কানাইঘাটে শালিসঃ ধর্ষণ চেষ্টা ও বাড়িতে হামলার দায়ে কবিরকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা

প্রকাশিত: ১০:২১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩, ২০২১

কানাইঘাটে শালিসঃ ধর্ষণ চেষ্টা ও বাড়িতে হামলার দায়ে কবিরকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা

কানাইঘাটে শালিসঃ ধর্ষণ চেষ্টা ও বাড়িতে হামলার দায়ে কবিরের দেড় লাখ টাকা জরিমানা।

♦মোঃইসমাঈল হুসাইন♦ কবির উদ্দীন। ৫৫ বছর বয়সী লোকটি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ৭নং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগ্রামের মৃত সফইর ছেলে। নিরীহ নারীদের সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন, ধর্ষণ এবং ছোট ছোট ছেলেদের সাথে সমকামিতা ও বলাৎকারের ধান্ধা সব সময় তার মাথায় থাকে। অনেকে মনে করেছিলেন, মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর তিন সন্তানের এই জনকের স্বভাব-চরিত্রে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসবে। কথায় আছে, কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না। এই বয়সে লোকটির ভীমরতি আরো বেড়েছে।

গ্রামের কয়েকজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর আগে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার কয়েক দিনের মাথায় নিজ বাড়িতে পাশের ঘরের এক চাচাতো বোনকে ধর্ষণের চেষ্টা করে কবির। সেদিনই চাচাতো ভাইয়েরা তাকে উত্তম-মধ্যম দেন। পাশের গ্রাম ঘড়াইগ্রামে এক বিবাহিত নারীর কাছে যাতায়াতের কারণে সেই নারীর সংসার ভাঙার উপক্রম। সেখানকার লোকজন কবিরের আত্মীয়-স্বজনের কাছে নালিশ করেন। এমনকি তার লোলুপ দৃষ্টি থেকে নিজ পরিবারেরও লোক মুক্ত নন বলে জানিয়েছেন কবিরের সমবয়সী গ্রামের এক লোক।

গ্রামের লোকজন বলেন, মান-সম্মানের ভয়ে এবং কবিরের গোত্র (গোষ্ঠী) বড় হওয়ায় অনেক নির্যাতিত নারী ও ছেলে তার বিরুদ্ধে আইন-আদালতে যেতে চান না। এমনকি গ্রাম্য সালিশেও অনেক ভিকটিম বিচারপ্রার্থী হন না। ফলে কবিরের অপকর্ম দিন দিন বেড়েই চলছে।

তার এমন বেপরোয়া আচরণে ফুঁসে উঠেছে গ্রামবাসী। শনিবার (৩ জুলাই, ২০২১) তাকে হাজির করা হয় গ্রাম্য সালিশ বৈঠকে। স্থানীয় ইউপি সদস্যের উপস্থিতিতে ’ধর্ষক’ কবিরের সর্বশেষ অপকর্মের কারণে তাকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তাকে সতর্ক করার পাশাপাশি গ্রামবাসী সিদ্ধান্ত নেন যে, গ্রামে ধর্ষণ, বলাৎকার, কারো বাড়িতে গিয়ে হুমকি-ধমকি ও হামলা এবং এই জাতীয় যে কোন অন্যায় তারা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করবেন।

ধর্ষণ প্রতিরোধে গ্রামবাসীর এমন সিদ্ধান্ত প্রশংসার দাবীদার এবং এক দোষীর কাছ থেকে জরিমানা আদায় একটি অনন্য নজির বলে অনেকে মনে করছেন।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত রমজান মাসে গৃহে ঢুকে এক গরীব পরিবারের নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে কবির। মেয়েটির পিতা ও ভাই প্রতিবাদ করলে পরের দিন সেহরীর পর পর অনেকটা অন্ধকার থাকাবস্থায় কবির তার ভাই জাবেদ এবং আরো কিছু নিজস্ব লোকসহ মেয়েটির পিতা ও ভাইয়ের উপর তাদের গৃহের মধ্যেই হামলা চালায়। মেয়েটির ভাই প্রাণে বাঁচতে দৌড়ে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা মামুনুর রশীদের বাড়িতে আশ্রয় নিলে সেখানেও গিয়ে কবির-বাহিনী হামলা চালায়। মামুন রক্ষা না করলে এবং কবির গংদের তাড়িয়ে না দিলে সেদিন কবির-বাহিনী যুবকটিকে প্রাণেই মেরে ফেলতো। পরে আবারো তাদের উপর হামলা চালানো হয়। এতে ভিকটিম নারীর পিতার হাত ভেঙে যায়।

 

একটা নিরীহ নারীকে তার গৃহেই ধর্ষণের চেষ্টা, বাবা ও ভাই প্রতিবাদ করায় তাদের গৃহেই তাদের উপর নৃশংস হামলা এবং কবিরের আরো বিভিন্ন অপকর্মের কারণে ফুঁসে উঠে লোকজন। গ্রাম্য সালিশে এই অন্যায়ের একটা বিহিত করতে গ্রামবাসী একাধিকবার বৈঠকে বসেন।
সর্বশেষ শনিবার ৩ জুলাই তারিখে গ্রাম্য সালিশে একটি বিষয়ে কবিরের তিনটি অপরাধ চিহ্নিত করে ৫০ হাজার টাকা করে মোট দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তিনটি অপরাধ হচ্ছে- (১) নিরীহ নারীর গৃহে ঢুকে ধর্ষণের চেষ্টা; (২) প্রতিবাদী বাবা ও ভাইকে তাদের গৃহে গিয়ে আক্রমণ ও গুরুতর জখম; এবং (৩) প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে যাবার পরও আরেক জনের বাড়িতে গিয়ে মারধর।

 

এই প্রসংগে ৭নং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য হাজী নিজাম উদ্দীন জানান, তাঁর উপস্থিতিতেই এই সালিশ বিচার হয়। ভিকটিম নারীর পিতা গ্রাম্য সালিশের এমন সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কবিরদের হামলায় তার হাত ভেঙে যাওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধিন থাকায় গ্রাম্য সালিশের সিদ্ধান্ত আসতে দেরী হয়েছে।

 

কথা হয় গ্রাম্য বিচারের দোষী সাব্যস্ত কবিরের সাথে। নিজেকে ভালো মানুষ দাবী করে তিনি বলেন, ধর্ষণ চেষ্টার কারণে গ্রামবাসী তার উপর এই দেড় লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করেনি। কবির আরো বলেন, “দেখুন, কারো বাড়িতে গিয়ে আক্রমণ করা এবং ঘরে ঢুকে মারধর করা খুবই অন্যায়। আমি আমার বাড়ি ও গোত্রের লোকজন গিয়ে ওদের বাড়িতে হামলা ও মারধর করে আসলে অন্যায় করেছি। এখন আমরা আমাদের অন্যায় বুঝতে পেরেছি। যাহোক, বাড়িতে গিয়ে হামলা করার কারণে মূলত গ্রামবাসী এই জরিমানা করেন। ওই লোকটির (নারীর পিতা) হাত ভেঙে দেওয়া এবং তার ও তার ছেলের শরীরে বিভিন্ন আঘাত করায় তাদের চিকিৎসার খরচ বাবত এই জরিমানা।”
কবিরের দাবীর সাথে পুরোপুরী একমত হননি তারই বংশ, গোত্র এবং গ্রামের লোকজন। তারা বলেন, কবির আংশিক সত্য বলেছে। সে তার গোত্র-

গোষ্ঠীর সবাইকে নিয়ে নয়; তার নিজস্ব কিছু লোক নিয়ে ওই বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। আর জরিমানা কেবলই বাড়িতে হামলা করার কারণে করা হয়নি। হামলার পাশাপাশি নারীটির গৃহে ঢুকায় এটা করা হয়।

কবিরের বাড়ির এক চাচা আতিকুর রহমান বলেন, “জরিমানা করার বিষয়টি সত্য; কবির যে দোষী লোক; সেটাও সত্য। আমরা দোষী নই।” বাণীগ্রাম (খালোপার) নিবাসী কবিরের এক চাচাতো ভাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কবির খুবই বদমাইস প্রকৃতির লোক। সে ও তার ভাইদের অপকর্মের কারণে আমরা আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রের লোকজন অতিষ্ঠ।”

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 503
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    503
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ