার্শ্ববর্তী দোকানে প্রবেশ করেন স্বামী। এই সময়ে ৫/৬ জন তরুণ এসে তাদের জিম্মি করে প্রাইভেটকারসহ পাশ^বর্তী বালুচর এলাকায় এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। এরপর স্বামীকে মারধর করে বেঁধে রেখে ওই গৃহবধূকে ছাত্রাবাসের ভেতরে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। পরে স্বামীর টাকা পয়সা ও প্রাইভেটকার রেখে দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয় ধর্ষকরা।
ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে এসে গৃহবধূর স্বামী ঘটনাটি পুলিশকে জানান। তবে অভিযুক্তরা ছাত্রলীগের কর্মী হওয়ায় প্রথমে ছাত্রাবাসে প্রবেশে গড়িমসি করে পুলিশ। এই সুযোগে ছাত্রাবাস থেকে পালিয়ে যায় ধর্ষকরা। এরপর রাতভর ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

আরও পড়ুন  রোববার থেকে আসছে লাগাতার অবরোধ

এ ঘটনায় ধর্ষিতার স্বামী বাদী হয়ে সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেন।
ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে ছয় আসামি ও সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র‌্যাব। গ্রেপ্তারের পর তাদের পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। পরবর্তী সময়ে সবাই আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার দায় স্বীকার করেন। আসামিদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষায় আটজন আসামির মধ্যে ছয়জনের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়।
অভিযুক্ত যারা
২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা ও সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্র্য।
অভিযোগপত্রে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজনকে দল বেঁধে ধর্ষণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। আসামি রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমকে ধর্ষণে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। তারা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিতি।
অভিযুক্ত ৮ জনকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও এই ৪ জনের ছাত্রত্ব ও সার্টিফিকেট বাতিল করে। আর ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সাইফুর রহমান ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
যেভাবে সম্পন্ন হলো বিচার প্রক্রিয়া
২০২০ সালের ২২ নভেম্বর অস্ত্র ও চাঁদাবাজি মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এরপর ধর্ষণ মামলায় ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর ৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র প্রদান করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোহিতুল হক চৌধুরী মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচার কাজ শুরু করেন। আর ২০২২ সালের ১১ মে মাসে একই আদালতে অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলার অভিযোগ গঠন করে আদালত।
ধর্ষণ মামলার অভিযোগ গঠনের পর ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। তবে ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি আদালতে দুটি মামলার বিচার কার্যক্রম একসঙ্গে শুরুর আবেদন করেন বাদীপক্ষ। শুনানি শেষে বিচারক আবেদনটি খারিজ করে দেন। এরপর বাদীপক্ষ এই আবেদন জানিয়ে উচ্চ আদালতে একটি ফৌজদারি বিবিধ মামলা করেন। ওই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চুয়াল বেঞ্চ মামলা দু’টির বিচার কার্যক্রম এক সাথে একই আদালতে সম্পন্নের আদেশ দেন। এরপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বদলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটির কার্যক্রম চালানোর আবেদন করেন বাদীপক্ষ।
বাদীর আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ গঠনের দীর্ঘদিন পরও সাক্ষ্যগ্রহণের শুরু না হওয়ায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটির কার্যক্রম চালানোর জন্য ২০২২ সালের ১ আগস্ট বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে বাদি একটি রিট করেন। ওইবছরের ১৬ আগস্ট রিটের শুনানি শেষে দুই মামলার কার্যক্রম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বদলির প্রক্রিয়া গ্রহণে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
এর আগে ২০২২ সালের ২৭ জুলাই আসামি রবিউল ইসলামের জামিন শুনানিতে মামলার বিচার বিলম্বিত হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের হাইকোর্ট বেঞ্চ।
আদালত সূত্রে জানা জানায়, মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কেন শুরু করা হয় না মর্মে রাষ্ট্র্রপক্ষকে ২০২২ সালের ২১ আগস্ট কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহিতুল হক।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনের পর মামলাটি গত বছরের মে মাসে দ্রুত নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল থেকে বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলায় ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ওই গৃহবধূূ, তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের অধ্যাপক, ওসমানী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক রয়েছেন।

আরও পড়ুন  প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা হবিবুর রহমান এর জ্যোতির্ময় জীবন ও কর্ম

 

সর্বশেষ সংবাদ