‘রিম্মি আরবি’ থেকে ‘রিম্মি শাহেদ’ চাচার কলমে ভাতিজির সাতকাহন

প্রকাশিত: ৫:১৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২০

‘রিম্মি আরবি’ থেকে ‘রিম্মি শাহেদ’ চাচার কলমে ভাতিজির সাতকাহন

🔶 নিজাম উদ্দিন সালেহ 🔶‘রিম্মি আরবী’ কেনো ‘রিম্মি শাহেদ’ হলো?আমি অত্যন্ত দুঃখ ও মর্মবেদনা নিয়ে আজকের এই লেখাটি লেখছি।যে রিম্মি আরবী এবং সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এলাকা দক্ষিণ সুরমার গোটাটিকরের পাঠানপাড়া নিয়ে এখন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রিক মিডিয়ায় লেখালেখি হচ্ছে ,এ সম্পর্কে কিছু লেখা প্রয়োজন বলে আমি মনে করছি ।একটি ভালো সামাজিক-পারিবারিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য থাকা সত্বেও কীভাবে কিছু ছেলেমেয়ে বেপথু হয়ে যায় ,সেদিকে খানিকটা আলোকপাত করার জন্য এই লেখা।ঘৃণ্য শাহেদের স্ত্রী রিম্মি আরবী আমার ভাতিজি(আপন খালাতো ভাইয়ের কনিষ্ঠ কন্যা )।আমার জ্যেষ্ঠ খালা অর্থাৎ রিম্মি আরবীর দাদী সিলেটের বালাগন্জের বিখ্যাত জায়গীরদার বাড়ির মেয়ে ।আমার জ্যেষ্ঠ খালার কোন সন্তান আজ বেঁচে নেই ।তিনি আমার মায়ের কাছে ছিলেন ‘গোটাটিকরের বুয়াই’।

আর খালু ছিলেন ব্রিটিশ আমলের সাব-রেজিস্ট্রার ।ব্রিটিশ কর্মকর্তারা তার বাসায় আসতো নানা প্রয়োজনে উৎসব ,অনুষ্ঠানে।সবচেয়ে বড়ো কথা তিনি ছিলেন যেমন সৎ কর্মকর্তা তেমনি পরহেজগার ‘অলি’ পর্যায়ের লোক।আরো একটি বড়ো পরিচয় আছে তার,বাংলা সাহিত্যের উনবিংশ শতকের একজন বড়ো লেখক ও কবি হিসেবে ইতিহাসে তার স্থান রয়েছে ।তার নাম আবু জাকারিয়া মুহাম্মদ ইব্রাহিম আলী আরবী।তার লেখা অনেকগুলো বইয়ের কথা জানা যায় ।

তার রচিত তৎসময়ের প্রসিদ্ধ ইসলামি গ্রন্থ ‘মোসলেম সহচর’ বেশ কয়েক খন্ডে প্রকাশিত হয়।তার ‘শ্রীহট্ট বিজয় কাব্য’আরেকটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ।আমি শৈশবে ‘মোসলেম সহচর’ পড়ে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে পরিচিত হই।
আমার বড় খালু আবু যাকারিয়ার এক পুত্র ছিলেন অসাধারন মেধাবী।
মিন্টুভাই।তিনি ব্যারিস্টারি পাঠ্যাবস্থায় যক্ষাক্রান্ত হয়ে মারা যান পাকিস্তান আমলে।এর পর জীবিত ছিলেন তাদের জ্যেষ্ঠপুত্র আমাদের পল্টু ভাই (মরহুম),যিনি ছিলেন সিলেট কাস্টমস বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট।কাস্টমস বিভাগের বড়ো কর্মকর্তা হলেও তিনি এতোই সৎ ছিলেন যে,মৃত্যুকালে একখন্ড জমিও কিনতে পারেননি সিলেট শহরে।ছেলেমেয়েরা প্রবাসী হয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করে এখন সচ্ছল অবস্থায় আছে ।স্মরণ যোগ্য যে ,তখনকার সময়ে বড়ো সরকারী কর্মকর্তারা এখনকার মতো কোটি টাকা নিয়ে পেনশনে যেতেন না।

আর ছিলেন তাদের তৃতীয় পুত্র আমাদের নান্নু ভাই (মরহুম) ।তিনি ছিলেন সিলেটের একাউন্টস অফিসের অডিটর,সৎ কর্মকর্তা ।আর চতুর্থ ছিলেন সুফু ভাই অর্থাৎ ইয়াসীন আল আরবী, রিম্মি আরবীর পিতা।তিনি ছিলেন সচিবালয়ে ডেপুটি সেক্রেটারী পদ মর্যাদার কর্মকর্তা ।এরশাদের আমলে তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী এম,এ মান্নানের পিএস ছিলেন কিছুদিন।অত্যন্ত সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।থাকতেন আজিমপুর অফিসার্স কলোনীর সাদামাটা বাসায়।আশির দশকে সেই বাসায় আমি কয়েকবার গিয়েছি।তখন তার মেয়ে শাম্মী ও রিম্মি স্কুলে পড়ে।তাদের মা শাহিদা আরবী বিটিভির প্রযোজক ছিলেন।

আমার খালাতো ভাই ইয়াসিন আল আরবী এতোই দায়িত্ববান কর্মকর্তা ছিলেন যে,সচিবালয়ে দায়িত্বপালনকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন।এই সৎকর্মকর্তা মৃত্যুকালে তেমন কোন সম্পদই রেখে যাননি।

আমার খালুর এর কন্যা সুফিয়া আরবীর(মরহুমা)শশুর বাড়ী শেখঘাটের জিতু মিয়া জমিদার বাড়ি।এছাড়া এই বাড়িতে বিয়ে করে এখানেই থাকতেন আমার বর্ণিত খালাত ভাই অডিটর নান্নু ভাই।এই বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তার কবর রয়েছে।তার মৃত্যুর পর আমি আমার মায়ের সাথে ঐ বাড়িতে গিয়ে তার জানাজায় শরিক হয়েছিলাম। এরা সবাই রিম্মি আরবীর পিতা,পিতৃব্য ও ফুফু। প্রশ্ন হচ্ছে, যার পিতৃ পরিচয় ,পৈতৃক ঐতিহ্য ও বংশ এতো সৎ ও মর্যাদার অধিকারী, কেনো সেই রিম্মি আরবী এমন হলো ?

আমার ভাবী শাহিদা আরবী ভিন্ন জেলার।তিনি শুরু থেকেই আমার ভাই ও তার সন্তানদের অনেকটা আলাদা করে রেখেছিলেন তাদের সিলেটের পৈতৃক বাড়িঘর ও আত্মীয়স্বজন থেকে, এমন অভিযোগ আত্মীয়-স্বজনদের।

এভাবে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো পরিবারটি।রিম্মির পিতা জীবিত থাকতে মাঝে মাঝে তাদের নিয়ে সিলেটে এসেছেন ।আমাদের শিবগঞ্জের বাসায়ও থেকেছেন ।তখন শাম্মী ও রিম্মিকে আমি দেখেছি লাজুক, বিনয়ী মেয়ে হিসেবে।কিন্তু তাদেরই একজন রিম্মি আরবী কীভাবে আজকের মিডিয়ার নেতিবাচক খবর হয়ে গেলো, ভাবতেও পারছি না আমি।

আমার বিশ্বাস একটি ইতিহ্যবাহী পাড়ার বাসিন্দা ও একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম বংশের সন্তান এবং সৎ ও দায়িত্ববান কর্মকর্তা ইয়াসীন আলী আরবী জীবিত থাকলে,তার কনিষ্ঠ কন্যা এভাবে মিডিয়ার নেতিবাচক সংবাদের বিষয় হতো না, এটা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।তাদের সাথে আমার বহু বছর কোন যোগাযোগ নেই।তাই জানিনা,কোন মানসিকতা ও পরিবেশে তাকে এমন লজ্জাজনক পথে নিয়ে গেলো।পূণ্যভূমি সিলেটের এই ঐতিহাসিক পাড়া এবং একটি সম্ভ্রান্ত ধার্মিক পরিবারকে কেন্দ্র করে পত্র পত্রিকায় এতো লেখালেখি হচ্ছে বলে এটুকু লিখতে বাধ্য হলাম।

সর্বোপরি বলতে চাই,আরব দেশ আসা পূর্ব পুরুষ ও এদেশে সৎ এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উত্তর পুরুষ এক মহৎপ্রাণ ও ধর্মপ্রাণ সুলেখকের পৌত্রী রিম্মি আরবীকে কেনো অন্ধকার জগতের এক বাসিন্দার অর্ধাঙ্গিনী হতে হলো, এটা আমার কাছে এখনো বিস্ময়ের ।প্রশ্ন জাগে, রিম্মি কি তার পিতৃ পুরুষের ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলো,নাকি অজ্ঞাত ছিলো বা তাকে এসব জানতে দেওয়া হয়নি?
আর কোন ‘রিম্মি আরবী’ যেনো ‘রিম্মি শাহেদ’ না হয়,সেদিকে নজর রাখার জন্য সিলেটসহ গোটা সমাজের অভিভাবক ও মুরব্বীদের প্রতি আমি বিনীত অনুরোধ
রাখছি । অনুরোধ রাখছি, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এতো বিপুল সংখ্যায় শাহেদ, সম্রাটদের মতো দূর্নীতিবাজ অপরাধীদের উত্থ্যান হচ্ছে কেনো এটা খুঁজে দেখার জন্য।তবে এ অনুরোধ রাখছি না ,এদেশের বর্তমান কোন রাজনীতিক, রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বর্গের কাছে,কারণ মাছের মাথার মতো এদের অধিকাংশের মাথায় পচন ধরেছে।আমি ভুল কিছু লিখে থাকলে আপনারা শুধরে দিবেন,মার্জনা করবেন।

🔶 নিজাম উদ্দিন সালেহ🔶  বিশ্বাসেেে সপক্ষের শক্তিমান কবি🔷  সহকারী সম্পাদক, দৈনিক জালালাবা।। ♦

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ