করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন মৌলভীবাজারের আজিজুর রহমান

প্রকাশিত: ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২০

করোনা আক্রান্ত হয়ে  মারা গেলেন মৌলভীবাজারের আজিজুর রহমান

প্রভাতবেলা প্রতিবেদক♦ ঘাতক ভাইরাস করোনা কভিড- ১৯ কেড়ে নিল আজিজুর রহমানকে। মৌলভীবাজারের মাটি ও মানুষের নেতা আজিজুর রহমান আর নেই।

সোমবার (১৭ আগস্ট)  দিবাগত রাত পৌনে ৩ টার দিকে আজিজুর রহমান ইন্তেকাল করেন।  ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। করোনা আক্রান্ত হয়ে বংগবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান।

স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত  আদ‌র্শিক রাজনী‌তির রাজকুমার মৌলভীবাজার জেলাবসীর শ্রদ্ধা আর ভরসার আশ্রয়স্থল বিশিষ্ট সমাজসেবক আজিজুর রহমান চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী আজিজুর রহমান ছিলেন,  বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাবেক হুই,, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ৭১’এর বীর মুক্তিযোদ্ধা,সংবিধানে স্বাক্ষরকারী সাবেক গণ পরিষদ সদ, মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মৌলভীবাজার জেলার অবিভাবক বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ।  তার মৃত্যু সংবাদ শুনে দেশে বিদেশে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জেলাবাসী গভীর শোকাহত।

বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ আজিজুর রহমান মৌলভীবাজার জেলার গুজারাই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম আব্দুল সত্তার, মাতা মরহুমা কাঞ্চন বিবি। তিনি শ্রীনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন।

মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হতে মাধ্যমিক ও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকা কলেজে ভর্তি হলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে হবিগঞ্জের বিখ্যাত বৃন্দাবন কলেজ হতে বিকম ডিগ্রী অর্জন করেন।
ছাত্রজীবন হতেই সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত আজিজুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর সরাসরি নির্দেশনায় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কারাবরণ করেন তিনি। এরপর একই বছরের ৭ এপ্রিল মুক্তিবাহিনী কর্তৃক জেল ভেঙ্গে সিলেট কারাগার থেকে তাঁকে মুক্ত করা হয়। ২রা মে পুনরায় পাকবাহিনী মৌলভীবাজার শহরে প্রবেশ করে বর্বরোচিত দমন পীড়ন চালানোর পর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন তিনি।
এক পর্যায়ে মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আহুত পশ্চিমবঙ্গের বাগডুগায় (দার্জিলিং) প্রথম পার্লামেন্ট অধিবেশনে যোগদান করেন আজিজুর রহমান।
প্রবাসী সরকার কর্তৃক আয়োজিত সামরিক প্রশিক্ষণে সিলেট বিভাগের একমাত্র প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং ৪ নম্বর সেক্টরের রাজনৈতিক কো-অর্ডিনেটর ও কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন আজিজুর রহমান।
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এবং গণপরিষদ সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর শমসেরনগর, ৬ ডিসেম্বর রাজনগর এবং ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মৌলভীবাজারকে হানাদার মুক্ত ঘোষণা করেন আজিজুর রহমান।
গণপরিষদের এই সদস্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য রচিত সংবিধানের একজন স্বাক্ষরকারী। তিনি ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় সংবিধানের একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীতে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মৌলভীবাজার জেলা শাখার দুই বারের সাধারণ সম্পাদক ও দুই বার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও পরবর্তীতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
অকৃতদার এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মৌলভীবাজার মহিলা কলেজ (বর্তমানে সরকারী) ও সৈয়দ শাহ মোস্তফা কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি মৌলভীবাজার জেলার অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠক।সামাজিক কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, মৌলভীবাজার শাখার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনমূলে মৌলভীবাজারে প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন আজিজুর রহমান। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করে গেছেন বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদ।

সর্বশেষ সংবাদ