পাঠ্যপুস্তকে ভুল, কি শিখছে শিক্ষার্থীরা ?

প্রকাশিত: ৪:৫৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০

পাঠ্যপুস্তকে ভুল, কি শিখছে শিক্ষার্থীরা ?

শাহিদ হাতিমী : ‘সিলেট বিভাগের উত্তরে হিমালয় পাহাড়ের পাদদেশে জাফলং অবস্থিত। এখানে খাসি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আবাসস্থল। এখানে মারী নদী থেকে বয়ে আসে অনেক পাহাড়ি পাথর।’ এটা কোন ইতিহাসবেত্তার বক্তব্য নয়। কোন গবেষণাপত্রও নয়।জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক বাংলাদেশের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী ৪র্থ শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নির্ধারিত গ্রন্থে এমন তথ্যই দেয়া আছে। চতুর্থ শ্রেণীর ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’বইয়ের ৫৮  পৃষ্টায় এ তথ্যই বিদ্যমান।

দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং সম্পর্কে এমন পাঠদান করছেন প্রাথমিক শিক্ষকরা।

শিক্ষানুরাগী মহলের প্রশ্ন, হিমালয় পাহাড়ের পাদদেশে কী জাফলং? পাহাড়ী পাথর কি ‘মারী’ নদী দিয়ে বয়ে আসে? বাংলাদেশ কিংবা ভারত ভূখন্ডের কোথাও কি ‘মারী’ নামে কোন নদীর অস্থিত্ব আছে বা কোনকালে ছিল?

শিক্ষিতজনের প্রয়োজন নেই বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষ মাত্রেই জানেন হিমালয় পর্বত কোথায়? তার পাদদেশে কি অবস্থিত ? হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দেশের নাম নেপাল।

প্রভাতবেলার অনুসন্ধানে যা জানা যায়,খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় এর পাদদেশেই জাফলং অবস্থিত। যার একাংশের অবস্থান ভারতের মেঘালয় রাজ্যে।

ব্যাপক অনুসন্ধানের পরেও ‘মারী’ নদীর সন্ধান মেলেনি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডও এই নামের কোন নদীর সন্ধান দিতে পারেনি। তবে জাফলংয়ের বুকচিরে বয়ে যাওয়া নদীটির নাম ‘পিয়াইন নদী’। কিছুটা ভাটিতে আসার পর নদীটি ‘সারি’ নদী নামধারণ করেই প্রবাহিত হয়েছে। বিজ্ঞ মহল এমন তথ্যই দিয়েছেন। পাহাড়ি পাথর আসে ‘পিয়াইন নদী’ হয়ে এমন প্রমাণ তো চোখের সামনে।

কিন্তু সারি নদী হয়ে পাথর আসার কোনো জনশ্রুতি নেই। না হয় বুঝে নেয়া যেত ‘সারী’র জায়গায় ‘মারী’ হয়ে গেছে।

বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এখানে খাসি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আবাসস্থল ‘ । জাফলং, গোয়াইনঘাট বা জৈন্তাপুর অঞ্চলে ‘খাসি’ নৃ-গোষ্ঠী বলে কোন উপজাতির অস্থিত্ব নেই। জাফলং জৈন্তায় ক্ষুদ্র যে নৃগোষ্ঠী রয়েছে তাদের নাম ‘খাসিয়া’।

কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ে এমন তথ্য  ‘ভুল’ না ‘ইচ্ছাকৃত উপস্থাপন’? তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

১ বা ২ নয়, টানা ৭ বছর ধরে শিশুদের পাঠ্যবইয়ে এমন তথ্য বিদ্যমান।প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সুত্র মতে, চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের  ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বইটি ২০১৩ সাল থেকে পাঠ্যবই হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।বইটির প্রথম মু্দ্রণ হয়েছিল ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে। পরিমার্জিত সংস্করণ হয় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। পুণঃমুদ্রণ হয়েছিল ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে।

তথ্যগুলি যদি ভুলে ছাপা হয়ে থাকে তাহলে সংশ্লিষ্টদের চোখে ধরা পড়ার কথা। ৭ বছরে কি কেউ বইটি পাঠ করছেন না? বইটির সম্পাদনা ও রচনায় রয়েছেন সুনামখ্যাত পন্ডিত ব্যক্তিবর্গ।

বইটির তৃতীয় পৃষ্ঠায় লেখা রয়েছে বইটি রচনা ও সম্পাদনা করেছেন, ড. মাহবুবা নাসরীন, ড. আব্দুল মালেক, ড. ইশানী চক্রবর্তী ও ড. সেলিনা আক্তার। সারাদেশে পাঠদানে সংশ্লিষ্ট রয়েছে লাখ্ শিক্ষক। অভিভাবক মহলের প্রশ্ন, আমাদের শিশুরা কী পড়ছে? এতজন ডক্টর ডি তাহলে কী সম্পাদনা করলেন? আর শিক্ষকরা কি পাঠদান করছেন?

এ ব্যাপারে একাধিক শিক্ষকের সাথে আলাপ করা হয়। তাঁরা প্রভাতবেলা’কে জানান, শুধু বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় নয় অন্যান্য বিষয়ে কিছু কিছু ভুল তথ্য, ভুল বানান রয়েছে। এগুলো সংশোধনের প্রক্রিয়াও রয়েছে। আমরা মাঠ পর্যায়ের শিক্ষকরা সংশোধনী দিলেও তা আমলে নেয়া হয়না।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক আব্দুল হামিদ মানিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি প্রভাতবেলাকে জানান, নতুন করে মানচিত্র দেখতে হবে। হিমালয়ের কোন অংশ কি জাফলংয়ে এসে লেগেছে কি না?

এ ব্যাপারে জানতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় উপ-পরিচালকের(০৮২১-৭২৩০৩০) নাম্বারে একাধিকবার কল করা হলেও কেউ রিসিভি করেনি।

শাহেদ হাতিমী,প্রভাতবেলা প্রদায়ক, সিলেট।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 38
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ