রিজেন্টের সাহেদের প্রতারণার সাম্রাজ্য

প্রকাশিত: ১:২৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২০

রিজেন্টের সাহেদের প্রতারণার সাম্রাজ্য
প্রভাতবেলা প্রতিবেদক: *বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে সামলেছেন সমানতালে ** বাইরে সুশীল হলেও ভেতরে ভয়ংকর ***সাহেদের টর্চার সেলের সন্ধান পেয়েছে র‍্যাব ****মিরপুর শাখা সিলগালা, সাত কর্মকর্তা রিমান্ডে

সাহেদকে গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে র‍্যাব। তবে এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব না হলেও শিগিগরই তাকে গ্রেফতার করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন-কাশেম। গতকাল দুপুরে র‍্যাব সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র‍্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান।

তার পড়াশোনার দৌড় মাত্র এসএসসি পর্যন্ত। কিন্তু নিজেকে কখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, কখনো অবসরপ্রাপ্ত মেজর, কখনো কর্নেল কখনো বা সচিব পরিচয় দিতেন। এই মহাপ্রতারক হলেন রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম।

তিনি বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে সমানতালে সামলাচ্ছেন। বিএনপির সময় তারেক রহমানসহ হাওয়া ভবনের অনেকের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। আওয়ামী লীগেরও অনেকের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্য হলেও পরিচয় দিতেন বড় কোনো নেতার। সুশীল ভাব ধরলেও ভেতরে ছিলেন ভয়ংকর। উত্তরায় প্রধান কার্যালয়ে সাহেদের টর্চার সেলের সন্ধান পেয়েছে র‍্যাব। অনেক পাওনাদারকে এই টর্চার সেলে এনে নির্যাতন করা হয়েছে। এছাড়া তার রয়েছে একটি রংমহল। যেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এক শ্রেণির নেতার মনোরঞ্জন করা হতো। এক শ্রেণির সাংবাদিকেরও সেখানে নিয়মিত যাতায়াত ছিল।

চুক্তি ভঙ্গ করে করোনা রোগীদের থেকে বিল আদায়, ভুয়া প্রতিবেদন তৈরিসহ নানা অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর শাখাটি গতকাল বুধবার সিলগালা করে দিয়েছে র‍্যাব। এর আগে মঙ্গলবার একই অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা শাখায় অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেয় র‍্যাব। প্রতারণার অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে এক নম্বর আসামি করে ১৭ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। আট জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে সাত কর্মকর্তাকে গতকাল পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াছির আহসা চৌধুরীর আদালত এ আদেশ দেয়। সাহেদসহ ৯ জন পলাতক রয়েছেন। রিমান্ডে যাওয়া আসামিরা হলেন আহসান হাবীব, আহসান হাবীব হাসান, হাতিম আলী, রাকিবুল হাসান ওরফে সুমন, অমিত বণিক, আব্দুস সালাম, আব্দুর রশীদ খান ওরফে জুয়েল। আর কিশোর কামরুল ইসলামকে পাঠানো হয়েছে গাজীপুর কিশোর সংশোধনাগারে।

গতকাল বিকালে মিরপুর ১২ নম্বরে অবস্থিত রিজেন্ট হাসপাতালটি র?্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে সিলগালা করে দেওয়া হয়। এ হাসপাতালটিতে করোনা রোগীর চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছিল। মঙ্গলবার পর্যন্ত সেখানে ২২ জন রোগী চিকিত্সা নিচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মঙ্গলবারই তাদের অন্যত্র চলে যেতে বলে। অভিযান শেষে র?্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, এই হাসপাতালের আইসিইউ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বারান্দার চেয়ে খারাপ। সাধারণ বেডকে আইসিইউ বলা হতো। তিনি বলেন, মিরপুর রিজেন্ট হাসপাতালের অনুমতির মেয়াদ ২০১৭ সালেই শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর নবায়ন করেনি। ২০১৮ সালে মিরপুরের এ হাসপাতালটি র‍্যাব অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেছিল ৮ লাখ টাকা।

মোহাম্মদ সাহেদ ৩২ মামলার আসামি হয়েও ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ে নিয়মিত হাজির হতেন টেলিভিশনের টকশোতে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে সেই ছবি বিলবোর্ডে সাঁটিয়ে দিয়েছেন হাসপাতালের সামনে। ২০১৩ সালে রিজেন্ট হাসপাতালের লাইসেন্স নেওয়ার পর আর নবায়ন করার গরজ অনুভব করেননি। লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকলেও এই প্রতিষ্ঠানকে করোনার মতো স্পর্শকাতর চিকিত্সাসেবা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিল খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

 প্রতারণার দায়ে দুই বছর জেল খাটেন সাহেদ:মো. সাহেদ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকলেও তার আসল নাম মো. সাহেদ করিম। পিতার নাম সিরাজুল করিম। সাতক্ষীরা শহরে কামালনগরে তার গ্রামের বাড়ি। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর কামালনগরে আসে সাহেদের পুরো পরিবার। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সাহেদ ঢাকার একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। তার মা ছাফিয়া খাতুন সাতক্ষীরা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদিকা ছিলেন। মা অমায়িক ছিলেন। কিন্তু ছেলে একের পর এক নারী কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এসব অপকর্মের খবর সহ্য করতে না পেরে মা স্ট্রোক করে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর সাহেদের বাবা এলাকার সব জমিজামা বিক্রি করে দিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে চলে আসেন।

ওয়ান ইলেভেনের সময় প্রতারণার দায়ে গ্রেফতার হন সাহেদ এবং দুই বছর জেলও খাটেন। সাতক্ষীরা সীমান্ত পথে চোরাচালানের ব্যবসাও করতেন সাহেদ। মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট নিয়ে আসত। অনেক দিন এলাকার যান না সাহেদ। তবে ২০১৩ সালে হেলিকপ্টারে একবার অল্পসময়ের জন্য যান। সাহেদের বাবা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। ইউনাইটেড হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। সাহেদ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয় দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। উত্তরায় সাহেদের প্রধান কার্যালয়ের ভাড়া আট মাস বকেয়া রয়েছে। মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালের কাছে বাড়িওয়ালা অর্ধ কোটি টাকা পায়। ভাড়া চাইতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেয় সাহেদ।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার ঠিকানা হরনাথ ঘোষ রোড, লালবাগ, ঢাকা-১২১১। জেল খেটে বের হয়ে ২০১১ সালে ধানমন্ডির ১৫ নম্বর রোডে এমএলএম কোম্পানি বিডিএস ক্লিক ওয়ান খুলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে শত কোটি টাকা আত্মসাত্ করেন। আর সে সময় তিনি মেজর ইফতেখার করিম চৌধুরী বলে পরিচয় দিতেন। তার বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় দুটি মামলা, বরিশালে একটি মামলা, বিডিএস কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি দেওয়ার নামে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতারণার কারণে উত্তরা থানায় ৮টি মামলাসহ রাজধানীতে ৩২টি মামলা রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।

সাহেদের  প্রতারণামূলক যত প্রতিষ্ঠান: প্রতারণার টাকায় তিনি উত্তরা পশ্চিম থানার পাশে গড়ে তুলেছেন রিজেন্ট কলেজ ও ইউনিভার্সিটি, আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটি। এর একটিরও কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই বলে অভিযোগ আছে। আর অনুমোদনহীন আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটির ১২টি শাখা করে হাজার হাজার সদস্যের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত্ করার অভিযোগ আছে সাহেদের বিরুদ্ধে। প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নিতে নিজের কার্যালয়ে একটি টর্চার সেল গড়ে তুলেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। সাহেদ করিমের প্রতারণার তথ্য সামনে আসতে থাকে ভুয়া করোনা টেস্ট ও চিকিত্সার নামে প্রতারণার অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালে র‍্যাবের অভিযানের পর। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির সদস্য; ন্যাশনাল প্যারা অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট; রিজেন্ট ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, রিজেন্ট কেসিএস লিমিটেড, কর্মমুখী কর্মসংস্থান সোসাইটি, রিজেন্ট হসপিটাল লিমিটেড ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান। সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্চ নামে একটি প্রতিষ্ঠানেরও চেয়ারম্যান তিনি। আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির এক নেত্রী শাম্মী আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সাহেদ করিম কমিটির সদস্য নন। তিনি মাঝে মাঝে বৈঠকে আসতেন। আগে কোনো একসময় সদস্য ছিলেন।

সাহেদের ছবি আছে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও এমপিদের সঙ্গে:ফেসবুকে সাহেদের ছবি আছে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও এমপিদের সঙ্গে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষস্থানে থাকা লোকজনের সঙ্গেও ছবি আছে। পরিচয় দিত আওয়ামী লীগ সরকা?রের বি?ভিন্ন মন্ত্রী ও কর্তা ব্যক্তিদের কা?ছের লোক হিসেবে। কখনো সাংবাদিকতা না করেও নতুন কাগজ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক হয়েছেন সম্প্রতি। নিজেকে উত্তরা মিডিয়া ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও পরিচয় দিয়ে থাকেন এই প্রতারক।

রিজেন্টের প্রতারণার সবই জানত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর! জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) পরিচালক বায়েজীদ খুরশিদ রিয়াজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে গত ৭ জুন চিঠি দিয়েছিলেন রিজেন্টের অপকর্ম নিয়ে। এতে বলা হয়, রিজেন্ট হাসপাতাল নমুনা পরীক্ষার জন্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে আদায় করছে। অথচ সরকার বিনা মূল্যে আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করে দিচ্ছে। ঐ চিঠির পরও অধিদপ্তর রিজেন্ট থেকে দিনে ৫০টি নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোনো খোঁজখবর না নিয়ে, এই হাসপাতালের দক্ষতা যাচাই না করে কীভাবে কোভিড চিকিত্সাসেবা দেওয়ার সুযোগ দিল, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেননি। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে যে, ঐ হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু রিজেন্ট হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া ছাড়া বড় কোনো শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জানা গেছে, রিজেন্ট হাসপাতাল বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে আনত। টঙ্গী শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের একটি দালাল চক্র রোগী ভাগিয়ে এনে ভর্তি করাত রিজেন্টে।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ