বন্যা পরিস্থিতি || মানবিক বিপর্যয়ের মুখে সিলেট

প্রকাশিত: ৮:৩৩ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২২

বন্যা পরিস্থিতি || মানবিক বিপর্যয়ের মুখে সিলেট
বন্যায়  সিলেটে মৃত্যু হয়েছে ৪৭-জনের। শুক্রবার ২৪ জুন পর্যন্ত এ পরিসংখ্যান।  দায়িত্বশীল সুত্রমতে, সিলেট জেলার ১৬ জন, সুনামগঞ্জের ২৬ জন, হবিগঞ্জে ২ জন ও মৌলভীবাজারে ২ জন মৃত্যু ঘটেছে এ বন্যায়। গবাদী পশুর প্রাণহানির সঠিক কোন হিসেব নেই দায়িত্বশীল কোন সংস্থার কাছে। ত্রাণ কার্যক্রমে কোন সমন্বয় নেই।  কোন এলাকায় ত্রাণের হিড়িক, কোন এলাকায় ৯ দিনেও মেলেনি ত্রাণের দেখা। ফটোসেশন, সেলফীবাজি আর ফান্ড রাইজিংয়ে ত্রাণ দাতাদের যে সরবতা বাস্তবতে ভিন্ন। প্রভাতবেলা ডেস্ক♦
সিলেট-সুনামগঞ্জে জীবন প্রবাহের অসহনীয় চিত্র । একদিকে নামেমাত্র উন্নতি হলেও অন্যদিকে অবনতি।চলমান প্রলয়ঙ্করী বন্যা পরিস্থিতি একদিকে নামেমাত্র উন্নতি হলেও অন্যদিকে অবনতি ঘটছে। সুরমা অঞ্চলঘেরা এলাকায় পানি কিছুটা কমলেও কুশিয়ারা সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বাড়ছে পানি। পানির এমন উঠানামার খেলায় এখন বানভাসি মানুষের অন্তহীন দুর্ভোগের চিত্রও ফুটে উঠেছে। পানির তোড়ে ভেসে গেছে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, ঘরে রক্ষিত বছরের খোরাকী ধান-চাল, শিক্ষায়তন, অবোধ প্রাণী।  দুর্গত এলাকার মানুষের নিত্য জীবন প্রবাহের যে অসহনীয় চিত্র, তা যেন সিলেটের এক চরম ক্রান্তিকাল। কারণ এখনও করোনা দুর্যোগকে সামলাতে পারেনি এ অঞ্চলের মানুষ। সেখানে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে বসেছে শতাব্দির প্রলয়ঙ্করী এ বন্যা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের বন্যা ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৪ সালের বন্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সিলেট-সুনামগঞ্জ এলাকায় পানির উচ্চতা ১৯৮৮, ১৯৯৮ কিংবা ২০০৪ সালের চেয়ে বন্যার পানির উচ্চতায় নতুন রেকর্ড করেছে। ১৯৮৮ সালে সিলেটের ৬১% ও ১৯৯৮ সালে ৬৮% এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কিন্তু এবার সিলেট জেলার ৮০ ও সুনামগঞ্জের ৯০ শতাংশের বেশী তলিয়ে যায় পানিতে। বন্যায় মেরুদন্ডে আঘাত হেনেছে প্রায় ৫০ লাখ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, দিনমজুর ও কৃষকের।
বন্যাকবলিত এলাকার ১৪২ কোটি টাকার মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৩৩ হাজার খামারী। পুকুর ও মাছের ঘের থেকে ২ থেকে ৩ লাখ টন মাছ বেরিয়ে গেছে। সিলেটের মাছের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে মাছ চাষিরা।
বন্যায় গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে দুর্যোগ কবলিত মানুষ ও খামারীরা মহাবিপদে পড়েছেন। পশু-পাখির খাদ্য ও থাকার জায়গার অভাবে পানির দামে বিক্রি হচ্ছে গবাদী পশু-পাখি।
বন্যার ভেসে গেছে ১ লাখ হেক্টরেরও বেশী ফসলী জমি। ক্ষতিগ্রস্ত এসব কৃষকের পাশেও দাঁড়াতে হবে। পানির তোড়ে ভেসে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে হাজার হাজার ঘর-বাড়ী। ‘কোম্পানীগঞ্জের এক নারী বানভাসী চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, বন্যায় সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন পানি নেমে গেলেও বসবাস করার একমাত্র ভরসা হবে রাস্তাঘাট। ঘরবাড়ি মেরামত সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইলে বলেন, ছেলে মেয়েদের যেখানে খাবার দিতে পারবো কিনা তা জানি না, বসতবাড়ি করা তো এখন দুঃস্বপ্ন। তার উপর রয়েছে ঋণের বোঝা।
শুধু ওই মহিলা নয়, একই সুর ও অভিন্ন বক্তব্য সিলেটের প্রায় সব বানভাসীরই।‘একটি আশ্রয় কেন্দ্রের মানুষের সাথে কথা বললেই সবহারা মানুষের ভয়াবহতা চিত্র ফুটে উঠে। সুনামগঞ্জ শহরের সরকারি কলেজ আশ্রয়কেন্দ্রে পাশের সুলতানপুর, গাঙপার হাটি ও আশপাশের ৭৫টি পরিবার আশ্রয় নেয়। এসব পরিরাবের পুরুষের বেশির ভাগই দিনমজুর। কেউ কেউ ঠেলা ও রিকশা চালান। তাঁদের প্রায় সবার বাড়িঘর থেকে পানি নেমেছে। কিন্তু কারও কারও ঘর পুরো ভেঙে পড়েছে। কারও ঘর ভেসে গেছে। কারো ঘরের বেড়া, মেঝে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের আসবাব, কাপড়চোপড় পানিতে ভেসে গেছে। তাই পানি নেমে গেলেও তাঁরা বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না তা তারা জানেন না। কারণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ী তারা নতুন করে গড়ে তোলার শক্তি কিংবা সামর্থ তাদের নেই।’ শুধু এই আশ্রয়কেন্দ্রই নয়, সিলেট-সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত জনপদের প্রায় সব বানভাসীর অবস্থা এমনই-বলছে স্থানীয় সূত্রগুলো।
গত ১৫ জুন থেকে একে একে প্লাবিত হয়েছে গ্রামীণ জনপদ, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও নগর। ভারত থেকে প্রবাহিত নদনদীর প্রবাহ ও মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি ও সিলেটে অতি ভারী বৃষ্টির কারণে এ অঞ্চলে বন্যার ভয়াল রূপ । বন্যায় ৫০ লাখ মানুষ পানিবন্দী। এক হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়াও যে যেখানে সম্ভব আশ্রয় নিয়েছে। বহু মানুষ পানিতে ভেসে গেছে। এখন পর্যন্ত ৪৭ জনের প্রাণহানির হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার থেকে বিভিন্ন নদীর পানি ধীরগতিতে কমছে। তবে সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় সেটি কমে ১৩ দশমিক ৭০ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর সিলেট পয়েন্টে বৃহস্পতিবারের তুলনায় শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ কমে শুক্রবার ১০ দশমিক ৯০ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর অমলশিদ পয়েন্টে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২৮ সেন্টিমিটারে ছিল। শুক্রবার ওই পয়েন্টে ছিলো ১৭ দশমিক ২৪, যা বিপদসীমার উপরে। কুশিয়ারা নদীর শেওলা পয়েন্টে পানি গতকালের তুলনায় শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বেড়ে ১৩ দশমিক ৭১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি বৃহস্পতিবারের তুলনায় শূন্য দশমিক শূন্য ৬ সেন্টিমিটার কমে শুক্রবার ১০ দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর শেরপুর পয়েন্টে পানি কমে ৮ দশমিক ১৯ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া লোভা নদীর পানি কমে ১৩ দশমিক ৮৪ সেন্টিমিটার এবং সারি নদীর সারিঘাট পয়েন্টে ১০ দশমিক ৮৪ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি শুক্রবার সকাল ৯টায় বিপদসীমার ৭ দশমিক ৬৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সুরমার ছাতক পয়েন্টে ৯ দশমিক ১১ সেন্টিমিটার বিপসীমার উপরে প্রবাহিত হয়।
স্থানীয় সূত্র বলছে, সুনামগঞ্জে শুক্রবার শনিবার বৃষ্টি হয়নি। তার বদলে সকাল থেকে রোদ উঠেছে। পানি আরও কমেছে। অল্প কিছু বাড়িঘর থেকে পানি নেমেছে। স্কুল-কলেজ ও অন্যত্র আশ্রয় নেওয়া অল্পসংখ্যক লোকজন বাড়িতে গিয়ে ধোয়ামোছা ও পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। ঘর প্রস্তুত করছেন আবার ফেরার জন্য। তবে সুনামগঞ্জ শহরের বেশ কিছু এলাকায় এখনো মানুষের বাড়িঘরে পানি আছে। রাস্তাঘাট থেকে এখনো পানি নামেনি। এসব এলাকার মানুষদের ঘরে ফিরতে আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। আর জেলার গ্রামীণ অঞ্চলগুলো এখনো পানিতে টাইটুম্বুর।
এদিকে, হবিগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। কমতে শুরু করেছে নদ-নদীর পানি। তবে ভাটি এলাকা পানিতে ভরপুর ও হাওরে পলি জমায় বন্যার পানি নামতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিনহাজ আহমেদ শোভন জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পানি স্থিতিশীল রয়েছে। এছাড়া খোয়াই নদীর পানি কমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে। প্রতি ঘন্টায় ১০ সেন্টিমিটার করে কমছে কালনি-কুশিয়ারা নদীর পানি।
তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি না হলে বন্যা পরিস্থিতির আর অবনতি হবে না। তবে হবিগঞ্জের ভাটি এলাকা কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে পানিতে টইটুম্বর। এছাড়া বানের পানিতে হাওরে পলি জমেছে। তাই পানি নামবে খুব কম গতিতে।’ ‘পানি স্থিতিশিল থাকায় আতঙ্ক কমলেও কমেনি দূর্ভোগ। রাস্তাঘাট তলিয়ে থাকায় এখনও পানিবন্দি জেলার ৬ লাখ মানুষ।’
স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ সদর ও মাধবপুর উপজেলার ৫১টি ইউনিয়ন বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে।
ওদিকে, মৌলভীবাজারের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বৃষ্টিপাত কমে আসায় নদ-নদীর পানি কিছুটা হ্রাস পেলেও হাওরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি কোনো উন্নতি হয়নি। বৃহস্পতিবার হাওরের নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ জেলার সাত উপজেলায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ